ক্ষুদিরাম বসু: স্বদেশী আন্দোলনের পথিকৃৎ

ক্ষুদিরাম বসু: স্বদেশী আন্দোলনের পথিকৃৎ

মো. সাইফুল ইসলাম । সোমবার, ১৪ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৬:০৯

“চিনতে না কি সোনার ছেলে, ক্ষুদিরামকে চিনতে? রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে, মুক্ত বাতাস কিনতে”। কবি আল মাহমুদ তার ‘একুশের কবিতা’ কবিতায় বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে এভাবেই তুলে ধরেছেন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে। ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন কনিষ্ঠ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী, যিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের শহীদ অগ্নিকিশোর ক্ষুদিরাম বসুকে নিয়ে লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম..

ক্ষুদিরামের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে অনেক কবিতা গান রচিত হয়েছে। তাকে নিয়ে লেখা গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল “একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি। হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী”

ক্ষুদিরাম বসু কে ছিলেন?
মহান বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু, যিনি আঠারো বছর আট মাস আট দিন বয়সে দেশের জন্য মারা গিয়েছিলেন এবং তার বীরত্বকে অমর করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন ইন্ডিয়ান-বাঙালি বিপ্লবী; যিনি ইন্ডিয়াতে ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। ব্রিটিশ বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা চেষ্টার দায়ে তার ফাঁসি হয়। তার জীবনদান দেশজুড়ে স্বাধীনতা লাভের আন্দোলনকে তীব্র করে তুলেছিল এবং দেশবাসীর মধ্যে দেশপ্রেমের অনুভূতি গড়ে উঠেছিল। দেশকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করার জন্যে এগিয়ে এসেছিলেন আরও অনেকে। তারা ছিলেন অগ্নিযুগের শহীদ। ক্ষুদিরামের নিভীকতা ও সাহস সবাইকে বিস্মিত করতো।

ক্ষুদিরাম নামের কাহিনী: বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম হয় ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর। ইন্ডিয়ার পশ্চিম বঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশপুর থানার অন্তর্গত মৌবনী গ্রামে। তার পিতা তৈলোক্যনাথ বসু আর মা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। ক্ষুদিরাম বসুর তিন বড় বোন ছিলেন আর তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র পুত্র সন্তান, তার পূর্বে ক্ষুদিরাম বসুর দুই ভাইয়ের মৃত্যু হয় জন্মের পরেই। সেই সময়ের নিয়ম অনুযায়ী তার বড়বোন অনুপমা রয় তিন মুঠি চালের ক্ষুদের বিনিময়ে তাকে কিনে নেন। সেই থেকেই তার নাম হয় ক্ষুদিরাম।

শিক্ষাজীবনেই পান স্বদেশী আন্দোলনের ব্রত: ক্ষুদিরামের বড় বোন তাকে ভর্তি করে দেন মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে। এই স্কুলেরই একজন শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তার চেষ্টায় বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলন খুব জোরালো হয়ে উঠছিল। তিনি চাইছিলেন অল্পবয়সী ছেলেদের নিয়ে একটি দল গড়ে তুলতে। তার এই দলে এসে যোগ দিলেন ক্ষুদিরাম। তারপর থেকেই তার জীবনে ও ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন দেখা দিল। ক্ষুদিরাম হয়ে উঠলেন অন্য মানুষ। তার সংকল্প ছিল গ্রামের সকল মানুষকে সত্যিকারের মানুষ করে তোলা।

মানব দরদী ক্ষুদিরাম: ক্ষুদিরামের ছিল দরদী প্রাণ। আর তার মধ্যে ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। কারও অসুখ শুনলে ক্ষুদিরামের প্রাণ কেঁদে উঠতো। জনগণের সেবা করাই ছিল তার ব্রত। আবার কখনও কাউকে উপবাসী দেখলে তিনি সেখানে দৌড়ে যেতেন দুটি অন্নের ব্যবস্থা করতে। প্রকৃতির নানা দুর্যোগেও মানুষের সাহায্যের জন্য তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করতেন।

প্রথম রাজনৈতিক আভিযোগে অভিযুক্ত: তখন স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়েছে। চারিদিকে বিদেশী জিনিসের বয়কট চলেছে। চারিদিকে ব্রিটিশ জাতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও আন্দোলন শুরু হল। এই সময়ে মেদিনীপুরে একটি শিল্পমেলা বসলো। ১৯০৬ সালে মেদিনীপুরে মারাঠা কেল্লায় কৃষি–শিল্প প্রদর্শনী মেলা বসে। এই মেলা প্রাঙ্গনে সোনার বাংলা নামে বিপ্লবী পুস্তিকা বিলি করতে গিয়ে ক্ষুদিরাম প্রথম রাজনৈতিক আভিযোগে অভিযুক্ত হন। তখন ক্ষুদিরাম পুলিশের বাধা পেয়ে পুলিশের বুকে এক প্রচন্ড আঘাত করে পালিয়ে গেলেন। প্রায় তিন মাস পর তিনি ধরা পড়লেন। বিপ্লবীদের এই বই কোথা থেকে বেরিয়েছে সেই গোপন কথা জানবার জন্যে পুলিশের নানা অত্যাচার মুখ বুজে সবই সহ্য করলেন। তখন সরকার ক্ষুদিরামকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হল। এরপর থেকে তার নাম বাংলার বিপ্লবীদের মুখে মুখে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। শোনা গেল ক্ষুদিরামের প্রশংসা।

কিংসফর্ডকে হত্যা করার পরিকল্পনা: তখন মেদিনীপুরের জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন কিংসফোর্ড। এই ইংরেজ প্রশাসক ইন্ডিয়ানদের উপর নানা অত্যাচার শুরু করল। বিপ্লবীমহলে এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে বেশ ক্ষোভ দেখা দিল। মাত্র বার বছরের বালক সুশীল সেনকে বিনা অপরাধে নির্মমভাবে প্রহার করায় বিপ্লবীদের মধ্যে ক্রোধের দাবানল জ্বলে উঠলো । এক গোপন সভায় তারা অত্যাচারী কিংসফোর্ডকে হত্যার পরিকল্পনা করলেন। আর তার ভার দেওয়া হল ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীর উপর। ততদিনে ১৯০৮ সালে কিংসফোর্ড বিহারের মজঃফরপুরে বদলী হয়ে এসেছেন।

এদিকে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী মজঃফরপুরে এক ধর্মশালায় এসে উঠলেন। ঠিক করলেন তাদের পরিকল্পনা। ১৯০৮ সালের ৩০ শে এপ্রিল; পথে কিংসফোর্ড সাহেবের ফিটন গাড়ি আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন। একটু পরেই গাড়ির শব্দ শোনা গেল। সঙ্গে সঙ্গে তারা গাড়ির দিকে বোমা ছুঁড়লেন। কিন্তু যে গাড়ি লক্ষ্য করে তারা বোমা ছুঁড়েছিলেন সে গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। গাড়িতে থাকা ব্যারিস্টার কেনেডি সাহেবের স্ত্রী ও মেয়ে মারা গেলেন। এই সংবাদ শহরের সর্বত্র দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল। পুলিশের কড়া পাহারা এড়াতে পারলেন না ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল। ধরা পড়ার আগেই আত্মহত্যা করলেন প্রফুল্ল, আর ক্ষুদিরাম ধরা পড়লেন পুলিশের হাতে।

ফাঁসির মঞ্চেও ছিলেন নির্ভীক: ক্রমে বিচারের দিন ঘনিয়ে এল। আর ফাসির দিন ধার্য হল ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট। সেই দিন খুব ভোরে ক্ষুদিরাম উঠে পড়লেন। নির্ভীক হৃদয়ে তিনি ফাঁসির জন্যে তৈরি হলেন। মনের মধ্যে তিনি যেন একটা শক্তির সন্ধান পেয়েছিলেন। তাই ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও তিনি ছিলেন নির্ভীক। হাসি মুখে ফাঁসির দড়ি গলায় দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করলেন। হাসতে হাসতে মরণকে বরণ করা ক্ষুদিরামের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। কারণ তিনি দেশকে এত ভালবাসতেন যে দেশের স্বাধীনতা আনার জন্যে সব কিছু ত্যাগ স্বীকার করা তার পক্ষে কঠিন ছিল না।

দেশমাতৃকার পায়ে নিজের প্রাণ আহুতি দিয়ে অমর হয়ে রইলেন। আর তার এই উজ্জ্বল উদাহরণে দেশের তরুণ তরুণী প্রেরণা লাভ করল। স্বাধীনতার বেদীতে ক্ষুদিরামের জীবনের এই উৎসর্গ উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। বাংলা কাব্যে, সাহিত্যে, সঙ্গীতে ও ইতিহাসের পাতায় এই আত্মবলিদানের মধ্য দিয়েই বিপ্লবী ক্ষুদিরাম মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে আছেন।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading