কৃষি থেকে শিল্প প্রধান অর্থনীতিতে বাংলাদেশ

কৃষি থেকে শিল্প প্রধান অর্থনীতিতে বাংলাদেশ

রিশাদ দেওয়ান । মঙ্গলবার, ১৫ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:২৬

স্বাধীনতার আগে কৃষি খাতই ছিল এ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এখনও দেশের ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাচ্ছেন কৃষক। এখন তাদের সন্তানরা শিল্পকারখানায় কাজ করে স্বাধীন দেশটিকে উন্নতির চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশক ধরে দেশে নীরবে বেসরকারী খাতে শিল্পবিল্পব ঘটে চলেছে। ৩ হাজার থেকে বাড়তে বাড়তে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই সময়ে প্রায় ৮৮ লাখ কারখানায় পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করা হচ্ছে। এককালের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ ২০৩৫ সালে হতে যাচ্ছে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। দেশের কর্মক্ষম সাড়ে ৮ কোটি মানুষের অন্তত ৮০-৮৫ শতাংশেরই জীবিকা জড়িত বেসরকারী খাতের সঙ্গে।

সূত্রমতে, স্বাধীনতার ৫০ বছরে কৃষিনির্ভর থেকে বেরিয়ে পুরোপুরি শিল্পভিত্তিক দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে এর আগে প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন এবং ২৪ বছরের পাকিস্তানী শাসন ও শোষণের ফলে বাংলাদেশে শিল্প খাতে তেমন কোন বিকাশ হয়নি। ব্রিটিশ আমলে এদেশের কাঁচামাল দিয়ে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছিল ইংল্যান্ডে। পাকিস্তান আমলে যে কয়েকটি কারখানা ছিল তা স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানী সৈন্যদের নির্মম ধ্বংসযজ্ঞে বিনষ্ট হয়ে যায়। দেশের সবচেয়ে বড় জুটমিল আদমজী বন্ধ করে দেয়া হয়। শুধু ব্যাপক উৎপাদনের কারণে স্বাধীনতার আগেই দেশে পাট শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু এই পাট নিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্রের কারণে সেই ইতিহাসও সমৃদ্ধ নয়। নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে সোনালি আঁশ খ্যাত শুধু পাটই ছিল তখন রফতানিমুখী অর্থকরী ফসল। ১৯৭৩ সালে মোট রফতানির মধ্যে ৫২ শতাংশ পাটজাত পণ্যের দখলে ছিল। এর পাশাপাশি তখন অল্প অল্প করে চা, চিনি, কাগজ এবং চামড়া শিল্প খাতও জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়।

তবে দেশ স্বাধীনের পর শিল্প খাতের বিকাশ হতে শুরু করে। ওই সময়ে বেড়েছে কৃষি উৎপাদনও। ১৯৭২-৮১ সালের মধ্যে সরকার জাতীয়করণ নীতি গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে শিল্প খাত বিকাশে বেসরকারী খাতকে উৎসাহিত করা হয়। সরকারী বিভিন্ন উদ্যোগ ও নীতিগত সহায়তার কারণে বেসরকারী খাতে শিল্পায়নে বিপ্লব ঘটে গেছে। সময়ের বিবর্তনে বেসরকারী খাতের দ্রুত বিকাশ ঘটেছে। ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি, বৃহৎ, এমনকি ভারি শিল্পের বিকাশ ঘটছে বেসরকারী খাতের মাধ্যমেই। শিল্পায়নের সম্ভাবনা অনুমান করতে পেরে সরকার হাতে নিয়েছে ১শ’টি অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার কাজ। মূল লক্ষ্য বিনিয়োগকারী আকর্ষণ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। উন্নয়নের তাক লাগানো সব চমকে বাংলাদেশ এখন গোটা বিশ্বের কাছে অনন্য দৃষ্টান্ত। শিল্প-বাণিজ্যসহ সব খাতের ক্রমবর্ধমান বিকাশে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে দেশের অর্থনীতি। দেশ যত উন্নয়নের দিকে যাচ্ছে ততটাই শিল্প-বাণিজ্যের অবদান বাড়ছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে এই খাতের বিকাশ ঘটেছে বহুগুণ। বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের ৪৫টি দেশের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। যার আওতায় খাতভিত্তিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে রফতানি বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অগ্রাধিকার মূলক ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতির খোলনলচে পাল্টে গেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে ক্রমশ বেরিয়ে এসে শিল্প ও সেবা খাতমুখী হয়েছে অর্থনীতি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির পর্যালোচনা করেছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিএনপি) কৃষি খাতের অবদান ছিল ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ। আর শিল্প ও সেবা খাতের অবদান যথাক্রমে মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশ ও ৩৪ শতাংশ। স্বাধীনতার পর বিগত ৪৫ বছরে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলো পাল্টেছে। ক্রমশ শিল্প ও সেবা খাতের বিকাশ হয়েছে, যা অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো বদলে দিয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের হিসাবে, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তিনটি খাতের মধ্যে কৃষি খাতের অবদান তৃতীয় স্থানে। সেবা খাতের অবদান শীর্ষে। গত অর্থবছরে জিডিপিতে সেবা খাতে অবদান ছিল ৫৩ দশমিক ১২ শতাংশ। আর কৃষি খাতের অবদান কমতে কমতে ১৫ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্প খাত জোগান দিয়েছে ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

এছাড়া বেসরকারী উদ্যোক্তাদের ঋণের ব্যবস্থা, অবকাঠামোর উন্নয়ন, পরিকল্পিত শিল্পায়ন, বিদেশে বাজার সৃষ্টি, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে বাংলাদেশে শিল্পায়নের পথ প্রশস্ত হবে। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শিল্প সম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। শিল্প ব্যবস্থার উন্নতি হলে দেশের সামগ্রিক অবস্থার উন্নয়ন সাধিত হবে। শিল্প সমস্যা দূরীকরণের মাধ্যমে টেকসই শিল্প ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। এতে শিল্প কাঠামো স্বয়ংসম্পূর্ণ রূপ লাভ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ১৭ কোটি মানুষের দেশে শিল্পোন্নয়নের, বিশেষ করে এসএমই খাতের উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। কারণ কৃষি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। দেশে খাদ্য শস্যের উৎপাদন বাড়লেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জমির অপরিকল্পিত ব্যবহারের ফলে কৃষি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। অপরদিকে শিল্প খাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন, আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading