স্যানিটেশনে বাংলাদেশের সাফল্য বিস্ময়কর

স্যানিটেশনে বাংলাদেশের সাফল্য বিস্ময়কর

অনিক সরকার । মঙ্গলবার, ১৫ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:১৭

স্যানিটেশনে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ২০০০ সালে দেশের ৩৩ শতাংশ মানুষ খোলা জায়গায় মল ত্যাগ করত। বর্তমানে তা ১ শতাংশে নেমে এসেছে। খোলা স্থানে মলত্যাগকারীর হার ২০০৩ সালের ৪৪ শতাংশ থেকে প্রায় শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষকে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং নিরাপদ পানির উৎসের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ল্যাট্রিন ব্যবহার করে থাকে। স্যানিটেশন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ সাফল্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের এ সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়া ইন্ডিয়া এখনো খোলা জায়গায় মলত্যাগের দিক দিয়ে বিশ্বের ১ নম্বর দেশ। দেশটির ৪৪ শতাংশ লোক এখনো খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে। অথচ ইন্ডিয়ার অর্থনীতি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্ববৃহৎ। তার মানে অর্থনীতির আকার বা প্রবৃদ্ধির পরিমাণ নয়, বরং এরকম একটি সমস্যার সমাধান করতে দরকার পড়ে আন্তরিক উদ্যোগের।

এই ভূখণ্ডে স্যানিটেশন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে সরকারি উদ্যোগে। সেই উদ্যোগের প্রধান কার্যক্রম ছিল গ্রামাঞ্চলে, সরকারি ব্যয়ে স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন করে দেওয়া। তার সঙ্গে মানুষের অংশগ্রহণ না থাকায় অভ্যাসও পরিবর্তন হয়েছে কম লোকেরই। খোলা জায়গায় মলত্যাগের অস্বাস্থ্যকর চর্চা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। সরকারি বেসরকারি সর্বশেষ জরিপের তথ্য উপাত্তও বলছে সে কথা। ঘোষণা দেওয়া হয়েছে দেশের শতকরা ৯৯ শতাংশ নাগরিক এখন শৌচাগারে মলত্যাগ করে। খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করা মানুষের সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায়।

৭০ এর দশকে সরকারি উদ্যোগে নলকূপ এবং স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার কাজ শুরু হয়। বিশ্বব্যাংকের পানি ও স্যানিটেশন কর্মসূচি নির্ণয় করেছে যে সে সময়ে বাংলাদেশে স্যানিটেশনের হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ। সরকারি প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ স্যানিটারি ল্যাট্রিনকে জনপ্রিয় করার জন্য কখনো বিনামূল্যে, কখনো স্বল্পমূল্যে জনগণকে ল্যাট্রিনের রিং স্ল্যাব সরবরাহ করেছে। এতে সাফল্য এসেছে সীমিত আকারে। এই ধীরগতির কারণেই নব্বই দশকের শুরুর দিকেও বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ খোলা জায়গায় পায়খানা করত।

অভ্যাস বদলানোর জন্য রেডিও, টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন, নাটিকার প্রচার, পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখা ইত্যাদির পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে পথ নাটক, মানুষজনকে যূথবদ্ধ করে উঠান বৈঠক করার মতন নানামুখী উদ্যোগও নেওয়া হয়। এক্ষেত্রেও দেখা যায় সরকারের পাশাপাশি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এনজিওগুলো। বিশেষ করে ইউনিসেফ, ব্র্যাক, ওয়াটারএইড, এনজিও ফোরাম, ভারক, ডিএসকেসহ নানান বেসরকারি সংস্থা নিজ নিজ কর্মসূচির আওতায় স্যানিটেশনকে রীতিমতো সামাজিক আন্দোলনে পাল্টে দেয়। ইউনিসেফের উদ্যোগে তৈরি মীনা কার্টুন বাচ্চাদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হলেও এর মধ্য দিয়ে প্রচারিত স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য বিষয়ক বার্তা দেওয়া হয়েছিল বড় ছোট সবার জন্যই। জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম বিটিভির কারণে মীনা কার্টুন শহর এবং গ্রামে সমানভাবে জনপ্রিয় হয়। আর এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা পৌঁছে যায় দূর-দূরান্তে। বিশুদ্ধ পানি এবং স্যানিটেশনে বেসরকারি উদ্যোগের কথা এলে আলাদাভাবে ব্র্যাকের কথা বলতেই হবে। ব্র্যাক এককভাবে বাংলাদেশের স্যানিটেশনের যে পরিবর্তন আনতে পেরেছে সেটি উদাহরণ দেওয়ার মতন।

স্যানিটেশনের ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের এমন সাফল্য অর্জন অত্যন্ত ইতিবাচক। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত ‘কমিউনিটি লেড টোটাল স্যানিটেশন’ (সিএলটিএস) কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ফলেই এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তবে ‘টোটাল স্যানিটেশন’ বা মনুষ্যবর্জ্যের পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত নিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে আরও অনেক কাজ করতে হবে। সে জন্য সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের প্রয়োজন হবে।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading