অপুষ্টিজনিত সমস্যা দূর করার পদক্ষেপ নিতে হবে

অপুষ্টিজনিত সমস্যা দূর করার পদক্ষেপ নিতে হবে

আবদুল্লাহ জোবায়ের । বুধবার, ১৬ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:৪০

শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিকাশ ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতিজনিত অবস্থা বুঝাতেই অপুষ্টি শব্দটি সচরাচর ব্যবহৃত হয়। খাদ্যে এক বা একাধিক উপাদানের স্বল্পতা অর্থাৎ সুষম খাদ্যের দীর্ঘ অভাবই অপুষ্টির অন্যতম কারণ। গত কয়েক দশকে খাদ্যশস্য, ডাল, শাকসবজি, ফল, মাছ, মাংস, দুধ ও তেল খাওয়া যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া মোট খাদ্যগ্রহণও হ্রাস পেয়েছে, যা গোটা সমাজ ও জাতির জন্য এক বড় সমস্যা। অপুষ্টিতে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু, গর্ভবতী ও দুগ্ধদাত্রী মায়েরা।

শুধু সীমিত ক্রয়ক্ষমতাই অপুষ্টির কারণ নয়। খাদ্যগ্রহণের (বয়োবৃদ্ধাবস্থায় ও দীর্ঘ অসুখে অরুচি); গলাধঃকরণের (গলবিল, গলনালীর ক্যানসার), পরিপাকের (পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয় এর রোগ); শোষণের (উদরাময় জাতীয় রোগ) এবং বিপাকের (যকৃৎ এর রোগ, ডায়াবেটিস) সমস্যাদিও অপুষ্টির কারণ হতে পারে। এছাড়া পুষ্টি বিষয়ক জ্ঞানের অভাব, খাদ্য সম্পর্কে কুসংস্কার, চিরাচরিত খাদ্যাভ্যাস, অবৈজ্ঞানিকভাবে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রান্না, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পক্ষপাতমূলক খাদ্য বণ্টন, খাদ্যে ব্যাপক ভেজাল, মাতৃদুগ্ধদান বিরতির রেওয়াজ, পেটে কৃমি এবং অন্যান্য কিছু কারণে পুষ্টিগত জাতীয় মানের অবনতি ঘটে থাকে।

বাংলাদেশে প্রায় ৫ লক্ষ লোকের রয়েছে আয়োডিনের অভাবজনিত মানসিক জড়তা। এছাড়া রয়েছে আয়রণ ও ফলিক এসিডের অভাবে রক্তশূন্যতা, ভিটামিন ‘বি-২’ এর অভাবে মুখ ও জিহ্বায় ঘা। খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্যহেতু বিশেষ করে গরিবের প্রোটিন ডাল জাতীয় খাদ্যগ্রহণ যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে আর একারণে অপুষ্টির ব্যাপকতা বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে প্রায়শ মাত্রাতিরিক্ত ভোজন, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে শারীরিক শ্রমের স্বল্পতা, ফাষ্ট ফুড নামধারী জাঙ্ক ফুডের প্রচলন ও অন্যান্য কারণে অনেকেই ওজনাধিক্য এবং স্থূলতা সমস্যায় ভোগে। বাংলাদেশে এ সমস্যার ক্রমবিকাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

দেহের উচ্চতা ও ওজনভিত্তিক শ্রেণিকরণ পদ্ধতি অনুযায়ী স্বাভাবিক উচ্চতা ও ওজনসম্পন্ন শিশুদের অনুপাত কিছুটা বাড়লেও দুর্বল ও দেহের ব্যাহত বৃদ্ধি হার অপরিবর্তিত রয়েছে। লিঙ্গবৈষম্যগত বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে যে, একই বয়সের ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এবং শহরের শিশু অপেক্ষা গ্রামের শিশুরা অধিক অপুষ্ট। এক বছরের কমবয়সী শিশুমৃত্যুর হার এখন নিম্নমুখী হলেও পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুর ৫০-৬০ ভাগ মারা যায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অপুষ্টির কারণে।

সম্প্রতি পরিচালিত কিছু জরিপ থেকে দেখা গেছে যে, ১-৬ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ২ ভাগ ‘এ’ ভিটামিনের অভাবজনিত রাতকানা রোগে আক্রান্ত। অথচ দুগ্ধদাত্রী মায়েরা শিশুর ‘এ’ ভিটামিনের প্রায় ৭০% সহজেই যোগাতে পারেন। বিগত দশকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে শালদুধের উপকারিতা এবং মাতৃদুগ্ধপান উৎসাহ প্রদান কর্মসূচি আশব্যঞ্জক সাড়া জাগিয়েছে। শাকসবজি ও ফলমূল ‘এ’ ভিটামিনসমৃদ্ধ, যেগুলো বাড়ির আঙিনায় প্রায় নিখরচায় ফলানো যায়। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের উচ্চশক্তির ‘এ’ ভিটামিন ক্যাপসুল দিচ্ছে।

অপুষ্টি বা পুষ্টির অভাব এমন একটা খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী খাওয়ার ফলস্বরূপ ঘটে, যেখানে পুষ্টিকর উপাদানগুলো যথেষ্ট নয় অথবা এত বেশি যে তার কারণে স্বাস্থ্যের সমস্যা ঘটে। সংশ্লিষ্ট পুষ্টিকর উপাদানগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে: ক্যালরি, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন বা খনিজ পদার্থ। এটা অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্টভাবে পুষ্টির অভাবের প্রতি নির্দেশ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, যেখানে পর্যাপ্ত ক্যালরি, প্রোটিন বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট নেই তবে অধিক-পুষ্টিও এর অন্তর্ভুক্ত। যদি গর্ভাবস্থায় অথবা দুই বছর বয়স হওয়ার আগে পুষ্টির অভাব ঘটে, তাহলে এর ফলস্বরূপ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে স্থায়ী সমস্যা হতে পারে।

পুষ্টি উন্নত করার প্রচেষ্টা হলো উন্নয়নগত সহায়তার সবচেয়ে কার্যকর রূপ। স্তন্যপান করালে তা শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ও মৃত্যুর হার কমাতে পারে। ছয় মাস ও দুই বছরের মধ্যে ছোট শিশুদের বুকের দুধের পাশাপাশি খাবার দেওয়া হলে তা ফলাফলকে উন্নত করে। উন্নয়নশীল বিশ্বে গর্ভাবস্থায় এবং ছোট শিশুদের মধ্যে অনেকগুলি মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের সম্পূরক প্রদান করারও ভালো প্রমাণ আছে। এতে করে যে মানুষদের খাদ্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদেরকে খাদ্য দেওয়ার জন্য তাদের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া এবং অর্থ প্রদান করা এই দুটোই কার্যকর হয়, যাতে লোকেরা স্থানীয় বাজার থেকে খাদ্য কিনতে পারে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading