রাজধানীর জনজীবন সংকট মোচনের উদ্যোগ জরুরি

রাজধানীর জনজীবন সংকট মোচনের উদ্যোগ জরুরি

মানিক মুনতাসির । মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:২৫

রাজধানী ঢাকা অচল নগরীতে পরিণত হচ্ছে এবং এটি শুধু নগরবাসী নয় জাতির জন্যও লজ্জা বয়ে আনছে। ঢাকার এ দুরবস্থার জন্য ব্যবস্থাপনার সংকট যেমন দায়ী তেমন দায়ী নাগরিক সচেতনতার অভাব। জনসচেতনতার অভাবে নগরজীবনে দুর্ভোগ ভাগ্যের লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটওভার ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হওয়া নাগরিকের বৃহদাংশের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। উল্টোপথে ড্রাইভিং করাকে অনেকেই অপরাধ মনে করে না এ মহানগরীতে। বছরের যে সময়েই হোক না কেন, সামান্য বৃষ্টিতেই কোথাও না কোথাও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি যেন নগরবাসীর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর টানা বর্ষণ বা ভারি বৃষ্টিপাত হলে তো কথাই নেই। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো চলে যায় পানির নিচে। ড্রেন-খাল উপচে বাড়িঘরেও পানি ঢুকে যায়। মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও কাজকর্মের পাশাপাশি বিঘ্নিত হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা।

জলাবদ্ধতার প্রধান কারণগুলো খুঁজলে প্রথমদিকে থাকবে-অপরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টেম, অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণ, পানিপ্রবাহের ছোট-বড় নালায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, বিভিন্ন স্থানে নালা সরু করে ফেলা এবং সঠিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করা, খাল দখল ও ভরাট ইত্যাদি। মূলত অপরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হলেও কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন থেকেছে। দুই সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য সেবা প্রদানকারী সংস্থার উন্নয়ন কাজে কেবল সমন্বয়হীনতা নয়, পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার অভাবও প্রকট। ২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) দুই ভাগ করার সময় বলা হয়েছিল, উন্নত নাগরিক সেবা প্রদানই বিভাজনের মূল্য উদ্দেশ্য। শুধু তাই নয়, নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই মেয়র জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করা হবে বলে নগরবাসীকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু এসব যে নিছকই গালগল্প, গত সোমবারের বৃষ্টিতে রাজধানীবাসী তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।

দুঃখজনক হলো, জলাবদ্ধতায় প্রতিবছর রাজধানীর জনজীবন স্থবির হয়ে পড়লেও এ থেকে উত্তরণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আমাদের প্রশ্ন, এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে কবে? দেখা যায়, বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাই শুধু ভেঙে পড়ে না, পাশাপাশি রাস্তায় আটকে পড়ে শ্রমজীবী-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। জলাবদ্ধতা নগরবাসীর দুর্ভোগের কারণ হলেও এ থেকে মুক্তি মিলছে না মূলত সমন্বয়হীনতা, পরিকল্পনাহীনতা এবং অদূরদর্শী পদক্ষেপের কারণে। অবশ্য এজন্য নগরবাসীর অসচেতনতাও কিছুটা দায়ী।

জলাবদ্ধতার চিত্র আমাদের সামনে যে সত্যটি তুলে ধরেছে, তা হলো-উন্নয়নের নামে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না নগরবাসী। রাজধানীর ২৬টি খাল, তিন হাজার কিলোমিটার ড্রেন ও জলাশয় ওয়াসার কাছ থেকে সিটি করপোরেশনের হাতে ন্যস্ত করা হলেও সেগুলো পৌনঃপুনিকভাবে আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং এর ফলস্বরূপ অবধারিতভাবে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে দুজন মেয়র রয়েছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন কাউন্সিলররা। সবার উচিত, সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং তা সার্বক্ষণিকভাবে পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থা নেওয়া। একইসঙ্গে আরও একটি কাজ করা জরুরি। রাজধানীর চারপাশের নদ-নদীগুলো সংস্কার করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। এর ব্যত্যয় হলে সাংবাৎরিক জলাবদ্ধতায় আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা পড়বে নগরবাসীর জীবন, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

দেশে আইন মান্যতার অভাব থাকায় অহরহ আইন ভঙ্গের ঘটনা ঘটেই চলেছে। রাজধানীর নগরজীবনের বিদ্যমান সংকটের বেশির ভাগই নিরসন করা সম্ভব আইন মেনে বা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। যেখানে সেখানে পার্কিং, উল্টোপথে ড্রাইভিং, বাসে যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানোর প্রবণতা রোধ করা গেলে রাজধানীর যানজট অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ হলে নগরজীবন আরও পরিচ্ছন্ন তথা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। আইন ভঙ্গ করলে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হয় না বলেই দেশে শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা প্রায়শই ঘটছে। নাগরিক জীবনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে শুধু ঢাকা মহানগরী নয়, সারা দেশেই তার সুফল অনুভূত হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যাদের তাদের অবহেলা যাচ্ছেতাই পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাচ্ছে।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading