দেশের সমৃদ্ধি: প্রয়োজন নারীর স্বাধীনতা
মার্জিয়া রহমান স্বর্ণা । রবিবার, ২৭ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৬:১৪
কোন দেশের নারী সমাজ কতটা অধিকার, মর্যাদা ও সুবিধা ভোগ করে তার উপর নির্ভর করে সে দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য আজ বিশ্বের দেশে দেশে চলছে নানাবিধ উন্নয়ন প্রক্রিয়া। জাতিসংঘ গঠিত হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে গৃহীত হয় মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র। তাছাড়া, জাতিসংঘ ও তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, আন-র্জাতিক শ্রম সংগঠন, ইউনেস্কো প্রভৃতির মাধ্যমে নানাবিধ দলিল গৃহীত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। তাই নারী জাতির উন্নয়ন ও অগ্রাধিকার দিকে বিশেষভাবে নজর দেয়া দরকার। কেননা জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত না হলে আমাদের সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি সম্ভব নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ এবং মানবাধিকারের পূর্ণ মর্যাদা প্রদানের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে প্রতিবছর ৮ মার্চ সারা বিশ্বে পালিত হয় বিশ্ব নারী দিবস। বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। এর বাস্তবায়নে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি জরুরি তা হলো-নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো। একজন শিক্ষিত নারী মাত্রই নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। শিক্ষিত নারীর পক্ষেই সম্ভব নিজেকে স্বাবলম্বী করে তোলা। আর স্বাভাবিকভাবেই অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী নারীর ক্ষেত্রে অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রাও কমে আসবে।
স্বাধীনতার বিগত তিন দশকে বাংলাদেশের নারী সমাজের যতটুকু উন্নয়ন ও অগ্রগতি হয়েছে তার বেশিরভাগ কৃতিত্বই সরকারের। নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন তথা উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করার প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৭৩ সালে দু’জন নারীকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে। ১৯৭৪ সালে একজন নারীকে প্রথম বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়।
স্থানীয় সরকার অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক নারী অংশগ্রহণ করলেও নির্বাচিত নারীরা এখনও সীমাবদ্ধতার বেড়াজালে আবদ্ধ। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার কর্তৃক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সংশোধনের উদ্যোগ গৃহীত হলেও নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিরা তাদের সাংবিধানিকভাকে স্বীকৃত ক্ষমতার সুষ্ঠু ব্যবহার করতে পারেন নি। পুরুষ সদস্যরা নারী সদস্যদের সহজভাবে মেনে না নেয়ায় স্থানীয় সরকার পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটেছিল। তবে বর্তমানে জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য ৩০টির পরিবর্তে ৪৫টি আসন সংরক্ষণ করেছে। সরকার নারীর ক্ষমতায়নও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য গেজেটেড পদে শতকরা ১০ ভাগ এবং নন গেজেটেড পদে শতকরা ১৫ ভাগ কোটা নির্দিষ্ট করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬০ ভাগ কোটা নারীদের জন্য সংরক্ষিত আছে। সমপ্রতি সেনা বাহিনী, নৌ ও বিমান বাহিনীতে অফিসার পদে এবং পুলিশ ও আনসারে মহিলাদের নিয়োগ বাংলাদেশে নারী ক্ষমতায়নের ইতিহাসে জন্ম দিয়েছে নতুন অধ্যায়ের।
নারী সমস্যার মূলে না গিয়ে শুধু সমাজকল্যাণের মধ্য দিয়ে অনেকেই নারীর সমস্যা দূর করার চেষ্টা করেন। আজকের দিনে নারী সংগঠন, রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠন, প্রশাসন নানাভাবে যে নারী সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে সেগুলো সমাধানের জন্য গভীরে যাওয়ার ক্ষেত্রেতো বটেই চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও বহু সংগঠন এড়িয়ে যেতে চায়। বিয়ে, তালাক, যৌতুক, পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা, পেশা, সন্তান প্রতিপালন, নিরাপত্তার অভাবে এসব নানারকম সামাজিক সমস্যার সবটুকু যন্ত্রণা নারীকে ভোগ করতে হয়।
নারীর সমস্যা বিভিন্নভাবে শুধুই নারীর বলে চিহ্নিত করার ফলে এবং নারীর প্রতি সমাজের চলতি ভাবমূর্তি ও ধর্মান্ধতা নারী প্রগতির সবচেয়ে বড় অন-রায় হয়ে আছে। ফলে প্রকৃত অর্থে নারীর সামাজিক সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। প্রতি বছরই সমান তোড়-জোড় নিয়ে সেমিনার-আলোচনা সভায় তা সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। দেশের নারী সমাজের এই অবস্থান পরিপ্রেক্ষিতে নারী প্রগতি আন্দোলন গড়ে উঠেছে।
বিশ্বায়নের এই যুগে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে এদেশের প্রতিটি নাগরিককে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। যে দেশের ১৬ কেটি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী সেখানে তাদের বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়নের কথা ভাবাই যায় না। শুধুমাত্র সাংবিধানিকভাবে এবং কাগজে-কলমে নারীর অধিকার লিপিবদ্ধ করলেই চলবে না, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবীসহ দেশের আপামর জনসাধারণ সকলকেই একত্রে কাজ করতে হবে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। আর প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি নারীর সফল অংশগ্রহণই নিশ্চিত করবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি।
লেখকঃ শিক্ষিকা।

