বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী মৃত না জীবিত: বিতর্কের অবসান হওয়া জরুরি
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৭ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৪০
হারিছ চৌধুরী, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ছিলেন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর লাপাত্তা হয়ে যান তিনি। তখন থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পলাতক। একাধিক মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামী, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের তালিকায় নাম থাকা হারিছ চৌধুরীর গণমাধ্যমে প্রকাশিত মৃত্যুর খবর সম্প্রতি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হারিছ চৌধুরী সত্যিকারেই মৃত না জীবিত এই বিতর্কের অবসান হওয়া এখন জরুরি। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির
সম্প্রতি বেশক’টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর সংবাদ। হারিছ চৌধুরীর মেয়ে ব্যারিস্টার সামিয়া চৌধুরীর দাবি হারিছ চৌধুরী ছদ্ম নামে ঢাকায় অবস্থান করেছিলেন ও রাজধানীর একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তবে এই বিষয়ে বিএনপি’র কোনো প্রতিক্রিয়া এখনও আসে নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছেন, মৃত্যুর বিষয়টি এখনও তদন্তের বিষয়। তারা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করতে চান। দুপক্ষের ভিন্ন ভিন্ন অভিমতে হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর বিষয়টি এখন ধুম্রজালে রূপ নিয়েছে। সবকিছুর পর্যালোচনায় হারিছ চৌধুরী মৃত নাকি জীবিত এই বিতর্কের দ্রুত অবসান হওয়া এখন সময়ের দাবি। তার মৃত্যুর সংবাদটি যেন চলমান মামলা অবসানের কোনো ষড়যন্ত্র না হয় সেদিকে তৎপর থাকতে হবে।
জীবিত থাকলে গ্রেপ্তার করুন, মৃত হলে ঘোষণা দিন: হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক এখন সবমহলেই। অনেক প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় গোটা জাতি। সবাই সঠিক তদন্ত চায়, সত্য জানতে চায়। সকল প্রশ্নের উত্তর দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসুক। হারিছ চৌধুরী যদি প্রয়াত হয়ে তাকে সেক্ষেত্রে তা ঘোষণা করা হোক। আর যদি তিনি বেঁচে থাকেন তবে দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনা হোক এটাই এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের আইনের চোখে পলাতক হারিছ চৌধুরীর ছবি এখনও ঝুলছে ইন্টারপোলের রেড নোটিসে, যদিও মৃত্যু নিশ্চিত হলে এই তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার কথা। বলা হচ্ছে হারিছ চৌধুরী মাহমুদুর রহমান নামে মারা গেছেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগও (সিআইডি) এই বিষয়ে বেশ গুরুত্ব সহকারে তদন্তে নেমেছে। দাবি করা হয়েছে মাহমুদুর রহমান নামে ঢাকায় থাকা হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু হয়েছে এভারকেয়ার হাসপাতালে, আর তাকে দাফন করা হয়েছে ঢাকার সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের জালালাবাদের কমলাপুর এলাকায় জামিয়া খাতামুন্নাবিয়্যীন মাদ্রাসায় কবরস্থানে। সবকিছু নিয়ে তদন্ত করছেন পুলিশের এই বিভাগ।

ডিএনএ পরীক্ষার দাবি মেয়ে সামিয়ার: হারিছ চৌধুরীর মেয়ে ব্যারিস্টার সামিয়া চৌধুরীর দাবি- মাহমুদুর রহমানই হারিছ চৌধুরী। পরিচয় শনাক্তকরণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করতে সামিয়া চৌধুরী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন। ওই চিঠিতে সামিরা নিজেকে হারিছ চৌধুরীর মেয়ে পরিচয় দিয়ে জানিয়েছেন, তার বাবার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এ কারণে তিনি চিঠিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিবসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তার বাবার ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে নিজের সম্মতির কথা জানিয়েছেন। চিঠিতে সামিরা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি হারিছ চৌধুরীর পরিচয় শনাক্ত করতে কোনো উদ্যোগ নেয়, তাহলে তাতে তার কোনো আপত্তি নেই।
লিগ্যাল প্রসেস ফলো করবে সিআইডি: হারিছ চৌধুরীর ডিএনএ টেস্ট শুধু অনলাইন চিঠির ওপর ভিত্তি করে করা যায় না। এক্ষেত্রে লিগ্যাল প্রসেস মেনে ডিএনএ টেস্ট করতে হবে। গত ২২ মার্চ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান গণমাধ্যমকে এ কথা জানান। তিনি বলেন, হারিছ চৌধুরীর ডিএনএ টেস্টের বিষয়ে আমরা অনলাইনে একটি চিঠি পেয়েছি। কিন্তু এ চিঠির ওপর ভিত্তি করে অ্যাকশন নেয়া যায় না। যে আইনজীবী রয়েছেন তাকে দিয়ে লিগ্যাল প্রসেস ফলো (যথাযথ প্রক্রিয়া) করেই আমরা ডিএনএ টেস্ট করবো। আইনের বাইরে আমরা যেতে পারবো না। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা বলছেন, হারিছ চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যদি আদালত কোনো আদেশ দেয় তবেই তারা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য লাশ কবর থেকে তুলবেন। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য দুটি লাশের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে সিলেটের কানাইঘাটে দাফন হওয়া হারিছ চৌধুরীর ছোট ভাই সেলিম চৌধুরীর এবং সাভারের বিরুলিয়ায় মাহমুদুর রহমান নামে দাফন হওয়া লাশের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হবে। সিআইডি-সূত্র জানান, এ বছর ১৯ জানুয়ারি হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু নিশ্চিত হতে সিআইডিকে একটি চিঠি দেয় পুলিশ সদর দফতর। এরপর সেটি তদন্ত শুরু করে সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ বিভাগ। ২৫ জানুয়ারি এ বিভাগ থেকে সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইম বিভাগকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এক মাসের বেশি সময় তদন্ত শেষে ১৮ মার্চ পুলিশ সদর দফতরে চিঠি পাঠায় সিআইডি।
বহাল থাকছে হারিছ চৌধুরীর রেড নোটিস: চিঠির বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মহিউল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিআইডিকে চিঠি দেওয়া হয়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাটি তদন্ত করেছিল সিআইডি। ওই সংস্থার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হারিছ চৌধুরীসহ ওই মামলার পলাতক কয়েক আসামির বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির আবেদন করা হয়েছিল ইন্টারপোলে। কিন্তু তারা তদন্ত করে যে চিঠি দিয়েছেন তাতে হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা নেই। তাই আমরা ইন্টারপোলের রেড নোটিস বহাল রাখছি।

হারিছ চৌধুরীর নামে যত অভিযোগ-মামলা : বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হিসেবে প্রতাপশালী হারিছের সবার চোখ এড়িয়ে দীর্ঘদিন ঢাকায় অবস্থান করা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার মামলায় যাবজ্জীবন সাজা নিয়ে পলাতক হারিছ চৌধুরী নামটির সঙ্গে ইন্টারপোলের রেড নোটিস সম্পর্কযুক্ত। পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ মামলার ফেরারী আসামি এই হারিছ চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলাও রয়েছে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর লাপাত্তা হয়ে যান হারিছ। তখন অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় তার তিন বছরের কারাদø হয়েছিল। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি গাড়ি অন্যকে ব্যবহার করতে দেওয়ায় আরেক মামলায় তার ৫৯ বছরের কারাদণ্ডাদেশও হয়। ২০১৮ সালে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে হারিছেরও সাত বছরের সাজা হয়। ওই বছর তার আগেই গ্রেনেড হামলার মামলায় হারিছের সাজার রায় হয়। এ ছাড়া সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় হারিছ চৌধুরী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ওই মামলা বিচারাধীন।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ছিলেন প্রতাপশালী নেতা: বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তিনি ছিলেন প্রতাপশালী নেতা। হাওয়া ভবন-ঘনিষ্ঠ এই নেতা আলোচনায় থাকতেন সব সময়। দল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হঠাৎ করেই তিনি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যান। এরপর থেকে ছিলেন আড়ালে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব ছিলেন তিনি। যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম মহাসচিবের পদেও ছিলেন হারিছ। সিলেটে ভোটে হারলেও খালেদা জিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর হারিছকে করেন বিশেষ সহকারী। ২০০১ সালে করেন রাজনৈতিক সচিব। ওই সরকারের আমলে ক্ষমতার অন্যতম ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠা হাওয়া ভবনের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি; ছিলেন তারেক রহমানের বিশেষ আস্থাভাজন। ফলে দল ও সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন তিনি। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে হারিছ চৌধুরীর ক্ষমতা ও সম্পদ। ভারী হতে থাকে অভিযোগের পাল্লাও।
মাহমুদুর রহমান বনাম হারিছ চৌধুরী সত্য কোনটা: ২০২১ সালের শেষ দিকে বিতর্কের শুরু। তখন কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে হারিছের মৃত্যুর খবর আসে। তবে কোথাও বলা হচ্ছিল, হারিছ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মারা গেছেন। কোথাও বলা হয়, হারিছ মারা গেছেন লন্ডনে। চলতি বছরের ৬ মার্চ দৈনিক মানবজমিনের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হারিছ ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালেই মারা যান গত ৩ সেপ্টেম্বর। তার আগে ১১ বছর মাহমুদুর নামে ঢাকার পান্থপথের একটি ফ্ল্যাটে থাকছিলেন তিনি। মাহমুদুর রহমান পরিচয়ে হারিছকে ঢাকার সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের জালালাবাদের কমলাপুর এলাকায় জামিয়া খাতামুন্নাবিয়্যীন মাদ্রাসায় কবরস্থানে ৪ সেপ্টেম্বর দাফন করা হয় বলেও দাবি করা হয়। মাহমুদুর রহমান নামে একজনকে কবর দেওয়ার কথা জামিয়া খাতামুন্নাবিয়্যীন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ জানালেও সেটা কি হারিছ চৌধুরীর কবর, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কেননা কবর কেনা হয়েছিল ফুলন নেছার নামে।
(এই প্রতিবেদনে সহযোগীতা করেছেন বার্তা সংস্থার প্রতিবেদক লিটন হায়দার, গোলাম মর্তুজা অন্তু, মেহেরুন নাহার মেঘলা ও সেলিম আহমেদ)
ইউডি/সুপ্ত

