মাস্টারদা সূর্য সেন: উপমহাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক

মাস্টারদা সূর্য সেন: উপমহাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক

সাইফুল অনিক । মঙ্গলবার, ২২ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:৩৫

উপমহাদেশের স্বাধীনতা একদিনে ও এককভাবে আসেনি। এর পেছনে আছে বহু বছর ও বহু মানুষের ত্যাগ ও প্রেরনা। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে তখন আন্দোলন চলছে। চারিদিকেই ছড়িয়ে পড়েছে বিপ্লবের দাবানল। যেমন গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠেছে, তেমনি বিপ্লবীদের হিংসাত্মক আন্দোলনও বেড়ে চলেছে। সেই মহেন্দ্রক্ষণে, আবির্ভূত হয়েছেন বিপ্লবী মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন। উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করা মাস্টারদা সূর্য সেনকে নিয়ে লিখেছেন মো. সাইফুল অনিক।

সূর্য সেন কে ছিলেন?
সূর্যকুমার সেন যিনি মাস্টারদা সূর্য সেন নামে সমধিক পরিচিত। তার ডাকনাম ছিল কালু। উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া এই বাঙালি বিপ্লবী তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং নিজ জীবন বলিদান করেন। সূর্যসেনের বাহিনী কয়েকদিনের জন্যে ব্রিটিশ শাসনকে চট্টগ্রাম এলাকা থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল।

বীর বিপ্লবী, সশস্ত্র সংগ্রামী, তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সর্বাধিনায়ক ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে প্রাণ দিয়ে স্বাধীনতার জয়গান গেয়ে গেছেন। তিনিই প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বের জন্য এগিয়ে আসেন গড়ে তোলেন সশস্ত্র সংগ্রাম। চট্টগ্রামের বিভিন্ন অস্ত্রাগার লুণ্ঠন তার বুদ্ধি পরামর্শ নেতৃত্বেই সংঘটিত হয়েছিলো। সূর্য সেনের বিপ্লবী কর্মকান্ড, দুঃসাহসী অভিযান, সঠিক নেতৃত্ব এই উপমহাদেশের মানুষকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলো। দেশের তরুণ ও যুবশক্তি তার আত্মাহুতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে মরণপণ স্বাধীনতা সংগ্রামে দলে দলে ঝাপিয়ে পড়ে।

শৈশবেই বাবাকে হারান তিনি
মাষ্টারদা সূর্য সেন চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার অন্তর্গত নোয়াপাড়া গ্রামে ১৮৯৪ সালের ২২ শে মে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিলো রাজমণি সেন। মায়ের নাম শশীবালা। সূর্য সেনরা ছিলেন চার বোন ও দুইভাই। সূর্য সেনের যখন চার বছর বয়স তখন তার বাবা মারা যান। সূর্য সেন তার কাকা গৌরমণি সেনের কাছে মানুষ হন। ১৯১৭ সালে তিনি বি.এ. পাস করেন।

স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান
বালক বয়স থেকেই সূর্য সেন বুঝতে পেরেছিলেন যে, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার থেকে ছুটে আসা ইংরেজরা আমাদের শত্রু। শত্রুদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতেই হবে। তাই কলেজে পড়ার সময়ই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, উপমহাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি বিপ্লবী সংগ্রামে যোগদান করবেন। বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে পড়ার সময় কলেজের এক অধ্যাপক সতীশচন্দ বক্রবর্তী তাকে ধীরে ধীরে বিপ্লবীভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করেন। ইংরেজদের শোষণ নির্যাতন থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করার জন্য সুর্য সেনের হৃদয় মন তৈরি হয়েছিলো। ইতোপূর্বে জাস্টিস কিংসফোর্ডকে হত্যার চেষ্টার জন্য ক্ষুদিরামের ফাঁসিতে বিপ্লবী নায়ক সূর্য সেনের হৃদয় ও মনকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এদেশ থেকে ইংরেজদের বিতাড়নের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষা নেন।

চট্টগাম বিপ্লবী দলে যোগদান
সে সময় চট্টগ্রামে একটি ক্ষুদ্র গোপন বিপ্লবী দল ছিলো। ১৯১৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে এই বিপ্লবী দলের কয়েকজন ছাড়া বাদবাকি প্রায় সকলকে গ্রেফতার করে সরকার জেলে আটকে রেখেছিলো। সূর্যসেন এই সময় চট্টগ্রামে তাদের সঙ্গে যোগ দেন। বিপ্লবের জন্য স্বচ্ছ চিন্তা, জ্ঞান, বুদ্ধি ও মেধা অন্যদের তুলনায় বেশি থাকায় তিনি কিছুদিনের মধ্যেই দলের একজন নেতা হয়ে ওঠেন। বিপ্লবীরা তার ওপরই সব ব্যাপারে বেশি ভরসা করতো।

সূর্যসেন থেকে মাস্টারদা সূর্যসেন
সূর্য সেন পরে ছাত্রদের মাঝে বিপ্লবের মন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করেছিলেন। সূর্য সেন তার চরিত্রের মাধুর্য দিয়ে বুঝিয়ে সুজিয়ে দলে দলে যুবকদের তার বিপ্লবী দলে টেনে আনেন। তিনি দেশপ্রেমের শিখাকে প্রত্যেকের অন্তরে জ্বেলে তোলেন। ছাত্রদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মেলামেশার কারণে তিনি নিজের স্কুল ও শহরের বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ছাত্ররা একান্ত আপনজনের মতো তাকে ‘মাষ্টারদা’ বলে ডাকতে শুরু করে। এই ডাক তিনি খুব পছন্দ করতেন।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন
১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল মাষ্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে মাত্র কয়েকজন যুবক রাত সাড়ে দশটায় চট্টগ্রাম পাহাড়ের উপর অবস্থিত অস্ত্রাগারটি আকষ্মিকভাবে আক্রমণ করে দখল করে নেন। তারা সমস্ত অস্ত্র লুণ্ঠন ও ধ্বংস করে ফেলেন। সূর্য সেন সেই রাতে ঘোষণা করেন যে, চট্টগ্রাম এই মুহূর্তে দুশো বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল চূর্ণ করেছে। এই মুহূর্ত থেকে স্বাধীন চট্টগ্রাম।

গেরিলা যুদ্ধ ও গ্রেপ্তার
মাষ্টারদার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম শহর ৪৮ ঘন্টার জন্য ইংরাজশাসন মুক্ত ও স্বাধীন ছিল। জালালাবাদ পাহাড়ে বিপ্লবীদের মুখোমুখি সংঘর্ষ শেষ হবার পরেও তারা টানা তিন বছর গেরিলা যুদ্ধ চালিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সৈন্যদের দৃষ্টি থেকে মাষ্টারদাকে আড়ালে রাখার উদ্দেশ্যেই বিপ্লবীরা এই যুদ্ধ চালিয়েছিলেন। বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তারের হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছেন মাষ্টারদা। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। চট্টগ্রামের কাছেই গইরালা গ্রাম। সেখানে এক বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন মাষ্টারদা। এক জ্ঞাতি ভ্রাতার বিশ্বাসঘাতকতায় ব্রিটিশ সৈন্যরা তার সন্ধান পেয়ে যায়। ১৯৩৩ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী গ্রেপ্তার হন মাস্টার দা।

সূর্য সেনের মৃত্যুদণ্ড
ব্রিটিশ সরকারের আদালতে বিচারের নামে হল প্রহসন। বীর বিপ্লবী সূর্যসেনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। ১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি ঘাতকের হাতে সূর্য সেনের ফাঁসি হল।

হাইলাইট
ফাঁসির আগের দিন প্রিয় দেশবাসীর উদ্দেশ্যে সূর্য সেন একটি চিঠিতে লিখেছেন, আমার আসন্ন মৃত্যুর স্পর্শ যদি তোমাদের মনকে এতটুকুস্পর্শ করে, তবে আমার এই সাধনাকে তোমরা তোমাদের অনুগামীদের মধ্যে ছড়িয়ে দাও। যেমন আমি ছড়িয়ে দিয়েছিলাম তোমাদের মধ্যে। বন্ধুগণ, এগিয়ে চলো। কখনো পিছিয়ে যেও না। দাসত্বের দিন চলে যাচ্ছে। স্বাধীনতার লগ্ন আগত ওঠো জাগো জয় আমাদের সুনিশ্চিত।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading