ইচ্ছে করলেই অসাধ্য সাধন করতে পারে বাংলাদেশ
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ৩০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:১৫
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না’। বঙ্গবন্ধুর এই বাণীকে উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারে নি এবং পারবেও না। আমরা যদি ইচ্ছা করি, অসাধ্য সাধন করতে পারি। পদ্মাসেতু বাস্তবায়ন তার উজ্জ্বল প্রমাণ। কতো দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র এসেছিল এই সেতু ঘিরে। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে স্বপ্নের সেতু এখন বাস্তব। বিস্তারিত লিখেছেন গাজী কাইয়ুম
বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধে সশস্ত্র বাহিনীকে সবসময় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আমরা কারও সাথে যুদ্ধ করতে চাই না, যুদ্ধ আমরা করব না, জাতির পিতা আমাদের যে পররাষ্ট্র নীতি শিখিয়ে গেছেন ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ আমরা সেই নীতিতে বিশ্বাস করি। মঙ্গলবার (২৯ মার্চ) গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে শরীয়তপুরের জাজিরায় ‘শেখ রাসেল সেনানিবাস’ উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন। শেখ রাসেল সেনানিবাসে এ অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর: শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কখনও যদি বহিশত্রুর আক্রমণ হয় আমরা যেন তা যথাযথ ভাবে প্রতিরোধ করতে পারি এবং আমরা যেন আমাদের দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারি। শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়তে সরকারের নেওয়া কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে আমরা আরও উন্নত-প্রশিক্ষিত, সমৃদ্ধশালী করার পদক্ষেপ নিয়েছি। আমি মনে করি আমাদের সশ্রস্ত্র বাহিনীর প্রজ্ঞা, পেশাগত দক্ষতা, কর্তব্য-নিষ্ঠা দিয়ে আমাদের দেশের সুনাম বৃদ্ধি করবে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ এর আলোকে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই ব্রিগেড শেখ রাসেল সেনানিবাসের মাওয়া এবং জাজিরা প্রান্তে স্বপ্নের পদ্মা সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তা বিধানে সফলভাবে আভিযানিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই সেনানিবাসের ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড ও অধীনস্থ ইউনিটসমূহ নিরলসভাবে পরিশ্রম করে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

শেখ রাসেল সেনানিবাস এখন একটি পূর্ণাঙ্গ সেনানিবাস: সরকারপ্রধান বলেন, শেখ রাসেল সেনানিবাস এখন একটি পূর্ণাঙ্গ সেনানিবাসে পরিণত হয়েছে; যেখানে সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য সকল প্রকার প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক সুবিধা তৈরি করা হয়েছে। শুধু এই নির্মাণ নয়, এই সেতুর নিরাপত্তা বিধানও একান্তভাবে প্রয়োজন। আর সেই নিরাপত্তা বিধানের জন্যই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। যেহেতু দ্রুত শুরু হয়ে যাবে যান চলাচল, কাজেই সেতুর নিরাপত্তা একান্তভাবে অপরিহার্য। বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলের নামানুসারে নতুন সেনানিবাসর নাম ‘শেখ রাসেল সেনানিবাস’ রাখায় সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার দুই ভাইই তো আসলে সেনাবাহিনীর সদস্য ছিল (ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল)। … সবার ছোট রাসেল, তাকেও আমরা হারিয়েছি। রাসেলের আকাঙ্ক্ষা ছিল সামরিক অফিসার হবে, হতে পারেনি। আমি সেনাবাহিনীপ্রধান ও সদস্যদের ধন্যবাদ জানাই, আজকে এই সেনানিবাসের নাম শেখ রাসেল সেনানিবাস রাখা হয়েছে। তার আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলেও রাসেলের নামটা সেনাবাহিনীর সাথে যুক্ত থাকল।

আমরা ইচ্ছা করলে অসাধ্য সাধন করতে পারি: চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না’। বাঙালিদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারে না, পারবে না। আমরা যদি ইচ্ছা করি, অসাধ্য সাধন করতে পারি। সেটা ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে প্রমাণ করেছি। আজকে আমরা সেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করছি। তার কাজও প্রায় সম্পন্ন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি প্রথমবার সরকার গঠনের পরে জাপানে গিয়েছিলাম। তখন তাদের পদ্মা ও রূপসা সেতু নির্মাণের জন্য অনুরোধ জানাই এবং তারা রাজি হয়। এরপর সম্ভাব্যতা যাচাই করে এবং আমি পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করি ২০০১ সালে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পরে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা নির্মাণকাজ বন্ধ করে পদ্মা সেতু ওখান (মাওয়া-জাজিরা) থেকে সরিয়ে নিতে চায়। দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পরে আবার উদ্যোগ নিই। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বিশ্বব্যাংক অর্থ বন্ধ করে দেয়, একটা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে যেÍ(পদ্মা সেতু প্রকল্পে) দুর্নীতি হয়েছে। সেটা আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করি এবং তাদের বলি, এটা প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু তারা তা পারেনি।
পদ্মা সেতু নির্মাণে চ্যালেঞ্জ ছিল: প্রধানমন্ত্রী বলেন, কানাডা আদালতের মামলার রায়ে প্রমাণ হয় এতে কোনও দুর্নীতি হয়নি ও সম্ভাবনাও ছিল না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিই, কারও অর্থায়নে নয়, যেহেতু মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। এর জবাব আমরা দেবো। পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে করবো। এটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। অনেকেই মনে করেছিল এটা আমরা পারবো না। কিন্তু মানুষের সমর্থন ও সাহস পাওয়ায় পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া বন্ধুপ্রতিম দেশও আমাদের সহযোগিতা করেছে।
পদ্মা সেতু উন্নয়নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে: দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে পদ্মা সেতু নির্মাণের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে সেই পদ্মা সেতু আমরা নির্মাণ করেছি এবং তার কাজও প্রায় সম্পন্ন। জাতির কাছে কৃতজ্ঞ তাদের সাহসী ভূমিকা ও সমর্থন পেয়েছি বলেই এটা করা সম্ভব হয়েছে। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বন্ধুপ্রতিম দেশও আমাদের সমর্থন দিয়েছে। এ সেতু নির্মাণের ফলে আমি মনে করি, আমাদের জিডিপিতে অন্তত আরও এক ভাগ থেকে দুই ভাগ প্রবৃদ্ধি সংযুক্ত হবে। অর্থাৎ উন্নয়নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারব, সেটা আমি বিশ্বাস করি। এ সেতুর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি আর্থ সামাজিক উন্নতিও হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা বা তাদের যোগাযোগ একটি সেতুর নির্মাণের মধ্যে দিয়ে একটা এলাকা উন্নত হয়। আজকে আমরা শতভাগ বিদ্যুৎ দিতে পেরেছি। আমরা প্রতিটি গৃহহারা মানুষকে ঘর তৈরি করে দিচ্ছি।

উপজেলা পর্যায়েও অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসাসেবা পৌঁছে যাচ্ছে: এদিন অপর এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি (এসএইচএনআইবিপিএস)-এ সিক্সথ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন প্লাস্টিক সার্জারি-২০২২ এবং ‘মুজিব কর্নার’ ও ‘বঙ্গবন্ধু গ্যালারি’ উদ্বোধন করেন তিনি। এ সময়ে তিনি অগ্নিকান্ড প্রতিরোধ ও সতর্কতার সঙ্গে দাহ্য পদার্থ ব্যবহারের ব্যাপারে সুপরিকল্পিতভাবে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করতে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার উপজেলা পর্যায়ে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা উপজেলা পর্যায়ে দগ্ধদের চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে পদক্ষেপ নিচ্ছি। তিনি গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সোসাইটি অব প্লাস্টিক সার্জন অব বাংলাদেশ (এসপিএসবি) অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। তিনি আরো বলেন, মানুষের দোরগোড়ায় এই বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে- তাঁর সরকার প্রতিটি বিভাগে পৃথক ও স্বনির্ভর বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশে প্রথমবারের মতো সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে একটি পাঁচ শয্যাবিশিষ্ট ইউনিট স্থাপন করেন। তিনি আরো বলেন, এছাড়াও তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বঙ্গবন্ধু থানা পর্যায়ে ১০ শয্যা বিশিষ্ট একটি হাসপাতাল স্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশবাসীকে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা দিতে তাঁর সরকার ২০১৮ সালে সর্বাধুনিক চিকিৎসা সেবা সম্বলিত ৫০০ শয্যার শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতাল নির্মাণ করেন।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কারো উপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না: প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা সেবা ছিল না। সেজন্য আমরা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট নির্মাণ করে মানুষের জন্য আধুনিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সযোগ সৃষ্টি করি। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কারো উপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। তাই, তাঁর সরকার বিশেষত আধুনিক বিজ্ঞানের ওপর গবেষণা পরিচালনায় সব সময় প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটি শক্ত ভিত গড়ে তুলতে তাঁর সরকার দেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে এবং পরে চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীতে আরো তিনটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশে অনেকগুলো মেডিকেল কলেজ স্থাপন করে।
ইউডি/সুপ্ত

