সবার স্বার্থেই রক্ষা করতে হবে সেন্টমার্টিন দ্বীপ
তৌহিদুর রহমান । বুধবার, ৩০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৫০
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিন সরকার ঘোষিত একটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং পর্যটকদের অসচেতনতা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, পরিবেশ ও প্রতিবেশবিরোধী আচরণের কারণে সেন্টমার্টিনের বিরল প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। কথাগুলো সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর। সংকটাপন্ন সেন্টমার্টিন দ্বীপের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্বেগ অবশ্যই যথার্থ এবং দ্বীপটি রক্ষার লক্ষ্যে বিধিনিষেধ ঘোষণার জন্য তাদের সাধুবাদ জানাতেই হয়। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেল নাকি? গত ২০ বছর ধরে আমরা শুনে আসছি সেন্টমার্টিন দ্বীপের সংকটের কথা। ১৯৯৯ সালেই সরকার এ দ্বীপকে একটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করেছিল।
সেখানকার পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য যে ধ্বংস হতে চলেছে সে হুঁশিয়ারি পরিবেশবিদরা ও অভিজ্ঞ মহল বারবার দিয়েছেন। এ অবস্থার জন্য যে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন দায়ী-এ কথাও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলেছে অনেকবার এবং এ জন্য পর্যটন নিয়ন্ত্রণের সুপারিশও করেছে। এক সময় সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল ছোট নৌযান, যেমন: স্পিড বোট, ট্রলার বা সি ট্রাক। দ্বীপটিতে থাকার মতো হোটেল, মোটেল বা বাসস্থানের ব্যবস্থা ছিল না। সেন্টমার্টিন দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা নয় হাজার, আর বর্তমানে সেখানে প্রায় ১০ হাজার পর্যটক প্রতিদিন যায় ভ্রমণ ও বিনোদনের জন্য। তাদের অধিকাংশই সেখানে রাতযাপন করেন হোটেল, মোটেল ও অন্যান্য স্থাপনায়। শুধু পর্যটকের কারণেই দ্বীপের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায় প্রতিদিন।
পর্যটকরা মাইক বাজিয়ে, হইচই ও গানবাজনা করে শব্দদূষণ করছেন। এভাবে পরিবেশ বিনষ্ট ও বিপন্ন করায় সামুদ্রিক কাছিম, লাল কাঁকড়া, প্রবাল, শৈবাল, শামুক, ঝিনুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য এখন বিলুপ্ত বা ধ্বংস হওয়ার পথে। সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহল ও পরিবেশবিদরা বলছেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপের সৈকত থেকে সমুদ্রে দু-মাইলের মধ্যে এখন জীবিত প্রবাল দেখা যায় না দূষণের কারণে। ছেঁড়াদ্বীপে প্রবালসহ বিভিন্ন পাথরের সমাহার ও সৌন্দর্যের কারণে সেখানে রাতযাপনের ব্যবস্থা না-থাকলেও পর্যটকরা যান এবং পাথর সংগ্রহ করেন। পরিবেশ অধিদপ্তর ঘোষিত বিধিনিষেধের একটিতে ছেঁড়াদ্বীপ ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটক, অপরিকল্পিত স্থাপনাসহ নানা কারণে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
বস্তুত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ সমুদ্র দেখতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার যায়। এসব পর্যটকের একটি বড় অংশ সেন্টমার্টিনেও যেতে আগ্রহী। তাদের অনেকেই সেন্টমার্টিনে ভ্রমণ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধিনিষেধ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। ভ্রমণের জাহাজ থাকায় পর্যটকরা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার যাওয়ার পর দলে দলে সেন্টমার্টিনে গিয়ে হাজির হচ্ছেন। এ অবস্থায় সেন্টমার্টিনগামী জাহাজের সংখ্যা এবং যাত্রী নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি বলে মনে করি আমরা। তা না হলে পর্যটকদের ফেলে দেওয়া আবর্জনাসহ বিভিন্ন বর্জ্যে অচিরেই দ্বীপটি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
জানা যায়, অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে দ্বীপের ভূগর্ভস্থ সুপেয় মিঠা পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। ফলে কিছু কিছু নলকূপে উঠছে লবণাক্ত পানি। সৈকতে জনকোলাহল, পানিতে অতিরিক্ত দূষণের কারণে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। সবচেয়ে হুমকির মুখে রয়েছে কাছিম। উল্লেখ্য, দ্বীপটি সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন ক্ষেত্র। জানা গেছে, এককালে এই দ্বীপ এবং এর আশপাশের এলাকায় দুই শতাধিক প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল। এককালে এ দ্বীপে বহু প্রজাতির প্রবাল, শৈবালসহ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী থাকলেও পরিবেশগত কারণে এসব প্রজাতির অনেকই এখন বিলুপ্তির পথে।
দূষণসহ যেসব কারণে এ দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে, কর্তৃপক্ষ সে সম্পর্কে অবগত। কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বহু পদক্ষেপ নিলেও তা যথেষ্ট নয়। বস্তুত কিছু মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের লোভের কারণে এ দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। কাজেই শুধু ঘোষণা প্রদানের মধ্য দিয়ে যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না, তা বলাই বাহুল্য। সেন্টমার্টিনের পরিবেশ যেভাবে প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে, দ্বীপটি রক্ষা করতে দ্রুত নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ।
লেখকঃ সাংবাদিক
ইউডি/অনিক

