বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ : ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ : ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী

সাইফুল অনিক । সোমবার, ২১ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:৪১

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিশেষ সময়ের নায়ক তিনি। একটা সময় এসেছিল যখন তার কোনো বিকল্প ছিল না। সেই সময়ে আঁধার ঘরের আলো ছিলেন তিনি। উত্তাল সময়ে ঢেউ সামাল দিয়ে তীরে ভিড়িয়ে ছিলেন তরী। ১৯৯০ সালের বড় দুঃসময়ে তিনি হয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি থেকে রাষ্ট্রপতি। দায়িত্ব শেষে আবার ফিরেছিলেন তার পদে। ১৯৯৬ সালে আবারও তাকে ডেকে এনে বসিয়ে দেয়া হয় রাষ্ট্র্রের সবচেয়ে সম্মানের আসনে।

সাহাবুদ্দীন আহমদ তার কর্মজীবনে প্রথমে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। ম্যাজিস্ট্রেট, মহকুমা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালের জুন মাসে তাকে বিচার বিভাগে বদলি করা হয়। তিনি ঢাকা ও বরিশালে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার নিযুক্ত হন।

১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি তাকে বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিচারক পদে উন্নীত করা হয়। ১৯৮০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তাকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। বাংলাদেশ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর ওপর তার দেওয়া রায় দেশের শাসনতান্ত্রিক বিকাশের ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। যদিও সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

তার কলেজ শিক্ষক সৈয়দ বদরুদ্দিন হোসাইন তাকে নিয়ে ‘বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাজনীতিক নন’ নামে বই লিখেছেন। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ বিধানে তাকে রাজনীতি ও রাজনীতিক পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতে হয়েছে। তবে তিনি রাজনীতির দ্বন্দ্ব ও দলাদলি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত রেখেছেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি নিজেকে নিরপেক্ষতার এমন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল দিয়ে ঘিরে রেখেছেন।

১৯৯০ সালের শেষ দিকে স্বৈরাচারী শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন রূপ নেয় গণ-অভ্যুত্থানে। এরশাদ চেয়েছিলেন ক্ষমতায় থেকে তিনি আরেকটি নির্বাচন করবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দল, বিএনপির নেতৃত্বে সাত দল ও পাঁচদলীয় বাম জোট তার পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকে। বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে এরশাদ ২৭ নভেম্বর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন, কারফিউ জারি করেন। কিন্তু মানুষ তার নির্দেশ মানেনি। তারা কারফিউ ভেঙে রাজপথে নেমে আসে। ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করেন এবং তিন জোটের রুপরেখা অনুযায়ী তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তারপরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা।

১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পুনরায় সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হয় এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি পদে ইস্তফা দিয়ে আগের দায়িত্বে ফিরে যান। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতারা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। প্রথমে তিনি রাজি হননি। পরে শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হলো যে তিনি রাজি না হলে তার বাড়ির সামনে বসে অনশন করবেন। শেষ পর্যন্ত সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে রাজি হলেন।

আওয়ামী লীগ শাসনামলের পাঁচ বছর সাহাবুদ্দীন আহমদের সঙ্গে বড় ধরনের কোনো মতভেদ হয়নি। তার পরামর্শেই আওয়ামী লীগ সরকার প্রচলিত আইনে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছিল। ফলে, বিচার প্রলম্বিত হলেও এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেননি। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময় এবং ঘটনার সাক্ষী ছিলেন তিনি। ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন। সেই থেকে তিনি নিজ বাসায় প্রায় স্বেচ্ছাবন্দি জীবন কাটিয়েছেন। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমরা দলের বাইরে সবকিছু শত্রু মনে করি।

মতের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তাকে এড়িয়ে চলি। তাই তার খোঁজখবর কেউ রাখেনি। সাহাবুদ্দীন আহমদ এ দেশের আইনের শাসন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় যে অবদান রেখে গেছেন, গণতন্ত্র উত্তরণে যে অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন, জাতি তা অবনতমস্তকে স্মরণ করবে চিরকাল। এই মানুষটির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক : সাংবাদিক।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading