তৈরি পোশাক শিল্পে ব্র্যান্ড বাংলাদেশ
ড. রুবানা হক । সোমবার, ১৪ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:৫৩
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শুরুটা গৌরবময়। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পোশাক খাতে নানা অর্জন যোগ হয়েছে। কয়েক দশকের রূপান্তরের অনেকগুলো পর্যায় রয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলো হচ্ছে ১৯৭৯ সালে নুরুল কাদের, ২০০৫ সালে এমএফএর সমাপ্তি, ২০১১ সালে ইইউর উৎস শর্ত (রুলস অব অরিজিন) পরিবর্তন ও ইবিএ (এভরিথিং বাট আর্মস)। এগুলো বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
১৯৭৪ সালে মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট চালু হয়, যখন উন্নত বিশ্ব অনুভব করল উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে নিজেদের আমদানির সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেহেতু ইইউ আমদানি সীমিতকরণ প্রত্যাখ্যান করে, রফতানি বাড়তে থাকে। পরে জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড (জিএটিটি) উরুগুয়ে রাউন্ডে টেক্সটাইল বাণিজ্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এখতিয়ারে আসে এবং সবশেষে এগ্রিমেন্ট অন টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্লদিং এমএফএর অধীন কোটা পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত করার পথ খুলে দেয়। ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি কোটার বিলুপ্তি ঘটে এবং অনুমান করা হয়েছিল, এ কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ভুগবে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের রফতানি প্রায় নাটকীয় পরিমাণের দিক থেকে বৃদ্ধি পায়, আনুমানিক ৫০০ মিলিয়ন ডলার।
সময়ে এসে আমাদের এখন পণ্য বৈচিত্র্যকরণের দিকে অগ্রসর হওয়া জরুরি। তৈরি পোশাক খাতকে নতুন একটি পর্যায়ে উত্তরণের জন্য পণ্য বৈচিত্র্যকরণের পাশাপাশি মূল্য সংযোজন (ভ্যালু অ্যাডিশন), সেক্টর বৈচিত্র্যকরণ, উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি (প্রডাক্ট আপগ্রেডেশন) ও তদারকির বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্যও পণ্য বৈচিত্র্যকরণ জরুরি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার তৈরি পোশাক রফতানি করে। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাক রফতানির মোট পরিমাণ ছিল ৫০৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মাত্র ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যদিও বৈশ্বিক বাজারে চীনের অংশগ্রহণ ৩৯ শতাংশ। তবে এফএমএর সমাপ্তির পর বাংলাদেশের পোশাক খাতের রফতানি পাঁচ গুণ বেড়েছে। কারণ উদ্যোক্তারা ‘ভলিউম ড্রাইভেন’ প্রবৃদ্ধি কৌশলের দিকে মনোনিবেশ করেন—যা মৌলিক পোশাক তৈরির প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয়। গত চার দশকে আমাদের আরএমজি শিল্পের সক্ষমতা ও প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তবে একই ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করে এ খাতের প্রবৃদ্ধির গতি অব্যাহত রাখা নিশ্চয়ই সহজ হবে না।
আমাদের রফতানীকৃত তৈরি পোশাকের বেশির ভাগই উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারে কেন্দ্রীভূত। তবে গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি বাজারের বৈচিত্র্যকরণ ঘটছে। পাশাপাশি অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। নতুন বাজার অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও। প্রাপ্ত তথ্য থেকে আমরা বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাব। যেমন ২০০৮-০৯ অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে আমাদের রফতানির পরিমাণ ছিল যেখানে মাত্র ৬ দশমিক ৪, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ হয়। তবে প্রচলিত ও অপ্রচলিত দুই ধরনের বাজারেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির সম্ভাবনা বিপুল। নতুন বাজার যেমন ব্রাজিল, রাশিয়া এগুলোর পেছনে যদি দৌড়াতে হয় তাহলে অর্থনৈতিক কূটনীতির দরকার আছে। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, শ্রম মন্ত্রণালয় এবং আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে সমন্বয়ের মাধ্যমে। কারণ অনেক সময় আমরা দেখি, সবাই বিচ্ছিন্নতায় ভুগছি। আমরা হয়তো একটা কথা বলছি, কিন্তু ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে পারছি না। এ বিষয়ে একটি কমিটি করে দিলে হয়তোবা আমাদের জন্য ভালো হবে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আমাদের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এখানে আমাদের উদ্ভাবনের দরকার আছে। অনেক সময় হয় কি, নতুন অনেক কিছু আমাদের হঠাৎ করে প্রডাকশন ফ্লোরে দিতে হয়, যেটি প্রেসক্রাইবড। ধরেন আমাদের স্থানীয় পর্যায়ে নির্ধারিত মানদণ্ডের একটা ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সফটওয়্যার নেই এখন পর্যন্ত। সব বিদেশ থেকে আসছে। আসলে খুব মৌলিক জায়গাগুলোয় আমরা আটকে যাচ্ছি। কারণ কিছুতেই সেগুলো হচ্ছে না। এর অর্থ দাঁড়ায় উদ্ভাবনের একটা ঘাটতি বা অভাব আছে।

