রাশিয়া কি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে?

রাশিয়া কি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে?

একেএম শামসুদ্দিন । সোমবার, ২১ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:৩৭

সময় যতই যাচ্ছে, ইউক্রেন সংকট যেন আরও জটিল আকার ধারণ করছে। প্রথমে মনে করা হয়েছিল সহজেই কিয়েভ দখল করবে রাশিয়া; কিন্তু সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা মার দিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেনীয় সেনারা। কিয়েভ দখল করতে মস্কোর আরও কিছুদিন সময় লাগবে বলে মনে হয়। বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তেমনই মনে হচ্ছে, রাশিয়ার কিয়েভমুখী অগ্রাভিযান ঠেকাতে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে ইউক্রেনীয় সেনা। তবে সময় একটু বেশি লাগলেও ইউক্রেনে রাশিয়া পরিকল্পনামাফিকই এগিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া অবশ্য ইউক্রেনে রুশপন্থি সরকার গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে। ইউক্রেনের মেলিটোপোল ও ডিনিপ্রোরুডনের বর্তমান মেয়রকে সরিয়ে দিয়ে রুশপন্থি মেয়রদের বসিয়ে এ প্রক্রিয়াটি শুরু করে দিয়েছে তারা। যদিও সংশ্লিষ্ট শহর দুটোর নাগরিকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছে; তাতে রাশিয়ার মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়বে বলে মনে হয় না। বলাই বাহুল্য, কিয়েভ দখল না করা পর্যন্ত রাশিয়া তাদের মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। এজন্য তাদের আরও অস্ত্র, অর্থ ও জনবল খোয়াতে হবে।

কিয়েভ শহরের নাগরিকরা ইতোমধ্যে ইউক্রেন সেনাদের সহযোগিতায় পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বেসামরিক নাগরিকদের পাশে পেয়ে ইউক্রেন সেনারা দ্বিগুণ আত্মবিশ্বাসী হয়ে রাজধানী কিয়েভে অগ্রসরমান রুশ সেনাদের ঠেকাতে শেষ চেষ্টা চালাবে সন্দেহ নেই। যদিও রাজধানীর প্রায় অর্ধেক অধিবাসী ইতোমধ্যেই অন্যত্র সরে পড়েছেন। তারপরও এখনো যারা শহরটিতে রয়ে গেছেন, তারা নানাভাবে যতটা সম্ভব সাহায্য করে যাচ্ছে ইউক্রেন সেনাসদস্যদের। রাশিয়ার সেনারা কিয়েভের আশপাশের এলাকা দখল করে নিলেও কিয়েভ দখল করতে পারেনি। রাশিয়ার সেনাবাহিনী যে টাইম এবং স্পেস অর্থাৎ সময় ও ভূমি দখলের হিসাব ধরে কিয়েভ অভিমুখে অভিযান চালিয়ে এসেছে, সে হিসাব অনুযায়ী কিয়েভকে তাদের আয়ত্তে আনতে পারেনি। অপরদিকে রাজধানীর চারপাশে, এমনকি শহরের অভ্যন্তরেও শক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে ইউক্রেন সেনারা। এমন পরিস্থিতিতে কিয়েভ দখলে কী পরিমাণ যে রক্তপাত ঘটবে তা এ মুহূর্তে কল্পনা করা যাচ্ছে না।

ইউক্রেন পরিস্থিতির দ্রুতই পরিবর্তন হচ্ছে। কখন যে কী হয়ে যায় বলা মুশকিল। প্রায় প্রতিদিনই প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হচ্ছে। ইউক্রেন সংকটে ইউরোপীয় দেশগুলো যে রাশিয়াকে সহজে ছাড় দেবে না তা লক্ষণীয়। কিয়েভ দখলের ঠিক আগ মুহূর্তে ইউরোপের দেশগুলো মনে হয় নড়েচড়ে বসেছে। এরই মধ্যে ইউরোপের তিনটি দেশ পোল্যান্ড, চেক রিপাবলিক ও স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিয়েভ সফর করেছেন। ইউক্রেনকে কীভাবে আরও বেশি সাহায্য করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যে আগামী সপ্তাহে মিটিং হবে, তার ঠিক পূর্বক্ষণে তাদের এ সফর গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই। তবে তাদের এ মিটিং রাশিয়ার মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে হয় না।

এ কথা ঠিক, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ইউরোপের কোনো কোনো দেশের সাদা চামড়ার মানুষ মুখে যত মানবতার কথা বলুক, আদতে তারা আজও বর্ণবাদী রয়ে গেছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর এযাবৎ ২০ লাখ ইউক্রেনীয় নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এসব মানুষ পোল্যান্ডসহ আশপাশের ইউরোপীয় দেশে আশ্রয় নিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এ উদ্বাস্তুদের সাদরে গ্রহণ করে নিলেও অতীতে অশ্বেতাঙ্গদের বেলায় ঠিক উল্টো কাজটি করেছিল তারা। অতীতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী সিরিয়া-আফগানিস্তানে বোমাবর্ষণ করে যখন দেশ দুটোকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, তখন সে দেশের বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় দিতে ইউরোপীয় এ সাদা চামড়ার মানুষদের ছিল যত আপত্তি। রাশিয়ার আক্রমণের পর ইউক্রেনের নাগরিকদেরও বর্ণবাদী আচরণ করতে দেখা গেছে। ভারতীয় শিক্ষার্থীসহ এশিয়া-আফ্রিকা মহাদেশের নাগরিকদের শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ইউক্রেনীয়দের যে বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছে, তার ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। সাদা চামড়ার মানুষ ছাড়া এশিয়ান ও আফ্রিকার মানুষের বাস, ট্রেন এবং অন্য কোনো পরিবহনে উঠতে বাধা দেওয়া হয়েছে। তাদের বর্ণবাদী এ আচরণ ছিল মর্মান্তিক ও অমানবিক।

ইউরোপের বুকে ইউক্রেন বসনিয়া-হার্জেগোবিনার মতো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে। রাশিয়া জড়িয়ে পড়বে আফগানিস্তানের মতো আরও একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading