আমরা ফলের পুষ্টি নয় বিষ খাচ্ছি
বিনয় দাস । বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:১০
ফল খাওয়ার উপকারিতার কথা সকলেরই জানা। ছোট শিশু থেকে কিশোর-তরুণ, প্রাপ্তবয়স্ক এমনকি বৃদ্ধদেরও নিয়মিতভাবে ফল খাওয়া উচিৎ এবং প্রতিদিন কিছু পরিমাণে হলেও ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিৎ। ডাক্তারী বিদ্যায় বলা হয়, ফল শুধু স্বাদের জিনিস নয়, এর দরকার শরীরে মিনারেল আর ভিটামিনের চাহিদা জোগান দিতে। সেটা বেশি দেশি ফলে। প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি এবং বি কমপ্লেক্স রয়েছে বাংলাদেশের মৌসুমী ফলে। বলা হয়ে থাকে, বিদেশি ফলে ফরমালিন বা কেমিকেল মেশানো থাকে। এই ভরসায় দেশি ফলের প্রতি অনেকের আকর্ষণ এবং দুর্বলতা রয়েছে। তবে এক্ষেত্রেও রয়েছে দুঃসংবাদ। দেশি ফলেও ফরমালিন মেশানোর ঘটনা ধরা পড়ছে বিভিন্ন জায়গায়। দেশি ফলের মধ্যে প্রায় সব ফলেই ফরমালিন মেশানো হয়। ইথোফেন নামের বিষাক্ত হরমোনাল স্প্রে দিয়ে কাঁচা ফল পাকানো হয়। আবার পচা ফল তাজা রাখতেও কেমিক্যাল রয়েছে। সাধারণত কৃষিজমিতে ব্যবহার হলেও রমজানকে সামনে রেখে কাঁচা ফল পাকাতে এই স্প্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি ফরমালিনের চেয়েও ভয়ানক বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তমুজের ভেতর সিরিঞ্জ দিয়ে ক্ষতিকর এরিথ্রোসিন বি এবং স্যাকারিন পুশ করে লাল ও মিষ্টি করার ঘটনা ধরা পড়েছে। বাদ যাচ্ছে না আমি, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, আনারসও। জাতীয় ফল কাঁঠালও এর বাইরে নয়। এক সময় লোহার রড ঢুকিয়ে কাঁঠাল পাকানোর কথা শোনা যেত। এতে কাঁঠাল দ্রুত পাকে। এখন রডের সঙ্গে বিষও দেয়া হয়। কেমিক্যাল মেশানোর তালিকায় এগিয়ে রয়েছে কলা।
একেবারে সাধারণ চাষী থেকে ছোট-বড় সকল ব্যবসায়ীই সবাই যার যার জায়গায় ফলে বিষ মেশানোর অনৈতিকতার মাধ্যমে মানুষকে রোগী বানানোর কাজটি করছে। লিচু বা আম বাগানগুলো মুকুল আসার আগে-পরে বড় ব্যবসায়ী, সুপার শপগুলো কিনে নেয়। বিষ মেশানোর অপকর্ম তারাও করে। কারও বিবেক স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না। মুনাফাই যেন তাদের কাছে শেষ কথা, মানুষের জীবন নয়।
হাইর্কোটের একটি বেঞ্চ বছর কয়েক আগে ফল পাকানো ও সংরক্ষণে কেমিক্যালের ব্যবহার অবৈধ ঘোষণা এবং ফলমূলে কেমিক্যাল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করতে পুলিশকে নির্দেশ দেন। দূষিত ফল যেন কেউ গুদামজাত ও বিক্রি করতে না পারেন তা সর্বদা মনিটর করার জন্য বিএসটিআই ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেন। এ ছাড়া আদালত দেশের স্থল ও নৌবন্দরে আমদানি করা ফল কেমিক্যাল মেশানো কিনা তা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নির্দেশ দেন। কিন্তু, সেই নির্দেশ যথাযথভাবে পালন হচ্ছে না।
সমাজের সর্বস্তরে এমন অবক্ষয়-অনৈতিকতার এই মাত্রায় আর কোনো দেশে আছে কিনা আমার জানা নাই। তবে ভারত, পাকিস্থান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটানে নেই তা বলতে পারি। মিয়ানমারের অবস্থাও এমন নয়। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান কোনো দেশের মানুষ খাদ্যে ভেজাল বা বিষ মেশানোর কথা চিন্তাও করতে পারে না। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকায় ফল বা খাবারে ভেজাল বা বিষের কথা কল্পনাও করা যায় না। ল্যাটিন আমেরিকার মেক্সিকো ও ব্রাজিলের সমাজেও এমন নেই। তাই সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়, রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের মানুষের পচনটা ধরেছে মাথায়। এর আগে নষ্ট হচ্ছে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার ও ফলমূল আকর্ষণীয় করে ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য যে ক্ষতিকর কার্বাইড, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রং, ফরমালিন, প্যারাথিয়ন ব্যবহার করা হয়, এগুলো গ্রহণের ফলে কিডনি, লিভার ফাংশন, অ্যাজমাসহ বিভিন্ন প্রকার জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সুতরাং পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য চাই কঠোর আইনের প্রয়োগ। বিদেশ থেকে রাসয়নিক দ্রব্য আমদানি, সংরক্ষণ, মজুদকরণ, বিতরণ, ব্যবহার ও উম্মুক্ত বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। জনগণকে বিষমুক্ত ভেজাল ফল ক্রয় ও খাওয়া থেকে বিরত থাকতে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এ ব্যাপারে সংবাদপত্র এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
ইউডি/সুস্মিত

