ইউক্রেনে শরণার্থী ও মানবিক সংকট
তৌহিদ নিশান । সোমবার, ১৪ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৬:৫২
যুদ্ধ মানেই জেদ। যুদ্ধ মানেই হিংসা-দ্বেষ ও প্রতিহিংসার ফল। যুদ্ধ মানেই বেপরোয়া আচরণ ও ঘোষিত সন্ত্রাস। যুদ্ধ শুরু হলেই জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি শুরু হয়, চারদিকে জন্ম নেয় হতাশা। যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসেবে সৃষ্টি হয় শরণার্থী সমস্যা।
রাশিয়-ইউক্রেন যুদ্ধের তিন সপ্তাহের মাথায় শুরু হয়েছে চরম বিপর্যয়। রাশিয়ার আগ্রাসী আক্রমণে লন্ডভন্ড ইউক্রেনের শহর-নগর গ্রামীন জনপদ। শুধু সামরিক স্থাপনায় আঘাতের কথা বলে রাশিয়া নিরীহ মানুষের ঘর-বাড়ি, সম্পদ গুঁড়িয়ে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে বাস্তুহারা করেছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে।
যুদ্ধের তের দিনের মাথায় কমপক্ষে সাড়ে সাত হাজার যুদ্ধবিরোধী মানুষকে ধরে কারাগারে প্রেরণ করে রাশিয়া। তার অর্থ রাশিয়ার মানুষও যুদ্ধ চায় না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পুতিন বেপরোয়া। তিনি নানা অজুহাতে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন ইউক্রেনের মাটিতে।
ইউক্রেনের পাঁচটি বড় শহর বেশী আক্রান্ত হয়েছে। রাজধানী কিয়েভ, খারকিত, সুমি ও মারিউপলের সরকারী বেসরকারী স্থাপনা, বসতবাড়ির সিংহভাগ মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। রাস্তায় জমে আছে পরিত্যাক্ত অবিস্ফোরিত বোমা, ভাঙ্গাচোরা জিনিষের স্তুপ। মানুষ জীবন রক্ষার তাগিদে ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পোল্যান্ড, মলদোভা, বেলারুশ, হাঙ্গেরী, রুমানিয়া প্রভৃতি দেশের সীমান্তের দিকে ছুটে পালাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা রেডক্রস বলেছে- মারিউপলের পথে পথে মাইন ছড়িয়ে দিয়েছে রাশিয়ান বাহিনী। শরণার্থীরা মাইনের ভয়ে শহর ছেড়ে পালাতে ভয় পাচ্ছে। মার্চের ১০ তারিখে ইউক্রেনের তিনটি শিশু হাসাপাতালে বিমান দ্বারা বোমা হামলা করে ইতিহাসের ন্যক্কারজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছে রুশ বাহিনী।
দেশটিকে ‘ইউরোপের রুটির ঝুড়ি’ বলা হয়ে থাকে। খনিজ সম্পদও প্রচুর। তাই এই দেশের মানুষকে যখন জীবনের ভয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা হচ্ছে তখন সেখানকার অধিবাসীদের কিরূপ মনো:কষ্ট হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। বলকান যুদ্ধের পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সবচেয়ে বেশী শরণার্থী সমস্যা সৃষ্টি করেছে বলে বিশ্লেষকগণ মতামত ব্যক্ত করেছেন।
কামানের গোলা, বোমার আঘতে রক্ত, ধোঁয়া ও কান্নার জলে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। ইতোমধ্যে (০৮ মার্চ ২০২২) দেশ ছেড়েছেন ২০ লক্ষের অধিক মানুষ। আরো ছাড়বেন ৫০ লক্ষ মানুষ। জাতিসংঘ বলেছে- এই যুদ্ধের ফলে বাস্ত্চ্যুত হতে পারেন ৭০ লক্ষের অধিক মানুষ।
শরণার্থীদের সহায়তায় জাতিসংঘ সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সী ফান্ডের মাধ্যমে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করছে (ইত্তেফাক ৮ মার্চ ২০২২)। ইউএনএইচসিআর শরণার্থীদের রক্ষায় ১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা তহবিল সংগ্রহের চেষ্ট করছে। হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি ও অভিনেতা অ্যাষ্টন ইউক্রেনের শরণার্থীদের জন্য ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলার সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে বিশ্ব নেতা ও সংস্থাগুলোর এমন ঢিলেমী মনোভাব গোটা বিশ্বকে অতি দ্রুত ভয়ংকর বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে নিত্যপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে সব দেশে হাহাকার শুরু হয়ে যেতে পারে। মলদোভা, বেলারুশ, হাঙ্গেরী, ভারত, বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের বাজারে এই প্রভাব ইতোমধ্যে লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে। তার ওপর শরণার্থী সমস্যাকে মোকাবেলা করার সাহস ও সুযোগ হারিয়ে গেলে এবং করোনার নতুন কোন ভেরিয়্যান্ট এসে হঠাৎ পুনরায় আক্রমণ শুরু করলে আরো ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।
যুদ্ধের ফলে ইউক্রেনের মাটি, বাতাস, পরিবেশ নষ্ট করে, এত মানুষ হত্যা করে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্তুহারা ও শরণার্থী করার দায় কি পুতিন নিতে পারবে? সামনের পৃথিবীটা কি এই মানবিক দায় নিতে পারবে? এই ভয়ংকর অমানবিক দায় নেবার জন্য পৃথিবীর কোন নেতা বা কোন সংস্থা কতটা প্রস্তুত তা কেউই মুখ ফুটে বলছেন না কেন?
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

