বিচারপতি থেকে রাষ্ট্রপতি: একজন অন্য রকম মানুষ

বিচারপতি থেকে রাষ্ট্রপতি: একজন অন্য রকম মানুষ

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:২৫

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ আর নেই। শনিবার (১৯ মার্চ) সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ সময়ে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। নব্বইয়ের আন্দোলনে এইচ এম এরশাদ সরকারের পতনের নাটকীয়তার মধ্যে আকস্মিকভাবে রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্বে আসেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী

এরশাদ পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতির পদে কে আসবে, নির্বাচন পর্যন্ত অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে থাকবেন-সেই প্রশ্নে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেয়া দলগুলো একমত হতে পারছিল না। তখন প্রধান বিচারপতিকে সেই দায়িত্ব দেয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়। আবার সুপ্রিম কোর্টে ফেরার শর্ত দিয়ে সাহাবুদ্দীন আহমদ তাতে রাজি হন। মওদুদ আহমদ উপ-রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলে সেই দায়িত্বে আসেন সাহাবুদ্দীন। বিচারপতি থেকে নাম লেখান রাষ্ট্রপতির আসনে।

বিচারপতি থেকে রাষ্ট্রপতি: ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়লে সাহাবুদ্দীন হন রাষ্ট্রপতি। পরে তার নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের পর আবার প্রধান বিচারপতির পদে ফেরেন তিনি। তার সেই ফেরার জন্য দেশের সংবিধানেও পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। চাকরির মেয়াদ শেষে ওই পদ থেকেই অবসরে যান তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই দলের প্রার্থী হিসেবে সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সাহাবুদ্দীন আহমদ। ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি সেই দায়িত্বে ছিলেন।

সংবিধানের সেই সংশোধন নিয়ে ছিলো বিতর্ক: নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরলে সংবিধানে আনা হয়েছিল একাদশ সংশোধনী। সেই সংশোধনের উদ্দেশ্য ছিল প্রধান বিচারপতির পদ থেকে সাময়িক সময়ের জন্য রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে আসা সাহাবুদ্দিন আহমদকে তার আগের চাকরিতে ফেরার বৈধতা দেওয়া। একটি মাত্র ব্যক্তির জন্য দেশের শাসনতন্ত্রে ওই সংশোধন আনা হয়েছিলো। ওই সংশোধন নিয়ে তখন অনেক বিতর্ক হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামে পরিচিতি পাওয়া নির্দলীয় সেই সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে ৬ অগাস্ট সংবিধানের একাদশ সংশোধনী পাস হয় সংসদে। তাতে প্রধান বিচারপতি থাকা অবস্থায় সাহাবুদ্দীন আহমদের উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগদান বৈধ ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি তার প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যাওয়া বৈধতা পায়। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মির্জা গোলাম হাফিজ উত্থাপিত বিলটি সংসদে ২৭৮-০ ভোটে পাস হয়। অর্থাৎ সরকারি ও বিরোধী দল সবার সম্মতিতে তা পাস হয়। সংশোধনটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায় ১০ আগস্ট। সব প্রক্রিয়া সেরে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছেড়ে প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান সাহাবুদ্দীন আহমদ। সেই পদ থেকে ১৯৯৫ সালের ৩১ জানুয়ারি অবসর নেন তিনি।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া

সর্বোচ্চ আসনে থেকেও সাদাসিধে জীবনযাপন তার: রাষ্ট্রপ্রধানের যাবতীয় খরচ বহন করে রাষ্ট্র। আইনের মাধ্যমে সেই ব্যয় নির্ধারণও করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে একজন রাষ্ট্রপতির চিকিৎসা থেকে শুরু সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। তবে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজের পরিবারের প্রতিদিনকার বাজারের খরচ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিতেন না সাহাবুদ্দীন আহমদ। বঙ্গভবনের ‘মার্কেট ম্যান’ বা পরিবারের কারও মাধ্যমে নিজের ‘পকেট থেকে’ বাজারের টাকা দিতেন তিনি। শনিবার সাহাবুদ্দীন আহমদের মৃত্যুর পর বঙ্গভবনে তার অবস্থানের সময় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে কর্মরত একাধিকজনের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
সাহাবুদ্দীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় অনেক দিন বঙ্গভবনের পেন্ট্রির (চা-নাশতা আয়োজনের দায়িত্ব) দায়িত্বে ছিলেন আবু শহীদ। দুই বছর আগে ‘স্টুয়ার্ট’ পদে অবসরে যান। বঙ্গভবনের রেসিডেন্স ব্লকে কাজ করা শহীদ সাবেক এই রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর খবর শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সাহাবুদ্দীনের সাদাসিধে জীবনযাপনের কথা তুলে ধরতে গিয়ে আবু শহীদ বলেন, স্যারের বাসার জন্য যে বাজার করা হত, তার টাকা তিনি নিজে দিতেন। তহবিল থেকে নিতেন না। ওই সময় যে মার্কেটম্যান ছিল সে এবং স্যারের পরিবারের এক সদস্য বাজারে যেতেন। শহীদ আরও বলেন, অনেকে রাষ্ট্রপতিকে উপহার পাঠাতেন। সেসব জিনিস তিনি নিজে রাখতেন না। স্টাফদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে দিতেন।

রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীপরিষদসহ রাজনৈতিক দলের শোক: সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। পৃথক শোক বার্তায় তারা সাহাবুদ্দিন আহমদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
গভীর শোক জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমু, কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহ্মুদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি সহ মন্ত্রীপরিষদের সদস্যগণ, সংসদ সদস্যগণ।শোকাবার্তায় তারা বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ১৯৯০ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও পরবর্তীতে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর ভূমিকার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

স্ত্রী ও কন্যাকে হারিয়েছিলেন নিজের জীবদ্দশায়: সাহাবুদ্দীন আহমদের দুই ছেলে রাজানীর গুলশানের বাসায় তার সঙ্গেই থাকেন। তার দুই মেয়ে বর্তমানে আমেরিকা ও ব্রিটেনে রয়েছেন। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগে ২০১৮ সালে ৮০ বছর বয়সে মারা যান সাহাবুদ্দীন আহমদের স্ত্রী আনোয়ারা আহমদ। তাদের ৫ সন্তানের মধ্যে সবার বড় ড. সিতারা পারভীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০০৫ সালের ২৩ জুন আমেরিকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

পেমই গ্রামের সাহাবুদ্দীন কর্মজীবনে ছিলেন উজ্জ্বল: সাহাবুদ্দীন আহমদ নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার পেমই গ্রামে ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জš§গ্রহণ করেন। তার বাবা তালুকদার রেসাত আহমদ ভূঁইয়া ছিলেন একজন খ্যাতনামা সমাজসেবক ও জন হিতৈষী ব্যক্তি। সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁর কর্মজীবনে প্রথমে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। ম্যাজিস্ট্রেট, মহকুমা প্রশাসক এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালের জুন মাসে তাকে বিচার বিভাগে বদলি করা হয়। তিনি ঢাকা ও বরিশালে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি তাকে বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিচারক পদে উন্নীত করা হয়। ১৯৮০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সাহাবুদ্দীন আহমদকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক নিয়োগ করা হয়। বিচারপতি হিসেবে তার প্রদত্ত বহুসংখ্যক রায় প্রশংসিত। বাংলাদেশ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর ওপর তার প্রদত্ত রায় দেশের শাসনতান্ত্রিক বিকাশের ক্ষেত্রে এক অনন্য ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তৎকালীন সরকার তার সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। ১৯৭৮ সালের আগস্ট থেকে ১৯৮২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালের ১৪ জানুয়ারি তাকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হয়।

সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ আজ: সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের মৃত্যুতে আজ রবিবার সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। আজ সকাল ১০টায় সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলেও সর্বোচ্চ আদালতের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।২০ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি রয়েছে। এ সময় চেম্বার আদালতসহ কোর্টের কয়েকটি অবকাশকালীন বেঞ্চ চালু থাকছে।

নেত্রকোণায় চোখের জলে বিদায়: সাহাবুদ্দিন আহমদের প্রথম জানাজা নেত্রকোণায় কেন্দুয়া উপজেলার পাইকূড়া ইউনিয়নের পেমই গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে সাহাবুদ্দিনের মরদেহবাহী হেলিকপ্টার হেলিপ্যাডে অবতরণ করে বলে কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মইন উদ্দিন খন্দকার জানান। তিনি বলেন, সেখান থেকে লাশবাহী গাড়িতে করে সড়কপথে নেওয়া হয় জš§স্থান পেমই গ্রামের বাড়িতে। তখন স্বজনসহ এলাকাবাসীর মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাকে একনজর দেখতে সবাই ভিড় জমান। বিকাল সোয়া ৪টায় বাড়ির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জানাজার নামাজ। জানাজায় সাবেক রাষ্ট্রপতির আত্মীয়-স্বজন, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধিসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
ইউএনও আরও বলেন, পরে বাড়ি থেকে আবার সড়কপথে গাড়িতে করে মরদেহ হেলিপ্যাডে নিয়ে আসা হয়। পরে হেলিকপ্টারটি মরদেহ নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

বনানী কবরস্থানে দাফন আজ: সাবেক রাষ্ট্রপতি ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে আজ রাজধানীর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে। সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণস্থ জাতীয় ঈদগা মাঠে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধানকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading