কৃষির উন্নয়নে বাঁচবে কৃষক ও দেশ

কৃষির উন্নয়নে বাঁচবে কৃষক ও দেশ

রাশেদ খান মিলন । বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:৩০

সভ্যতার সূচনা হয়েছিল মানুষের হাত দিয়ে কৃষি উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকে। কৃষিব্যবস্থার উদ্ভবের আগে মানুষ তার প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করত পশু শিকার এবং গাছ-গাছড়া থেকে ফল-ফলাদি সংগ্রহ করার মাধ্যমে। ওই সময় মানুষ এক ধরনের যাযাবরের জীবনযাপন করত। কোনো জায়গায় খাদ্যের উৎস হিসাবে পশু এবং গাছ-গাছড়ার মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে খাদ্য সংগ্রহ করা না গেলে মানুষ বাধ্য হয়ে অন্য স্থানের দিকে হিজরত করত, যেখানে খাদ্য সম্ভার পাওয়া যায়। একপর্যায়ে মানুষ দেখতে পেল নদীর কিনারায় নরম মাটিতে প্রকৃতিজাত শস্য জন্মায়। এ শস্য হতে পারে ধান, গম, ভুট্টা বা অন্য কিছু।

মানুষ বুঝতে পারল এসব ফসলের জন্য নরম মাটি এবং পানি খুবই প্রয়োজনীয়। মানুষ চিন্তা করল মাটি নরম করার কাজটি করা সম্ভব যদি মাটি খুঁচিয়ে দেওয়ার মতো কোনো হাতিয়ার ব্যবহার করা যায়। আর পানির প্রয়োজনটা মেটানো সম্ভব, যদি ধারে কাছে নদী, জলাশয় কিংবা প্রাকৃতিক ঝরনা থাকে। এভাবেই কৃষি সভ্যতার উদ্ভব হয়েছিল।

মানবসভ্যতায় যেসব পরিবর্তন ঘটেছে, সেসব পরিবর্তনের মূলে নিহিত আছে সমাজের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্ব-সংঘাত। কিন্তু অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মহামারি বিশাল সামাজিক পরিবর্তনের ধাত্রী হিসাবে কাজ করেছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্লেগজনিত মৃত্যুর কারণে অনেক অঞ্চল বিরান প্রান্তরে পরিণত হয়। সে সময় ইউরোপে ভূমিদাস প্রথা প্রচলিত ছিল। হাজার হাজার ভূমিদাসের মৃত্যুর ফলে ভূমিদাস প্রথা অকার্যকর হয়ে পড়ে। যে ভূমিদাসরা বেঁচে ছিল তারা মুক্ত শ্রমিকে পরিণত হয় এবং মজুরির বিনিময়ে শ্রমিকরা কাজ করতে শুরু করে। এভাবেই পুঁজিবাদি ব্যবস্থার ভিত্তি রচিত হয়।

গত দুবছর পৃথিবীজুড়ে কোভিড মহামারি চলেছে এবং এখনো তা ভয়াবহ রূপে বিদ্যমান আছে। এখন আমরা দেখব কিভাবে কোভিড মহামারি আমাদের কৃষিব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা একটি জরিপের মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করেছে এই করোনাকালে কৃষকরা কী ভাবছে। এ সংস্থার উদ্যোগে পরিচালিত জরিপটির শিরোনাম হলো ‘বাংলাদেশ : শক্স, এগ্রিকালচারাল লাইভলিহুড অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি মনিটরিং রিপোর্ট ২০২২’। এই গবেষণা জরিপটি পরিচালিত হয়েছে সারা দেশের প্রায় ৩ হাজার ৭১৬ কৃষক ও সংশ্লিষ্ট খানার তথ্যের ভিত্তিতে। ২০২১-এর এপ্রিল ও মে মাসে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় শস্যের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে। কৃষি উৎপাদনে কৃষি সম্পর্কে কৃষকের মনোভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রত্যাশা বিরাট ভূমিকা পালন করে।

প্রত্যাশার বিষয়টি বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। এমনকি মূল্যস্ফীতির ব্যাপারেও প্রত্যাশা বিশেষভাবে কাজ করে। সাধারণভাবে বলা যায়, কৃষক উৎপাদন বৃদ্ধির প্রত্যাশা করে। প্রত্যাশা কার্যকর হওয়ার জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, কৃষক উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা করছে। কৃষক যদি মনে করে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব, তাহলেও কৃষক আস্থা পায় না ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবে কিনা। এ ধরনের আত্মবিশ্বাসের দোলাচলের মধ্য দিয়ে চলছে বাংলাদেশের কৃষির বিবর্তন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার জরিপ থেকে জানা যায়, উৎপাদন অর্ধেকের বেশি কমে যাবে এমন ধারণা পোষণ করে দুই শতাংশ কৃষক, ২ শতাংশ কৃষক ধারণা করে উৎপাদন ২০ থেকে ৫০ শতাংশ কমবে, ৫ শতাংশ কৃষক মনে করে কোনো উৎপাদন নাও হতে পারে, উৎপাদন ২০-৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা ২ শতাংশ কৃষকের, ৫০ শতাংশ বাড়বে এমন আত্মবিশ্বাস ১ শতাংশ কৃষকের, ৩৩ শতাংশ কৃষকের প্রত্যাশা উৎপাদন একই থাকবে, ৩২ শতাংশ কৃষকের ধারণা ৫-২০ শতাংশ উৎপাদন কমবে এবং ২৩ শতাংশ কৃষকের আত্মবিশ্বাস উৎপাদন ৫-২০ শতাংশ বাড়বে। আমরা সাধারণভাবে ধারণা করতে পারি কৃষকের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেছে। এর কারণ মূলত উৎপাদন করে ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না।

দেশের কৃষি খাতের পারফরম্যান্স সম্পর্কে এক ধরনের ধোঁয়াশা ভাব রয়েছে। একদিকে সরকারি মহল থেকে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেছে। অথচ আমদানি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতিবছরই ১০-২০ লাখ টন খাদ্য শস্য আমদানি করা হচ্ছে। বিশ্ববাজার অর্থনীতি যদি সঠিকভাবে কাজ করে, তাহলে ধরে নিতে হবে দেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা আমদানির উৎস দেশগুলোর তুলনায় কম। তা না হলে আমদানির তথ্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়বে। অবশ্য কৃষি উৎপাদনে ভর্তুকি ও মূল্য সমর্থন বিচিত্রভাবে কাজ করে।

কোভিডকালে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষ অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এদের আর্থিক আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। কোভিডের মতো মহামারি না থাকলে শহর থেকে অর্জিত অর্থ গ্রামের কৃষিতে ব্যবহৃত হতে পারত। কোভিডের অভিঘাত কৃষিতে পড়েছে মূলত আর্থিক জোগান ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading