বইমেলা ও আমাদের প্রকাশনা শিল্প
শবনম জান্নাত । রবিবার, ২০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:০০
বাংলা একাডেমির বহুল আলোচিত একুশের বইমেলা শেষ হয়েছে। করোনার গজেন্দ্রগামিতায় গত দুটি বছর এবং এবার ‘কি জানি কি হয়’ পরিস্থিতির কারণে বইমেলার আয়োজন অনুষ্ঠান বেশ চ্যালেঞ্জর সম্মুখীন হয়। এ সুবাদে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের অবস্থা ব্যবস্থায় চোখ বুলানোর কিছুটা অবকাশ মিলে। এটা অবশ্য বলার সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি যে বাংলাদেশের প্রকাশনা এখনো শিল্প হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির হিসাব মতে বাংলাদেশে বইয়ের প্রকাশনা ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজারের মত প্রকাশক-ব্যবসায়ী। তবে এসব প্রকাশকের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে কী পরিমাণ বই বের হয় তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না।
দেশে কয়েক হাজার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থাকলেও বই বিক্রি ও প্রকাশের সংখ্যা বিবেচনায় হাতেগোনা কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নাম শোনা যায়। তবে এসব প্রকাশকদের অভিমত প্রকাশনাটা এখন শুধু মধ্যম আয়ের একটা ব্যবসা হিসেবে দাঁড়াতে পেরেছে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৫ শতাংশ মধ্য পর্যায়ের প্রকাশনা শিল্প পরিবার (যেমন ইউপিএল, মুক্তধারা, মওলা ব্রাদার্স, আগামী, অন্যপ্রকাশ ইত্যাদি) ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানভিত্তিক (যেমন বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি), ৫ শতাংশ গ্রুপভিত্তিক (যেমন প্রথমা, পাঠক সমাবেশ ইত্যাদি) বাকি সব শৌখিন, মৌসুমি, ক্ষুদ্র পর্যায়ের প্রকাশক কিংবা বিক্রেতা। আবার বইয়ের ক্রেতারাও বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। সিংহভাগ ক্রেতা সরকারি-বেসরকারি সংস্থা প্রতিষ্ঠান (৬০%), সাধারণ গ্রন্থাগার (৮%), শৌখিন পাঠক (৭%), হুজুগে পাঠক (১৫%), লেখকরা নিজে (১০%)। লেখকদের শ্রেণিবিন্যাস এরকম সারবান সাহিত্য রচয়িতা (১৫%), অ্যাকাডেমিক, গবেষক ও বিশ্লেষক (১০%), সাময়িক উদ্দীপ্তকারী পাঠরোচক ফিকশন রচয়িতা (৩৫%), শৌখিন (১৫%), প্রচারসর্বস্ব-আহ্লাদি ও ভবঘুরে লেখক বা কবি (২৫%)।
বিগত এক দশকে বাংলা একাডেমির বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত, পরিবেশিত ও বিক্রীত বইয়ের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায় সরকারি প্রণোদনায় উপলক্ষধর্মী প্রকাশনা ও বিক্রয়, পাঠকপ্রিয় ফিকশন প্রকাশ ও বিক্রয়কে সংকুচিত করে চলেছে, একই সঙ্গে সারবান ও সৃজনশীল রচনার প্রকাশ ও বিপণন, ক্রেতা বাজেটে চলছে মরাকাটাল। গোটা প্রকাশনা শিল্পকে উত্তর-দক্ষিণ মেরুতে বিভক্ত করেছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের প্রকাশকদের মধ্যে বেড়েছে ব্যবধান, প্রাসাদ-প্রযত্ন প্রাপ্ত ডানপন্থি লেখকদের অগ্রগামিতায় সৃজনশীল অন্য লেখকরা প্রকাশনায়, প্রকাশকের সৌজন্যলাভে এবং বিপণন পর্যায়ে কঠিন খট-খইট্যা আচরণের শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশের প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তেমন বৈচিত্র্য আসেনি। যে কারণে পাঠকের অবস্থান দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়া ভালো বইয়ের পাঠক বৃদ্ধির জন্য শুরুতে যে প্রচারণা দরকার তা অনেক প্রকাশকরা করেন না। পাঠক বই সম্পর্কে আগাম তথ্য পায় না, ফলে বইও আশানুরূপ বিক্রি হয় না। প্রকাশকদের মতে, ‘আমাদের দেশ ক্রমান্বয়ে অনেক গুণী লেখক হারাচ্ছে, কিন্তু ওই হারে নতুন লেখক তেমন সৃষ্টি হচ্ছে না, তাই বইয়ের পাঠকও বাড়ছে না। যেমন হুমায়ূন আহমেদ থাকতে তার বই দেড় থেকে দুই লাখ কপি অনেক প্রকাশকই বিক্রি করতেন। পাঠকও ছিল অনেক। এছাড়া আগে যেমন তরুণ ছেলেমেয়েদের কাছে বই একটা বিনোদনের মাধ্যম ছিল, এখন কিন্তু কম্পিউটারই বিনোদনের মূল মাধ্যম হয়ে গেছে। কম্পিউটারে ইন্টারনেটে সময় দিচ্ছে সবাই। তরুণ পাঠকদের অনেকেই বই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।’
এটা ঠিক যে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে অনেকেই ই-বুকের প্রতি নির্ভরশীল হতে থাকায় সনাতন প্রকাশনা শিল্পের অনেকটাই ক্ষতি হচ্ছে, পাঠকও দিন দিন কমে যাচ্ছে। মেধাবী তরুণ পাঠকদেরও অভিমত ও পরামর্শ হলো, বর্তমান অবস্থাতে পাঠক শ্রেণিকে বইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে হলে প্রকাশকদের বিকল্প ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে। আর বর্তমান যেহেতু প্রযুক্তির যুগ তাদের কিছুটা প্রযুক্তি নির্ভরও হতে হবে। যেমন প্রকাশকরা যদি ই-বুক চালু করে তাহলে ইন্টারনেটে যারা সময় ব্যয় করছে তাদের একটা অংশও পুনরায় পাঠক হয়ে উঠতে পারে। প্রকাশকরাও ই-বুক বিক্রি করে অনেক লাভবান হতে পারেন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক

