সুকুমার রায়: সাহিত্যে রস সৃষ্টিতে খ্যাতি আছে তার
কিফায়েত সুস্মিত । শুক্রবার, ০১ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১০:২০
সুকুমার রায় ছিলেন একজন বিখ্যাত বাঙালি শিশু সাহিত্যিক ও বাংলা সাহিত্যে “ননসেন্স ছড়া”র প্রবর্তক। সুকুমার রায় একাধারে লেখক, ছড়াকার, শিশু সাহিত্যিক, রম্যরচনাকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও সম্পাদক। সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের উজ্বল রত্ন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ছেলে। সুকুমার রায় চির স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন বাংলা সাহিত্যে ও ছোটগল্পে তার বিশেষ অবদানের জন্য। বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন কিফায়েত সুস্মিত।
সুকুমার রায়ের জন্ম ও শিক্ষাজীবন
বাংলা শিশু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক সুকুমার রায়ের জন্ম হয় ১৮৮৭ সালের ৩০শে অক্টোবর। তার পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন শিশু সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী ও যন্ত্ৰকুশলী। তার ছেলে সত্যজিৎ রায় একজন অস্কার জয়ী বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন। সুকুমারের মা বিধুমুখী দেবী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মেয়ে। পিতার কাছ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে সাহিত্যের অসামান্য উদভাবনী ক্ষমতা লাভ করেছিলেন সুকুমার। অল্প বয়স থেকেই মুখে মুখে ছড়া তৈরি করতে পারতেন। ছবি আঁকারও হাতেখড়ি হয়েছিল বাবা উপেন্দ্রকিশোরের হাত ধরে। আঁকার সঙ্গে ফটোগ্রাফির চর্চাও শুরু করেছিলেন ছেলেবেলা থেকেই।
সুকুমার রায় পড়াশুনা শুরু করেন সিটি স্কুলে। রসায়নে অনার্স সহ বি.এস.সি পাশ করেন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। এরপর ফটোগ্রাফি আর মুদ্রণ শিল্পে উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য গুরুপ্রসন্ন ঘোষ স্কলারশিপ নিয়ে ১৯১১ সালে লন্ডন যান।
সুকুমার রায়ের নাটক
স্কুলে পাঠরত অবস্থাতেই ছোটদের হাসির নাটক লেখা ও অভিনয়ের শুরু। বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘ননসেন্স’ ক্লাব। ক্লাবের মুখপত্রের নাম ছিল সাড়ে বত্রিশ ভাজা। বিলেত যাবার আগে শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে গোড়ায় গলদ নাটকে অভিনয় করেন।
কর্ম ও ফটোগ্রাফিক সোসাইটি
লন্ডনে ফটোগ্রাফিক সোসাইটি লাইব্রেরিতে নিয়মিত পড়াশোনা করতেন লাগলেন। ১৯১২ সালে ম্যাঞ্চেস্টারের স্কুল অব টেকনোলজিতে বিশেষ ছাত্ররূপে স্টুডিও ও লেবরেটরির কাজ শিখেছিলেন। পড়াশোনার কাজের ফাকে সুকুমার প্রবাসী ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এই সুযোগে লন্ডন প্রবাসী অনেক বিখ্যাত বাঙ্গালীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলির পান্ডুলিপি নিয়ে লন্ডনে গেলে সুকুমার রায় তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছিলেন।
সুকুমার রায়ের প্রবন্ধ
এই সময় ইস্ট ওয়েস্ট সোসাইটির আহ্বানে সুকুমার রায় নিজের লেখা প্রবন্ধ দ্যা স্প্রিট অফ রবীন্দ্রনাথ পাঠ করেন। এই প্রবন্ধের সঙ্গে কবির অনেকগুলি কবিতার অনুবাদ ছিল। পরে প্রবন্ধটি ‘কোয়েস্ট’ পত্রিকায় ছাপা হয়। লন্ডনে দুবছর ছিলেন সুকুমার। সেখান থেকে নিয়মিত ভাবে গল্প, কবিতা ও আঁকা ছবি পাঠাতেন পিতা উপেন্দ্রকিশোরের সম্পাদিত সন্দেশ পত্রিকার জন্য। এইভাবেই তিনি সন্দেশের পাঠক পাঠিকাদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।
ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সদস্য
লন্ডনে থাকাকালে সুকুমার রয়েল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন। তার আগে একমাত্র স্যার যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর এই সম্মান পেয়েছিলেন। সুকুমার রায় দেশে ফিরে এসে পিতার প্রতিষ্ঠিত ইউ রায় অ্যান্ড সন্স এর দায়িত্বভার নিলেন।
ইতিমধ্যে সুকুমারের বিয়ে হল। রবীন্দ্রনাথ বন্ধুপুত্রের বিয়েতে শিলাইদহ থেকে এসেছিলেন কলকাতায়। ১৯১৫ সালের ২০শে ডিসেম্বর উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যু হয়। সুকুমার ভাই সুবিনয়ের সঙ্গে ব্যবসায় পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হলেন। এই সময় তার উদ্যোগে গড়ে ওঠে মানডে ক্লাব। এই ক্লাবের সভ্যদের মধ্যে ছিলেন কালিদাস নাগ, অতুলপ্রসাদ সেন, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমারের ভাই সুবিনয়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রশান্তচন্দ্র মহালনবীশ, প্রভাত গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ বিদ্বজনেরা। তিনি ছিলেন ঐ ক্লাবের মধ্যমণি। ঐ ক্লাবের আলোচনা চক্রে প্লেটো থেকে শুরু করে বঙ্কিম চন্দ্র, বৈষ্ণব কবিতা, রবীন্দ্রকাব্য পর্যন্ত আলোচনা হত।
সন্দেশের প্রতিটি সংখ্যাতেই সুকুমার নানা বিষয়ে লিখতেন, ছবি আঁকতেন। শিশু-কিশোরদের উপযোগী বিজ্ঞান বিষয়ক সাহিত্য রচনায়ও তিনি পারদর্শী ছিলেন। সুকুমার রায়ের গল্প ও কবিতায় থাকতো উচ্ছল কৌতুক রসের সঙ্গে সূক্ষ্ম সমাজ চেতনার সংমিশ্রণ। তিনি তার লেখা ও ছবির মাধ্যমে বাংলা দেশের শিশুচিত্ত জয় করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ছদ্মনাম ও কাব্যগ্রন্থ
সন্দেশে লেখার গোড়ার দিকে সুকুমার ছদ্মনাম গ্রহণ করেছিলেন। উহ্যনাম পন্ডিত ছিল তার ছদ্মনাম। পরে স্বনামেই লেখেন গল্প, কবিতা, নাটক ও প্রবন্ধ। জীবনের শেষ পর্বে অবশ্য কিছু লেখা লিখেছিলেন উহ্যনাম পন্ডিত নামে।
সুকুমারের রচনা কাব্যগ্রন্থ আবোল তাবোল, খাইখাই। প্রবন্ধ অতীতের ছবি, বর্ণমালাতত্ত্ব। নাটক অবাক জলপান, ঝালাপালা, লক্ষ্মণের শক্তিশেল, হিংসুটে, ভাবুকসভা, চলচ্চিত্তচঞ্চরি ও শব্দকল্পদ্রুম। গল্পগ্রন্থ হ–য–ব–র–ল, পাগলা দাশু, বহুরূপী প্রভৃতি। তাছাড়া ইংরেজি ও বাংলায় তিনি কিছু গুরুগম্ভীর প্রবন্ধও রচনা করেছিলেন। সুকুমার ছিলেন রসিকমনের মানুষ। ফলে তার স্বভাবসুলভরসের সঙ্গে প্রখর কল্পনা ও অপরূপ ভাষা মিলে তার রচনাগুলিকে করে তুলেছিল পরম উপভোগ্য। লেখাকে অধিকতর সুস্বাদু করে তুলেছিল তার আঁকা ছবি।
সুকুমার রায়ের মৃত্যু
মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ১৯২৩ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর রসস্রষ্টা সুকুমার রায় অমৃতলোকে যাত্রা করেন। মৃত্যুকালে তার একমাত্র সন্তান সত্যজিৎ রায়ের বয়স ছিল মাত্র আড়াই বছর। সুকুমারের কোন রচনাই তার জীবদ্দশায় পূর্ণাঙ্গ বইয়ের আকারে প্রকাশিত হয়নি। ছাপা বই দেখে না গেলেও তার তিনরঙা মলাট, অঙ্গসজ্জা, পাদপুরক দু–চার লাইনের কিছু ছড়া ইত্যাদি সবই তিনি করে গিয়েছিলেন রোগশয্যায় শায়িত অবস্থায়। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এমন রসসৃষ্টি আর কোথাও দেখা যায় না।
হাইলাইট
সুকুমার রায় জন্মেছিলেন বাঙালি নবজাগরণের স্বর্ণযুগে। পারিবারিক সাহিত্যনুরাগী পরিবেশ তার মধ্যে সাহিত্যিক প্রতিভা বিকাশ করে। পিতা উপেন্দ্রকিশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি সুকুমারকে সরাসরি প্রভাবিত করেছিলেন। এ ছাড়াও রায় পরিবারের সাথে জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রমুখের সম্পর্ক ছিল।

