কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
আদনান জহির । রবিবার, ২৭ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:১৬
আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরণের শিক্ষার পাশাপাশি যুগোপযোগী শিক্ষা হিসেবে কারিগরি শিক্ষা অন্যতম। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হাতে কলমে বাস্তবধর্মী শিক্ষাই হলো কারিগরি শিক্ষা। অর্থাৎ যে শিক্ষা ধরাবাঁধা নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দেশের শিক্ষার্থী সমাজকে দক্ষ এবং বাস্তবসম্মত জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে করে গড়ে তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব আমাদের দেশে এতোটাই বেশি, যা আমরা এমন প্রাত্যহিক জীবনেও পদে পদে অনুভব করে আসছি।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ছোটখাটো জিনিসপত্র থেকে শুরু করে বৃহৎ কোনো মেরামত কাজেও হাতের কাছে সময়মতো লোক পাওয়া যায় না। সেসময় টাতে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি অন্যের দ্বারস্থ না হয়ে নিজেই তা সমাধান করে ফেলতে পারে। ভোকেশনাল এডুকেশন বা কারিগরি শিক্ষা এমন এক শিক্ষা পদ্ধতি যেখানে পাস-ফেল বলে কিছু নেই। তাই পরিপূর্ণ দক্ষতা অর্জনের জন্য এবং একজন প্রতিযোগী হতে আপনাকে যতবার প্রয়োজন ততোবার পরীক্ষা দেওয়ার এবং নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ দেওয়া হয়।
কারিগরি শিক্ষায় তত্ত্বীয় পড়াশুনার চেয়ে বাস্তব প্রয়োগকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়, যাতে করে একজন কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে ভালো কাজের সুযোগ খুঁজে নিতে পারে। বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় কারিগরি শিক্ষাকে চাকুরির ক্ষেত্রেও খুব গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। তাই সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিযোগিতার বাজারে কারিগরি শিক্ষা যোগ্য প্রতিযোগী তৈরিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব যে অপরিসীম তা আমরা অনেক আগে থেকেই অনুভব করতে সক্ষম হই। এ প্রেক্ষাপটে অতি সম্প্রতি শিক্ষার মান উন্নয়নে এক হাজার ৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন করে। যেখানে ১০০ টি উপজেলায় একটি করে কারিগরি স্কুল ও পলিটেকনিক নির্মান করা হবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সরকার বলেছে, মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য কারিগরি শিক্ষার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে তারা। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষার হার ও এ শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে।

কারিগরি শিক্ষা গুরুত্ব পায় যখন সরকার আলাদাভাবে কারিগরি শিক্ষাবোর্ড গঠন করে, এবং এ শিক্ষার জন্য নতুন প্রকল্প হাতে নেয়। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে দারিদ্র বিমোচন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, আত্ম-কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কারিগরি শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার জন্য কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ প্রয়োজন। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।
গবেষকরা বলেছেন, কারিগরি শিক্ষার প্রতি সমাজের অনেকেরই নেতিবাচক মনোভাব আছে। সামাজিকভাবে ধরে নেয়া হয়, যারা পড়াশুনায় ভালো নয় তারা টেকনিক্যাল এডুকেশনে আসবে। সামাজিক মনোভাব বদলালে আরো অনেকে কারিগরিতে আসতে উৎসাহিত হবে। এখনকার ছেলেদের লক্ষ্য বাংলা, ইংরেজি শিখবো, প্রশাসনে চাকরি নেব। অথচ চাকরির বাজারে এই শিক্ষা ও সনদের কতটুকু চাহিদা তার পরিসংখ্যান রাষ্ট্রীয়ভাবেও দেশে নেই। আমাদের কতজন শিক্ষিত হচ্ছে আর কতজন চাকরি পাচ্ছে তা জানা দরকার। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বাজার চাহিদার আলোকে নয়। ফলে কিছু সেক্টরে তৈরি হচ্ছে লাখ-লাখ শিক্ষিত বেকার ও কিছু সেক্টরে দক্ষ জনবলের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে উন্নয়ন, নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশি জনবলের উপর।
আমাদের শিল্প-কারখানা, গার্মেন্ট সেক্টর থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বাইরের এক্সপার্টদের দিয়ে দিতে হয়। এখানে যদি আমাদের দেশের লোক কাজ করতে পারত তাহলে দেশের টাকা দেশেই রাখা সম্ভব হতো। তথ্য, প্রযুক্তি ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হল্যান্ডের একটি যন্ত্র যা আমাদের ক্রয় করতে লাগে ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা। অথচ মাত্র ৪০ লাখ টাকায় পলিটেকনিক পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা তা তৈরি করেছে, যা একই পাওয়ারের, দক্ষতাসম্পন্ন ও একই কাজে ব্যবহার করতে পারছি।
দেশে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বর্তমানে মাত্র ১৩.৬ শতাংশ। অথচ উন্নত দেশে এই হার ৩০ থেকে প্রায় ৭৫ শতাংশ। কারিগরি শিক্ষায় ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ে ১৪৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৪। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ, উন্নত দেশ ও ডিজিটাল ডিজিটাল বলে গলা ফাটাই। অথচ একটি সেলাইয়ের সুই, বেøড, চাকু থেকে সবরকম খেলনা ও প্রশাধনী ক্রয়ে আমরা বিদেশের উপর নির্ভরশীল।
বর্তমান যুগে শিক্ষা হতে হবে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কর্মমুখী ও জীবনমুখী শিক্ষা। যে শিক্ষা বাস্তব জীবনে কাজে লাগে না, সেই শিক্ষা অর্থহীন। বাংলাদেশের বিশাল সংখ্যক কর্মক্ষম জনশক্তিকে বাজারের চাহিদার আলোকে শিক্ষায় শিক্ষিত করা, ভাষাগত দক্ষতা এবং কারিগরি দক্ষতা দ্বারা যদি একটি দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবেই বাংলাদেশকে ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তর করা সম্ভব।
লেখকঃ কলামিস্ট।

