জনশক্তি রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়
মইনুল হাসান রক্তিম । বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:১৫
বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে জনশক্তি রপ্তানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় জনসংখ্যার অসম বণ্টন দেখা যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাসহ অনেক দারিদ্র্য দেশে সামর্থ্যরে তুলনায় অধিক জনসংখ্যা রয়েছে। তাই বিপুল জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তরের বিকল্প নেই। অধিক জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।
বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের তথ্যানুসারে বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তি ৭,০০,০৯,৩৫৩ জন। যার একটি বড় অংশ প্রবাসে রয়েছে। বিগত ৪০ বছরে প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ প্রবাসী বিদেশে গমন করেছেন এবং তা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশেই বাংলাদেশের জনশক্তি রয়েছে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে গমন করে থাকে। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হচ্ছে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। এছাড়া বাহরাইন, লিবিয়া, লেবানন, দ. কোরিয়া, মরিশাস, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালিসহ অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশের শ্রমিক কর্মরত রয়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘স্কিলড লেবার মোবিলিটি অ্যান্ড মাইগ্রেশন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের মধ্যে ২৪ শতাংশ ভারতীয়, ১৭ শতাংশ বাংলাদেশি, ১৪ শতাংশ চীনা, ১০ শতাংশ পাকিস্তানি এবং পাঁচ শতাংশ ফিলিপাইনের নাগরিক। আর বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে জড়িত। বাকিরা উন্নয়ন কাজের শ্রমিক, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়াসহ নানা কাজের সঙ্গে জড়িত।
জনশক্তি রপ্তানিতে দিন দিন বাংলাদেশের ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ১৯৭৬ সাল থেকে জনশক্তি রপ্তানি শুরু করে। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের ৭০ শতাংশের বেশি মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রবাসীদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রা বেকার সমস্যা হ্রাস, দারিদ্র্য বিমোচন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। ২০১১-১২ সালে ৬.০৮ লক্ষ বাংলাদেশি কাজের সন্ধানে বিদেশে গমন করেছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান তথা শ্রমশক্তি রপ্তানিতে আর্থিক সহায়তা প্রদান ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ সুবিধার কল্যাণার্থে সরকার প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক নামক একটি বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে।
জনশক্তি রপ্তানির ধরণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, স্বল্পদক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মোট জনশক্তি রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি। বর্তমানে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হচ্ছে। ফলে নানা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে। বাংলাদেশের জনশক্তির অধিকাংশই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে কর্মরত আছে। এছাড়া বাহরাইন, কাতার, ব্রুনাই, ব্রিটেন, আমেরিকা ও ইতালিসহ প্রভৃতি দেশেও কর্মরত রয়েছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে যেখানে ২ শতাংশ, সেখানে ২০১২ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমানে এ সংখ্যা আরও বেশি। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। দেশভিত্তিক সর্বাধিক বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানি সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২১৫,৪৫২ জন। আর বিপুল পরিমাণ জনশক্তি প্রেরণের ফলে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। ফলে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয়, জীবনযাত্রার মান প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যম হলো জনশক্তি রপ্তানি। কিন্তু বর্তমানে প্রায় তিন বছর ধরে জনশক্তি রপ্তানির নিম্নমুখী প্রবণতা রয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, দক্ষ শমিকের অভাব, বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কূটনৈতিক তৎপরতার অভাবসহ নানাবিধ কারণ এর সাথে জড়িত। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য তথা আরব বিশ্বে রাজনৈতিক সংকটের ফলে শ্রমিকরা দেশে ফিরে আসছে। তবে বর্তমানে পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে দক্ষ ও অদক্ষ জনবলের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ফলে এসব অঞ্চলে বাংলাদেশের শ্রমিক রপ্তানির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আফ্রিকা মহাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশে নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের শ্রমিকদের কাজ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সামগ্রিকভাবে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
নিজেদের কষ্টার্জিত উপার্জনের অর্থ নিয়মিত পাঠিয়ে তারা এ দেশকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গড়ে তুলছেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবাসীরা যেখানে এক হাজার ৮২০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছে, সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে দুই হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ। তৈরি পোশাকের পরে অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থান, যা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে রাখতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। প্রবাসীদের কারণে এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ রেকর্ড পরিমাণে আছে এবং এর পরিমাণ ২০২১ সালের ২৪ আগস্ট শেষে ৪৮ দশমিক ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই অবদান এতটাই শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ যে, এটা দিয়ে আট মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। রেমিট্যান্সের কারণেই ব্যাংকগুলো তারল্যসংকট কাটাতে পেরেছে। রেমিট্যান্সের টাকায় তৈরি হয়েছে ছোট ছোট উদ্যোক্তা এবং শক্তিশালী অবস্থায় দাঁড়িয়েছে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি।
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এ বিপুল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে আমাদের সকলের প্রচেষ্টার প্রয়োজন। তবেই আমরা দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করতে পারব এবং সকল অভাব অনটন দূরে টেলে আমরা সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারব।

