স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীদের আত্মত্যাগ মনে রাখতেই হবে
মাঈশা মেহজাবিণ । বুধবার, ৩০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৪৫
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে জনযুদ্ধ। এটা রাজা-বাদশার যুদ্ধ ছিল না, কিংবা শুধু সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ছিল না। দেশের সবাই যুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলেন। যুদ্ধ সময়ে তিন কোটি চুয়াত্তর লাখ নারী ছিলেন। তারা কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সেটা হোক সম্মুখযুদ্ধে কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করে কিংবা নিজেদের জীবনযুদ্ধে (যে জীবনযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের কারণেই হয়েছিল)। অন্তত এ কথা বলা যায় রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনী তথা স্বার্থান্বেষী যুদ্ধবিরোধী ছাড়া সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর অবদান অস্বীকার করা বা ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। নারী দু’রকমভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন; প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং পরোক্ষ অংশগ্রহণ। আলোচনায় দেখানোর চেষ্টা করবো নারী কখন কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ্রহণ করেছেন, কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কতটা জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, কতটা দুর্বিসহ পথ অতিক্রম করেছেন এবং আজও তাঁদের যুদ্ধ চলছে।
এবারের নারী দিবস (৮ মার্চ) সামনে রেখে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস গুরুত্বের সাথেই বলেছিলেন, ‘লিঙ্গ সমতা ছাড়া মহামারীর ধকল সামলে উঠতে পারবে না বিশ্ব।’ তাই এবছরের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্যও ছিলো ‘আজকের লিঙ্গ সমতায় টেকসই আগামী কাল।’ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারীরা আরও বাধার সম্মুখিন হচ্ছে। তাই এই টেকসই পৃথিবীর জন্য এর একটা আশু সমাধানও দরকার।
ঠিক একইভাবে নারীরা যুদ্ধের কারণে আরও অনেক বাধার মুখে পড়ে। মানব সভ্যতার ইতিহাস বলছে, যুদ্ধ সমাজকে বিপর্যস্ত করে। আর এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এই যুদ্ধেও নারী ও অনান্য লৈঙ্গিক সংখ্যালঘুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। যুদ্ধ কীভাবে লৈঙ্গিকভাবে কোনো একটা শ্রেণিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধও তার সাক্ষী হয়ে আছে। এই যুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবেই নারীদের পাশবিক নির্মমতার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল পাকিস্তানিরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ একটা কারণে স্বতন্ত্র ও সম্মানের। যুদ্ধে নারীদের ধর্ষণ এবং এর পরবর্তী জটিলতা; গুরুত্বের সাথে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
১৯৭১ সাল দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে একটা রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। এই যুদ্ধের ইতিহাস ব্যাপক পরিসরে নথিবদ্ধ করা হয়েছে। সাথে লাখো মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথাও বড় করে দেখানো হয়। তবে সেই ইতিহাসেও পুরুষের আধিপত্য। নারীদের মুক্তিযুদ্ধের অবদানের বিষয়টিও তাই ইতিহাসের ফাঁক গলিয়ে উপেক্ষিত থাকে। অথচ এই নারীরাই স্বাধীনতা সংগ্রামে বড় অবদান রেখেছেন। নারী কেবল এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যাননি, কেবল নির্মমতাই সহ্য করেননি; উল্টো স্বাধীনতার পরও বছরের পর মুখ বুজে থেকেছেন। থেকে গেছেন স্বাধীনতা যুদ্ধের সামষ্টিক ইতিহাসের বাইরে। কেবল তাই নয় এই ধর্ষণের কারণে অনেক শিশুও জন্ম নিয়েছে, যাদের পিতা পাকিস্তানি সেনারা; পাকিস্তানীরা বাঙালিদের জাতীয়তার বিশুদ্ধতা নষ্ট করতেই পরিকল্পিতভাবে এমনটা করেছিল।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বাঙালিদেরকে ‘সাচ্চা মুসলিমের’ দেশ বানানোর গা শিওরে ওঠা নির্দেশ দিয়েছিলেন। যদিও আরেকটা আদেশের আনুষ্ঠানিক কোনো নথি নেই। তারপরও তথ্য বলছে, যে নারীরা পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছে, হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে তাদের সবাইকে ‘গর্ভবতী’ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ইয়াহিয়া ও জেনারেল টিক্কা খান। বলেছিলেন, সাচ্চা পাকিস্তানী জাতি গঠন করতে।
যার ফল হয়েছিল ভয়াবহ। প্রচলিত ইতিহাস বলছে, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে দুই থেকে চার লাখ বাংলাদেশি নারী ধর্ষণসহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পরই এসব নারীদের সম্মান দিতে মহৎ উদ্যোগ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যুদ্ধে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীদের তিনি বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত করেন। এছাড়াও তাদের বিয়ে দেওয়া, আবার কাউকে পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন জাতির পিতা। এরপরও অনেক নারী স্বাধীনতা তাদের অবদানের যোগ্য মর্যাদা পাননি। সেই অধিকার আদায়ে নারীদেরই এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের অবদান ইতিহাসে লিপিবদ্ধ না হলে, মক্তিযুদ্ধের সার্বিক ইতিহাস পূর্ণতা পাবে না।
লেখকঃ সমাজ বিশ্লেষক
ইউডি/অনিক

