সুকান্ত ভট্টাচার্য: প্রগতিশীল চেতনার তারুণ্যের কবি
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ৩০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:১০
আঠারো বছর বয়স কবিতায় “এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে” লাইন লিখে চির স্মরণীয় হয়ে আছেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। একটি ছোট ছেলে বয়স মাত্র নয়–দশ বছর। তখন সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েন। এই বয়সেই সুকান্ত ভট্টাচার্য ছড়া লিখতে আরম্ভ করেন। বাংলা সাহিত্যের সমস্ত শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে অন্যতম হলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাকে বলা হয় তারুণ্যের কবি। কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
সুকান্ত তার কবিতায় আত্মসাৎ ও অন্তরস্থ করে নিতে পেরেছিলেন তার গ্রহিষ্ণু প্রতিভার দ্বারা সামাজিক অন্যায় ও অবিচার, সাম্রাজ্যবাদীদের শোষণ ও পীড়ন, ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার কবিতা ছিল সোচ্চার। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের বাণী তার রচনাতে তিনি উচ্চকণ্ঠেই সর্বদা লিপিবদ্ধ করেছেন।
সংক্ষেপে পরিচিতি
সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন বাংলা সাহিত্যের মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী তরুণ কবি। তিনি তার সীমিত জীবনকালে যা কিছু সাহিত্যসৃষ্টি করে গেছেন তা সত্যিই এক কথায় অনবদ্য। কিশোর বয়স থেকেই তিনি কৃষকের, শ্রমিকের, সর্বহারার কথা ভাবতেন। ধনীর অত্যাচারে নিপীড়িত, যারা দুবেলা খেতে পায় না, উদয়া পরিশ্রম করেও যারা ছেলেমেয়েকে আহার, বস্ত্র দিতে পারে না, তাদের কথাই ছেলেটি সব সময় চিন্তা করত। তাদের নিয়েই তার তাত্ব ছড়া, কবিতা ও আলোচনা। তিনি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদ আগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সেইসময় কলম ধরেছিলেন।
তার সমস্ত সাহিত্য কর্ম আজও প্রত্যেক বাঙালী পাঠকদের সমানভাবে মন কাড়ে। তার এত অল্পবয়সের লেখা দেখে তার পরিবারের সবাই খুব প্রশংসা করত। সুকান্তের কবি প্রতিভা দেখে সকলে বিস্ময় প্রকাশ করেছে। এই কিশোর কবির সুমহান চিন্তা একমাত্র মনীষীদের মধ্যে দেখা যায়। তিনি অল্পদিনের মধ্যে দেশকে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন।
প্রাথমিক জীবনে দিদির পরে মায়ের মৃত্যু
সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম হয় ১৯২৬ খ্রীঃ ১৫ই আগস্ট। তিনি ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার কালিঘাটে মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বাবার নাম ছিল নিবারণচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য্য ও মাতার নাম সুনীতি দেবী। তাদের আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ার উনশিয়া গ্রামে। তার পূর্বপুরুষরা ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় এসে বেলেঘাটা অঞ্চলে বসবাস করেন।
সুকান্ত অনেক বাইরের বই পড়তেন। কিন্তু তার মধ্যে বহু ছড়ার বইও পড়তেন। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ ছিলেন তার বড় বোন রানী। সেই সময়ের বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মনিন্দ্রলাল বসুর “সুকান্ত” গল্পটি পড়ে, তিনি তার নাম রেখেছিলেন সুকান্ত। জানা যায়, তার প্রিয় রানীদির জন্যই নাকি তিনি সাহিত্যকর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার রানীদি তার কোনো সাহিত্য কর্মই দেখে যেতে পারেননি। দিদির মারা যাওয়ার কিছুদিন পরেই তার মাও পরলোক গমন করেন।
শিক্ষাজীবন, প্রথম কবিতা ও পত্রিকা প্রকাশ
বেলেঘাটায় কমলা বিদ্যামন্দির নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুকান্তকে ভর্তি করে দেওয়া হল। এখানে তিনি পড়াশুনা করতে লাগলেন। মেধাবী ছাত্র বলে তিনি শীঘ্রই শিক্ষকদের স্নেহভাজন হন। সুকান্ত যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েন তখনই তিনি কবিতা ছড়া লিখতে আরম্ভ করেন। সেই সময় তিনি “সঞ্চয় ” নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করলেন। তার লেখা কবিতা ওই সময় ‘শিখা’ নামে একটি পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল। ছাপা অক্ষরের্তার প্রথম প্রকাশিত রচনা “বিবেকানন্দের জীবনী ” প্রকাশিত হয়েছিল শিখা পত্রিকায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়া শেষ হলে সুকান্ত বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলে ভর্তি হলেন। এই স্কুলে যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়েন তখন। তিনি ছাত্রদের লেখা ও ছবি নিয়ে হাতে লেখা একটি পত্রিকা বার করেন তার নাম ছিল “সপ্তমিকা”। শিক্ষকেরাও সুকান্তের সাহিত্য সাধনায় বিশেষ উৎসাহ দান করতেন।
কর্মজীবন ও স্বাধীনতা সংগ্রাম
তিনি প্রথমে কম্যুনিস্ট পার্টির কাগজ বিক্রি করতেন। এই সময়ই তার সত্যিকারের কবি জীবন শুরু হয়। পরাধীন দেশের মানুষের দুঃখদুর্দশা ও অপমান বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন- “অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি। জন্মেই দেখি ক্ষুদ্ধ স্বদেশ ভূমি। এ দেশে জন্মে পদাঘাত-ই শুধু পেলাম। অবাক পৃথিবী! সেলাম তোমাক সেলাম।” সুকান্ত তার সংক্ষিপ্ত জীবনকালের মধ্যে যা দেশকে দিয়ে গেছেন তা আজ সকলের কাছেই বিস্ময়। কিছুদিনের মধ্যে ‘কিশোর বাহিনী’ নামে এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। অনেক ছেলেমেয়ে এই প্রতিষ্ঠানের সদস্য হয়েছিল। সুকান্ত এইসব ছেলেমেয়েদের স্বাধীনতার আদর্শে ও অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
তার উল্লেখযোগ্য রচনাবলী
ইন্ডিয়ার দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী সুকান্ত। তাই তার কবিতা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত। আত্মবিশ্বাস, ঘৃণা, ক্ষোভ, ভবিষ্যতের আশা ও স্বপ্ন মিশ্রিত তার কবিতা প্রত্যেকের কাছেই প্রিয়। সুকান্তের কাব্যগ্রন্থ তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়। ছাড়পত্র ১৯৪৭ সালে, ঘুম নেই ১৯৫০ সালে, পূর্বরাগ ১৯৫০ সালে এছাড়া গীতিগুচ্ছ, মিঠেকড়া, অভিযান, হরতাল এগুলোও তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়। তার কতকগুলো কবিতা যথা রানার, সিঁড়ি, ছাড়পত্র, হে মহাজীবন, বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের মৃত্যু
সুকান্ত ভট্টাচার্য টি.বি. রোগে আক্রান্ত হয়ে যাদবপুর টি.বি. হাসপাতালে ভর্তি হন। তার লেখা শেষ কবিতার বই ‘ছাড়পত্র’ তখন ছাপা হচ্ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ছাপা অক্ষরে ঐ বই আর দেখে যেতে পারেননি তিনি। স্বাধীনতার জন্য মন কাঁদলেও দেখে যেতে পারেননি উপমাহাদেশে স্বাধীনতা। ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে মাত্র ২১ বছর বয়সে কিশোর কবি সুকান্ত অমৃতলোকে যাত্রা করেন।
ইউডি/অনিক

