লতা মঙ্গেশকর: যার সুরে বিমোহিত হয়েছে বিশ্ব
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:৫১
লতা মঙ্গেশকর ইন্ডিয়ার একজন স্বনামধন্য গায়িকা। দেশটির ইতিহাসে সর্বকালের সবচেয়ে সফল গায়িকা তিনি। এছাড়া ইন্ডিয়ার ৩৬টি আঞ্চলিক ভাষাতে ও বিদেশি ভাষায় গান গাওয়ার একমাত্র রেকর্ডটি তারই। ১৯৪২ সালে ১৩ বছর বয়সে তার গানের ক্যারিয়ার শুরু হয়। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি গেয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি গান। কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী লতা মঙ্গেশকরকে নিয়ে লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম…
| “১৯৬৩ সালে ইন্ডিয়া-চীন যুদ্ধে জীবন বিসর্জন দিচ্ছেন সৈন্যরা। তখন লতা গাইলেন ‘ইয়ে মেরে ওয়াতান কি লোগো’ গানটি। তার এই গান শুনে কেঁদেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু” |
কিংবদন্তীর জন্ম ও শৈশব: তিনি এক হাজারেরও বেশি ইন্ডিয়ান ছবিতে গান করেছেন। আজ থেকে শত বৎসর পরেও হয়তো এই উপ মহাদেশের কোনো প্রান্তে কিংবা ইউরোপ আমেরিকায় কাউকে না কাউকে গেয়ে উঠতে হবে লতার গানের কলি। এখানেই সময়কে অতিক্রম করে লতা আজো অনন্যা। সুর ও সঙ্গীতের ভুবনে লতা মঙ্গেশকর এক আশ্চর্য বিস্ময়। এক কিংবদন্তী। দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী হয়ে ছিলেন।
লতা মঙ্গেশকর ১৯২৯ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ার তৎকালীন ইন্দোর রাজ্যের রাজধানী ইন্দোর (বর্তমান মধ্যপ্রদেশ) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকর একজন মারাঠি ও কোঙ্কিণী সঙ্গীতজ্ঞ এবং মঞ্চ অভিনেতা ছিলেন। তার মাতা শেবন্তী (পরবর্তী নাম পরিবর্তন করে সুধামতি রাখেন)। তারা চার বোন ও এক ভাই। বোনদের নাম হলো আশা ভোঁসলে, ঊষা মঙ্গেশকর, মীনা মঙ্গেশকর এবং ভাইয়ের নাম হলো হৃদ্বয়নাথ মঙ্গেশকর।
শৈশবে বাড়িতে থাকাকালীন কে এল সায়গল ছাড়া আর কিছু গাইবার অনুমতি ছিল না তার। বাবা চাইতেন সে শুধু ধ্রপদী গান নিয়েই থাকুক। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারান। তার আগে অবশ্য বাবার হাত ধরেই অভিনয় এবং গান শিখতে শুরু করে দিয়েছিলেন। ১৩-১৪ বছর বয়সেই প্রথম বার সিনেমায় গান গাওয়া। মরাঠি ছবিতে। মুম্বই যাওয়ার পর ১৯৪৮ সালে প্রথম হিন্দি ছবিতে গান করেন তিনি।
লতা মঙ্গেশকর এর কর্মজীবন: চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মুম্বাইয়ের ফিল্মিস্থান কর্ণধার, তৎকালীন এক মুভি মুঘল শশধর মুখার্জির কাছে সঙ্গীত পরিচালক গোলাম হায়দারের হাত ধরে পঞ্চদর্শী কিশোরী লতা গিয়েছিলেন গান গাইবার সুযোগ পেতে। সেদিন অসহায় পিতৃহারা কিশোরীকে ফিরতে হয়েছিলো শূন্য হাতে। তেরো বছরের কিশোরী লতাকে একটি সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় পুরস্কার দেবার সূত্রে হায়দার লতাকে চিনতেন। তিনিই নিলেন অনুঘটকের ভূমিকা। গোলাম হায়দারের সঙ্গীত পরিচালনায় লতার রেকর্ডিংয়ে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন দিকপাল সঙ্গীত পরিচালক খেমচন্দ্র প্রকাশ, নৌশাদ এবং অনিল বিশ্বাস। এই তিনজনই লতার সুরেলা কণ্ঠস্বর এবং গায়কীর স্বতঃস্ফূর্তিতে আকৃষ্ট হয়ে সুযোগ দিলেন নিজেদের সুরে গাইবার। শঙ্কর জয়কিষণ বরসাত ছবিতে মিরাকল করে দিলেন। এরপর এদের কাউকেই আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রায় সকল সুরকারই বাঁধা পড়ে গেলেন লতাকণ্ঠে।
লতা মঙ্গেশকর এর সুপার হিট গান গুলি: ১৯৪৯ সালে লতার গাওয়া ‘জিয়া বেকারার হ্যায়’ উতলা করে দিয়েছিলো শ্রোতাদের মন ৷ পঞ্চান্নয় ‘মন দোলে মেরা তন দোলে’ দুলিয়েছিলো সারা দেশের হৃদয়, সাতান্নতে ‘আজারে পরদেশী’ ডাক দিলো দুনিয়ার সঙ্গীত রসিকদেরকে। খ্যাতি আর জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে গেলেন কিন্নরকণ্ঠী লতা মঙ্গেশকর। ক্রমাগত সুপার ডুপার হিট বহু গানের দৌলতে ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রী মাথায় তুলে নিলো লতাজীকে। সঙ্গীত পরিচালকদেরও নয়নের মণি হয়ে উঠলেন তিনি।
গানের ভাব অনুযায়ী গায়কীকে তৈরি করে নেবার আশ্চর্য দক্ষতা লতার। একই ছবিতে তিনজন নায়িকার কণ্ঠে গান গেয়েছেন লতা, গাইবার ভঙ্গী প্রতি ক্ষেত্রেই ছিল ভিন্ন। নার্গিসের মতো প্রায় প্রৌঢ় নায়িকার কণ্ঠে যিনি মানানসই, সেই লতার কণ্ঠ অবলীলায় মিলে যায় ‘ববি’র কিশোরী ডিম্পলের সঙ্গে। শিশুকণ্ঠের গান, বিরহের বা উচ্ছ্বাসের গান, শিশুকে ঘুম পাড়ান মায়ের গান, প্রেমের গান, ভক্তিমূলক গান যাই হোক না কেন সিকোয়েন্সের সব পুরোপুরি মিটিয়ে প্রার্থিত ভাবটি অতি নিপুণতায় ফুটিয়ে তুলতে পারতেন লতা।
লতা নিজেকে ফিল্মী গানে এমন অপরিহার্য করে তুলেছিলেন যে, শঙ্কর জয়কিষণ বলতেন ‘লতাজীর হাঁচি হলে ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রির সর্দি লেগে যায়। হিন্দী সিনেমার গ্রেট শো ম্যান রাজকাপুর বলেছেন, আমরা সৌভাগ্যবান যে লতার সময় ছবি করতে পেরেছি। এমন প্রতিভা শতাব্দীতে একজন জন্মায় কি না সন্দেহ।
লতা মঙ্গেশকর এর রেকর্ড: ত্রিশ হাজারেরও অনেক বেশি গান গাইবার বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী লতা মঙ্গেশকর। বহু গান শিল্পীর নিজের সংগ্রহেই নেই। সম্পূর্ণ তালিকা উদ্ধারই বেশ শক্ত কাজ। ১৯৫৯ সালেই সপ্তাহে গড়ে তিরিশটি করে গান রেকর্ড করতে হয়েছে লতা মঙ্গেশকরকে। একাত্তর সালের মধ্যে আঠারোশো সিনেমায় লতা মঙ্গেশকর রেকর্ড করে ফেলেছেন প্রায় পঁচিশ হাজার গান।
লতা মঙ্গেশকর এর পুরস্কার ও সন্মান: লতা মঙ্গেশকর তার কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। তিনি ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা ভারতরত্ন (২০০১), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা পদ্মবিভূষণ (১৯৯৯), তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণে (১৯৬৯) ভূষিত হয়েছেন। কোলাপুর, খয়রাগড়, হায়দ্রাবাদ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট খেতাব। তেইশ বার শ্রেষ্ঠ ‘প্লে ব্যাক সিঙ্গার’ পুরস্কার অর্জন করেছেন। মধ্যপ্রদেশ সরকার তাকে দিয়েছেন ‘তানসেন পুরস্কার’। ইন্ডিয়ার চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়ছেন তিনি। গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে সর্বোচ্চ সংখ্যার গান রেকর্ডকারী হিসেবে তার নাম আসে।
কোকিলকণ্ঠের চির বিদায়: স্বরা কোকিলা লতা মঙ্গেশকর ৯২ বছর বয়সে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে মুম্বাইয়ের ব্রীচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

