কঠোর শাস্তির বিধানই দেশে কমাতে পারে ধর্ষণ
সাজ্জাদ হোসেন । মঙ্গলবার, ০৫ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১০:৩০
বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে এবং সামাজিক মূল্যবোধ নষ্ট হওয়ায় দেশে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। ধর্ষণ প্রতিরোধে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি, তা থেকে বের হতে হবে। কেবল আইন প্রণয়ন নয়, ধর্ষককে দৃষ্টান্তমূলক সাজার আওতায় আনতে হবে। এদেশে ধর্ষিতারা বিচার পায় না, সমাজচ্যুত হয়। তাই বিচারহীনতায় দিন দিন ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছেই। এদেশে এমন ঘটনা নতুন নয়, অহড়হই ঘটছে। কত সংবাদপত্রে জায়গা পায় আবার বাকি সব ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়। অধিকাংশ ঘটনায়ই সমাজের বিচারপতিরা অপরাধীর পক্ষ নেয়, উল্টো ভিক্টিম কিংবা তাঁর পরিবারকে ফাঁসিয়ে দেয়।
যৌনতা মানুষের জীবনের একটি অন্যতম অধিকার, সেটা সবাই জানি। তবে এই যৌনতাকে বিকৃত করে উপস্থাপন কাম্য নয়। আর সেটাই হচ্ছে ধর্ষণ। সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নেওয়া এই ধর্ষণ উঠে এসেছে পাশ্চাত্য দেশগুলোর অসভ্য এক নোংরা সংস্কৃতি থেকে। যা বাংলাদেশ একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপান্তর হয়েছে। নেশাদ্রব্যের মতো স্মার্টফোনের মধ্যে রক্ষিত যৌন সুড়সুড়ি দেয়া বিনোদনসামগ্রী প্রতি মুহূর্তেই ইন্দ্রীয় লালসায় উন্মত্ত করে তুলছে। স্মার্টফোন যত সহজে একজনকে উত্তেজিত করতে পারে, এমনটি এর আগে কোনো যন্ত্র করতে পারেনি। স্মার্টফোন যে যৌন উদ্দীপনা, মাদকতা আনতে পারে অন্য কোনো মাধ্যমে তা সম্ভব না। খুন, ধর্ষণ আজকাল এই আধুনিক পৃথিবীর নিত্য নৈমেত্তিক ঘটনা হলেও আমাদের দেশে এর মাত্রা যেন সব বিচিত্রতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিছু মানুষরূপী নরপশু সভ্যতার ভাবধারাকে পাল্টে দিতে হায়েনার নখ মেলে বসেছে। ধর্ষণের ক্ষেত্রে থাকছে না বয়স, স্থান, কাল, পাত্রের ভেদ।
১৯৯৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ বিশেষ বিধান আইন করা হয়। ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন করা হয়। ২০০৩ সালে এ আইন আবার সংশোধন করা হয়। ধর্ষণের শাস্তি কত ভয়ানক, তা অনেকেই জানেন না। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৯ ধারায় ধর্ষণের বিচার হয়। এ আইনে ২০২০ সালে ধর্ষণের সর্বনিম্ন শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদন্ড এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড করা হয়েছে। ৯(২) উপধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা ওই ধর্ষণ-পরবর্তী তার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহলে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদ-ে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবে। অতিরিক্ত এক লাখ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে। উপধারা ৯(৩)-এ বলা হয়েছে, যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ধর্ষণের ফলে ওই নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহলে ওই দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হবে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করে, তাহলে ওই ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবে ও এর অতিরিক্ত অর্থদ- হবে। ধর্ষণের চেষ্টা করলে ওই ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর ও সর্বনিম্ন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবে। এ ছাড়া অতিরিক্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে। এদেশে ধর্ষণের পাকাপোক্ত আইন আছে ঠিকই কিন্তু আইনকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আইনের যারা প্রয়োগ করবেন তারা ঐ আইনের পথে হাঁটেন না। মামলার চার্জশিট গঠনের সময় ফাঁক-ফোঁকড় থেকে যায়। তাই শেষে রায়ে ধর্ষিত কিংবা নির্যাতনের শিকার লোকজন সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
ধর্ষণের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগে কোনো কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যার যার পারিবারিক বলয়ে ধর্মানুশীলনে একনিষ্ঠতা, পোশাকের শালীনতা, অশ্লীল সংস্কৃতিচর্চার পরিবর্তে শিক্ষণীয় বিনোদনমূলক ও শালীন সংস্কৃতি চর্চার প্রচলন নিশ্চিতকরণ। আর এটা করতে হলে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা, আইনের শাসন প্রয়োগ বা ফতোয়া দিলেই চলবে না, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যার যার অবস্থানে থেকে স্কুল-কলেজ, মাদরাাসা-মক্তব-মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সমাজের অন্য বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি কঠোর শাস্তির বিধান ও প্রয়োগ নিশ্চত করতে হবে। তবেই ধর্ষণ কমে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
লেখক: কলামিস্ট
ইউডি/সুস্মিত

