ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট: দেউলিয়ার পথে শ্রীলঙ্কা
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ০১ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৪:৪০
অর্থনৈতিক সংকটে মুখ থুবড়ে পড়ছে দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। গত কয়েক বছরে চীন, ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার মুখে পড়েছে দেশটির সরকার। তাতে দেশটির অভ্যন্তরীন পরিস্থিতি হুমকির মুখে পড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির কারণে খাদ্য ও জ্বালানির বিপুল সংকট চলছে। দেশ পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে সরকারও। বিস্তারিত লিখেছেন কিফায়েত সুম্মিত
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পর্যটনময় রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে এই দ্বীপ রাষ্ট্র। ১৯৮৩ সালে তামিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে ২০০৯ সালে শেষ হয়। তখনও তাদের অর্থনৈতিক কিংবা অন্যান্য পরিস্তিতি এতটাও খারাপ হয়নি। বিদেশি মুদ্রার সংকটে থাকা শ্রীলঙ্কাকে দুই কিস্তিতে মোট ১৫ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ। কারেন্সি সোয়াপের আওতায় গত বছর এই ঋণ ছাড় করা হয়। মূলত ২০২০ সালে করোনার মহামারির ধাক্কার ফলে বিপর্যয় আরও তীব্র হয়েছে। জ্বালানি, খাদ্য, তারল্য সংকট এতটাই চরমে পৌঁছেছে, নিরুপায় হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে সাধারণ মানুষ।
পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কায় জ্বালানি পাম্পসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী। রান্নার জ্বালানি গ্যাসের দাম শ্রীলঙ্কার মুদ্রায় এক হাজার ১৫০ রুপি থেকে বেড়ে চার হাজার ছাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে জরুরি খাদ্যপণ্যে। শিশু খাদ্য গুঁড়ো দুধ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। অর্থের অভাবে কাগজ ছাপা বন্ধের ফলে সম্প্রতি দেশটির কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে সরকার।
করোনায় পর্যটন শিল্পে ধস, আয় কমেছে ৬২ শতাংশ
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, দেশটির জিডিপির ১০ শতাংশ আসে পর্যটন থেকে। গত বছর এই আয় ৬২ শতাংশ কমেছে। ২০১৯ সালে একটি চার্চে বোমা হামলা এবং করোনাভাইরাসের কারণে এই খাতে ধস নামে। তাছাড়া সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে গেছে। সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালে ৫৪৮ মিলিয়ন ডলার এফডিআই কমেছে। ২০১৯ সালে এফডিআই ছিল ৭৯৩ মিলিয়ন এবং ২০১৮ সালে ছিল ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
চলতি বছরই চীনকে পরিশোধ করতে হবে ২ বিলিয়ন ডলার
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে শ্রীলঙ্কার প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আছে সাকুল্যে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালেও এটা ছিল প্রায় সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার। গত সপ্তাহে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে বলেছেন, তাদের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার।
সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে গত ২ দশকে চীন শ্রীলঙ্কাকে সবচেয়ে বেশি ঋণ সহায়তা দিয়েছে এবং বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানের চীনের দেওয়া ঋণের পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। যা ২০২২ সালের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ও এএফপির তথ্য অনুসারে, দেশটিতে গতমাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। জানুয়ারি মাসে এটি ছিল ১৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ছিল ১২ দশমিক ১ শতাংশ।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ
তবে, দেশটিতে খাবারের দাম বেড়েছে আরও বেশি। সরকারি তথ্য মতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতির পরিমাণ ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে এটি ছিল ২৫ শতাংশ এবং ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ছিল ২২ দশমিক ১ শতাংশ। ৪০০ গ্রাম দুধের মূল্য শূন্য দশমিক ৯০ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। যা শ্রীলঙ্কার প্রায় ২৬২ রুপির সমান।
অপরিকল্পিত পদক্ষেপ সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলেছে
সংকট উত্তরণে তখন থেকেই বড় ধরনের কৌশলের অভাব লক্ষ করা যায়। গত বছরে বেশ কিছু সিদ্ধান্তও নেয় মাহিন্দা রাজাপাকসের সরকার। এরমধ্যে হঠাৎ করেই অর্গানিক কৃষি চাষে পরিবর্তন আনা হয়। এটিকে অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়। এমন বেশ কিছু অপরিকল্পিত পদক্ষেপ শ্রীলঙ্কার চলমান সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ২০২১ সালের শেষ নাগাদ জাতীয় ঋণ পরিশোধের ব্যর্থতার আশঙ্কা দেখা দেয়। কারণ, দেশের বৈদেশিক রিজার্ভ ১৬০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। পাশাপাশি যেসব দেশ থেকে ঋণ নিয়েছে লঙ্কান সরকার, তা পরিশোধের সময় ঘনিয়ে এসেছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার ঋণ নেওয়া অব্যাহত ছিল। একই সময়ে জরুরি খাদ্য, জ্বালানি, মেশিনারি আমদানিতে পর্যাপ্ত ডলারের মজুত না থাকার মধ্য দিয়ে ২০২২ সাল শুরু হয়। এতে ঘাটতি আরও বাড়ে এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়।

শ্রীলঙ্কার রুপি মার্কিন ডলারের বিপরীতে নেমেছে ২৬৫- তে
শ্রীলঙ্কার রুপি মার্কিন ডলারের বিপরীতে ২৬৫-তে নেমেছে। আর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ১৬.৮ শতাংশ এবং বৈদেশিক রিজার্ভ ছিল ২৩১ কোটি ডলার। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আগের বৈদেশিক ঋণ গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রীলঙ্কার সরকারের। চলতি বছরেই প্রায় ৭০০ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে দেশটিকে। ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি দেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণের ব্যয়ও এই মজুত ডলার থেকেই করতে হবে। এমন ক্রান্তিলগ্নে সম্প্রতি দেশটির প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে বলেন, এ বছর ২২০০ কোটি ডলারের আমদানি সংক্রান্ত ব্যয় বহন করতে হবে শ্রীলঙ্কাকে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার কোটি ডলার।
কাগজ সংকটে পরীক্ষা দিতে পারে নি ৩০ লাখ শিক্ষার্থী
দেশটিতে কাগজেরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কাগজ সংকটের কারণে গত সপ্তাহে প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নিউজপ্রিন্ট সংকটের কারণে ইংরেজি সংবাদপত্র ‘দ্য আইল্যান্ড’ এবং সিংহলি ‘দিভাইনো’ ছাপা সংস্করণ বন্ধ করে দিয়েছে। অনলাইনে তারা কার্যক্রম চালাচ্ছে। বার্তা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কাকে সিঙ্গাপুরের আদলে গড়ে তুলতে ২০০৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মাহিন্দা রাজাপাকসের সরকার কঠিন শর্তে প্রচুর ঋণ নেয়। এই টাকায় বিলাসবহুল ভবন ও বন্দর নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এসব খাতে কোনো বেসরকারি বিনিয়োগ আসেনি। পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কান প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা শ্রীসেনার ওপর এই ঋণের বোঝা চাপে। তবে তিনি পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ওঠেন। তার সময়কালে বৈদেশিক রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার। প্রায় ৫২ বছর পরে শ্রীলঙ্কার বাজেটে উদ্বৃত্ত দেখা দেয়।

লোডশেডিং ‘মে পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে’
তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও হ্রাস পাওয়ায় দেশজুড়ে গত বুধবার থেকে প্রতিদিন রেকর্ড ১০ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু কোথাও কোথাও সর্বোচ্চ ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেই কাঠ-কয়লা আর কুপি-হারিকেনের যুগ আবার ফিরে এসেছে শ্রীলংকায়! পূর্বসূরি-সংস্কৃতির এই হঠাৎ পুনরুত্থান কিন্তু শখে বা স্বভাবে নয়-অভাবে!
জ্বালানি আমদানি করার মতো পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা না থাকায় সংকটে পড়া শ্রীলঙ্কার কোথাও কোথাও দৈনিক সর্বোচ্চ ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। বৃহস্পতিবার দেশটির বিদ্যুৎমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ পরিস্থিতি মে মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০ কোটি ডলার ধারে ডিজেলের একটি চালান শনিবার ইন্ডিয়া থেকে আসবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী পবিত্র ভান্নিয়ারাচ্চি।
তিনি বলেন, এই চালান আসার পর আমরা লোডশেডিংয়ের সময় হ্রাস করতে পারবো, কিন্তু তারপরও বৃষ্টি না আসা পর্যন্ত, যার জন্য মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের আর কিছু করার নেই।

দেশে ছেড়ে ইন্ডিয়ায় পথে সাধারণ মানুষ
শ্রীলংকায় বেকারত্ব ও খাদ্যের গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। সারা দেশে লেগেছে হাহাকার। দেশটিতে প্রচন্ড হারে বেড়েছে খাদ্য ও পানির দাম। শ্রীলংকার তামিলরা এখন ইন্ডিয়ায় আসারও চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে শ্রীলংকার ১৬ জন ইন্ডিয়ায় ঢুকেছেন। তারা শরণার্থী হিসেবে ঢুকেছেন। শরণার্থীরা জানান, সেখানে চাল প্রতি কেজিতে শ্রীলংকার মুদ্রায় ৫০০ টাকা অবধি পৌঁছেছে। ৪০০ গ্রাম পাউডার দুধের দাম ৭৯০ টাকা। এক কেজি চিনির দাম ২৯০ টাকা। ১৯৮৯ সালে গৃহযুদ্ধের সময় যেভাবে মানুষ পালাত, এবারেও সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তামিলনাড়ু পুলিশ জানিয়েছে শ্রীলঙ্কায় গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। তাই দেশটির শরণার্থীরা ঢুকছে। শ্রীলঙ্কার উত্তরদিকে তামিল প্রভাবিত এলাকা রয়েছে। তামিলনাড়ু ইন্টেলিজেন্সের সূত্রমতে এটি শুধু সূচনা। এখনও সেখান থেকে অনেক মানুষ আসবেন। ইন্টেলিজেন্সের তথ্যানুযায়ী খুব তাড়াতাড়ি আরও ২০০০ শ্রীলংকান শরণার্থী ঢুকবেন। শ্রীলংকার কাছে বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার শেষ হয়ে গেছে। জরুরিসামগ্রী বাইরে থেকে আনার জন্যও উপযুক্ত টাকা নেই।

‘এই সংকট আমার দ্বারা সৃষ্টি হয়নি’
করোনা মহামারির চ্যালেঞ্জের দিকে ইঙ্গিত করে প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে বলেন, ‘এই সংকট আমার দ্বারা সৃষ্টি হয়নি’। অনেক অর্থনীতিবিদ সংকট উত্তরণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সহযোগিতা গ্রহণকে সরকারের ‘একমাত্র’ উপায় বললেও ক্ষমতাসীনরা এই পথে হাঁটতে নারাজ ছিল। সম্প্রতি ব্যাপক বিক্ষোভ ও সমালোচনার মুখে সরকার নীতিগতভাবে ইউটার্ন নিয়েছে। রাজাপাকসে বলেন, সরকার এখন বন্ড পরিশোধে উপায় খুঁজে বের করার জন্য আইএমএফ-এর সঙ্গে আলোচনা শুরু করছে। এই মুহূর্তে আইএমএফ শ্রীলঙ্কাকে কীভাবে সহায়তা করবে এবং দেশটির খাদে পড়া অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কতটা সাহায্য করতে পারবে তা দেখার বিষয়।
কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুখোমুখি হতে হবে
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের এশীয় অর্থনীতিবিদ অ্যালেক্স হোমস বলেন, সরকার বিদেশি মুদ্রা ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক শ্রীলঙ্কান রুপির দরপতন ঠেকাতে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমাচ্ছে। এতে চাপ আরও বেড়েছে। এর ফলে খাদ্য আমদানির জন্য দেশটির বিদেশি মুদ্রা যথেষ্ট পরিমাণে ছিল না। মুদ্রাস্ফীতি দুই অঙ্কে পৌঁছানোর পেছনে এটি একটি কারণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারকে আগামী কয়েক মাস কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুখোমুখি হতে হবে। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমদানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ডলার সংরক্ষণ করা হবে, নাকি আন্তর্জাতিক বন্ডধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ইউডি/অনিক

