৫০ বছরে বৈশ্বিক মানদন্ডে উন্নীত মানবসম্পদ সূচক
খালিদ ফরাইজি । বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:০৫
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ৫০ বছরে দেশের মানব সম্পদ উন্নয়নে বিরাট সফলতা এসেছে। জাতীয় মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে (এনএইচডিআর) বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণই সকল উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। পঞ্চাশ বছরের উন্নয়ন পথপরিক্রমায় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এটি সর্বজনবিদিত যে, কোন জাতিরাষ্ট্রের টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়ন মূল্যায়নে দক্ষ জনগোষ্ঠী প্রণিধানযোগ্য নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত। মুক্তির মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু তার নেতৃত্বে দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার উদ্দেশ্যে সূচনালগ্ন থেকেই মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রায়োগিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তার আজীবন লালিত স্বপ্ন ও সংগ্রামের অমিত ফসল স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ বিনির্মাণে ‘এসো দেশ গড়ি’ প্রত্যয়কে অবিচল ধারণ করেই মানবসম্পদ উন্নয়নে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। সুপরিকল্পিত কর্মকৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নিরলস মেধা, নিষ্ঠার সমন্বয়ে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি, ধর্মীয়, নৈতিক শিক্ষাকে একীভূত করে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক গুণগত শিক্ষার মানদ-কেই মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুরূপে চিহ্নিত করেন।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২০ সূত্রমতে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন এজেন্ডার মূল লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন। লক্ষ্য পূরণে সরকার ২০১৯-২০ অর্থবছরে আর্থসামাজিক খাতে ২৩.৬৭ শতাংশ হারে বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন খাত তথা শিক্ষা ও প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, নারী ও শিশু, সমাজকল্যাণ, যুব ও ক্রীড়া উন্নয়ন, সংস্কৃতি, শ্রম ও কর্মসংস্থানে ব্যয় করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে মানসম্মত দক্ষ, যোগ্য মানবসম্পদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বহুবিধ কর্মসূচীর মধ্যে অন্যতম ছিল মহিলা শিক্ষক নিয়োগ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, উপবৃত্তি ও ছাত্র-শিক্ষক সংযোগ ঘণ্টা বৃদ্ধি। স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা খাতে সরকারের নেয়া অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন কর্মকা-ের ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এ সংক্রান্ত সহস্রাব্দ উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। উক্ত কারণেই বাংলাদেশ দুবার জাতিসংঘ সাউথ সাউথ এ্যাওয়ার্ড লাভ করে।
বিগত ও সমসাময়িক বাজেট বিশ্লেষণ মানবসম্পদ উন্নয়নের সঠিক চিত্র যথাযোগ্য অনুধাবনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতকরা ৬০ ভাগ মহিলা শিক্ষক নিয়োগের বিধি প্রবর্তনের ফলে মহিলা শিক্ষকের হার ১৯৯১ সালের ২১.০৯ শতাংশ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৬৪.৫২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট খাতগুলোকে পূর্ণতাদান ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কার্যকরণে ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নে যথাক্রমে ১ লাখ ৪০ হাজার ২২২ কোটি (মোট বাজেটের ২৪.৬৯ শতাংশ) এবং ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৭ কোটি (মোট বাজেটের ২৫.৮১ শতাংশ) বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২০ অনুযায়ী মানব উন্নয়ন সূচকে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম, যা ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ছিল যথাক্রমে ১৪২, ১৩৯ ও ১৩৬তম। মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহ অর্থাৎ মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের নিম্নতর পর্যায়ে হলেও ইন্ডিয়া, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভূটানের অবস্থান এখনও বাংলাদেশের উর্ধে। অতএব, সূচকে এসব উর্ধমুখী দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম বিবেচনায় নিয়ে আমাদেরও উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছনোর চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। যদিও বিগত কয়েক বছর থেকে মানব উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট খাতসমূহে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি পাচ্ছে তথাপি এসব ক্ষেত্রে যৌক্তিক পর্যলোচনায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি অপরিহার্য।
বস্তুতপক্ষে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ, আত্মমর্যাদা, আত্মসমালোচনা, আত্মপ্রত্যয়ের আদর্শ পরিপূর্ণ আত্মস্থ করে অর্থ, ক্ষমতা, আধিপত্য, দুর্বৃত্তায়নের হিংস্র প্রবৃত্তি পরিহারে অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত মানবিক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় সোনার মানুষ সৃজনে মানবসম্পদ উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রীর অকুতোভয় নেতৃত্বে দেশকে প্রাগ্রসর সমাজে পরিণত করার অদমনীয় সঙ্কল্প কখনই পরাভূত হবে না।

