অপরাধের পুনরাবৃত্তি সহজেই রোধ করা সম্ভব

অপরাধের পুনরাবৃত্তি সহজেই রোধ করা সম্ভব

মিলন গাজী । বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:২০

আমাদের দেশের কারাবন্দিদের অধিকাংশই মাদক মামলার। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬ (২) ও (৩) ধারানুসারে মাদকদ্রব্য অপরাধের জন্য কেউ একবার সাজাভোগের পর আবার একইরূপ অপরাধ করলে অপরাধটি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের অপরাধ না হলে আইন নির্ধারিত দণ্ডের দ্বিগুণ দণ্ডে দণ্ডিত হবে। একইভাবে দ্বিতীয়বার সাজাভোগের পর আবার একইরূপ অপরাধ করলে অন্যূন ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এভাবে বেশ কিছু আইনে অপরাধের পুনরাবৃত্তির শাস্তি আইন নির্ধারিত শাস্তির প্রায় দ্বিগুণ শাস্তির বিধান করলেও পুনঃঅপরাধকারীদের ঠেকানো যাচ্ছে না। বরং তারা নিত্য নতুন পন্থায় অপরাধ করছে। ২০১৯ সালের ঢাকা আহছানিয়া মিশনের একটি গবেষণায় দেখা যায়, মাদকাসক্ত থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পরেও আবার মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ৫২.১ শতাংশ কারাবন্দি হন। এদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ একবার, ৪১.৯ শতাংশ দুই থেকে পাঁচবার এবং ১৫.১ শতাংশ পাঁচবারের বেশি আইনগত কারণে গ্রেফতার হন।

কারাগার থেকে বের হওয়ার পর কেন তারা আবার অপরাধে জড়াচ্ছে-এটা নিয়ে এখন ভাববার সময় এসেছে। কারামুক্ত অপরাধীদের ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান কার্যক্রমে শিথিলতা অপরাধীকে আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। কারণ কারামুক্ত হয়ে অপরাধী সমাজে তার পুরোনো সহযোগীদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পায়। এতে অপরাধী আরও সংগঠিত হয়ে আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। আমাদের দেশে অপরাধের পুনরাবৃত্তির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অপরাধীর দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, কর্মসংস্থানের অভাব, পিতা-মাতা কর্তৃক যথাযথ তত্ত্বাবধানের অভাব, মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা, কাউন্সেলিংয়ের অভাব, অপরাধীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও যথাযথ পুনর্বাসনের অভাব ইত্যাদি।

কারা অধিদপ্তরের ২০১৭ সালের তথ্য মোতাবেক, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে ১০,৫৪৫ জন আগে একবার, ৫০৫৭ জন আগে দুইবার, ২৪৭৯ জন আগে তিনবার, এভাবে পনেরো বারের অধিক সময় পর্যন্ত মোট গ্রেফতার হয়েছে ১৯,৯১২ জন এবং সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে ৩,৩৮৪ জন আগে একবার, ১৫৫০ জন আগে দুইবার, ৬৯৭ জন আগে তিনবার এভাবে পনেরো বারের অধিক সময় পর্যন্ত মোট গ্রেফতার হয়েছেন ৬০৬২ জন। উভয় প্রকার বন্দি মিলে মোট ২৫,৯৭৪ জন বন্দি একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছিলেন, যা মোট বন্দির ৩৫.৪৯ শতাংশ।

অপরাধের পুনরাবৃত্তি সারা বিশ্বে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালেও উলটো ঘটনা ঘটেছে নরওয়ে, সুইডেন, লুক্সেমবার্গ, লিশটেনস্টাইন ও নেদারল্যান্ডসে। এ দেশগুলোতে অপরাধের পুনরাবৃত্তি কমে যাওয়ায় একের পর এক কারাগার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ইউরোপের এই দেশগুলোতে কারাগারকে দেখা হয় সংশোধনাগার হিসাবে। তাদের এমন সফলতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্যোগ। নেদারল্যান্ডসের একে একে ২৩টি কারাগার বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিভিন্ন অনুঘটকের প্রভাব ও ধারণাগুলো বিশ্লেষণ করে আমরাও উপকৃত হতে পারি।

অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে নরওয়ে বিস্ময়কর সাফল্য পেয়েছে। তাদের কারাগার ব্যবস্থাটি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা থেকে দূরে সরে পুনর্বাসনের ওপর জোর দিয়েছে। এখানে পুনর্বাসনমূলক পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, চাকরির প্রশিক্ষণ, ব্যবসা-বাণিজ্যে সফলতা অর্জনের কর্মশালা এবং বিভিন্ন ধরনের থেরাপি। বন্দিদের যাদের আগে দিনের বেশিরভাগ সময় তালাবদ্ধ করে কাটাতে হতো, তাদের প্রতিদিন প্রশিক্ষণ ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি দেওয়া হয়। এ ছাড়া মুক্তির পরে একজন সাবেক বন্দিকে থাকার জায়গা, কাজ বা শিক্ষার সুযোগ, ঋণ পরামর্শ ইত্যাদিসহ বিভিন্ন পরিষেবার নিশ্চয়তা নিয়ে কাজ করা হয়। এ পদ্ধতির সফলতাও পেয়েছে স্পষ্টভাবে। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’র তথ্য অনুসারে, ২০০৫ সালে নরওয়েতে অপরাধপ্রবণতার হার ছিল ২০ শতাংশ এবং ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অথচ ১৯৮০ সালের আগে এটি ছিল প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ।

সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীরা যেন আবার অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে সেজন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘মুক্ত কারাগার’ নামের এক ধরনের সংশোধনাগার আছে। আমাদের দেশে ২০১৭ সালে কক্সবাজারের উখিয়ায় এমন কারাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল যা এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের জন্য মুক্তিপূর্ব এই উন্মুক্ত কারাগার অপরাধীর পুনরাবৃত্তি রোধে দারুণ কার্যকর। নির্ধারিত সাজার অধিকাংশ সময় যেসব বন্দি পার করেছেন এবং যারা কারাগারে ভালো আচরণ করেছেন, কেবল তাদেরই উন্মুক্ত কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading