টিপ নিয়ে তুলকালাম
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৫ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:৩০
নারীদের স্বাভাবিক চলাফেরা বিঘ্নিত করতে কিছু নামধারী ধর্ম ব্যবসায়ী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্নভাবে অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাদীন দেশে প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছেমতো পোশাক পরিধান করতে পারবে, সাজগোজ করতে পারবে। ধর্মীয় অনুশাসন মানা-অমান্য করা যার যার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। সম্প্রতি টিপ নিয়ে এক শিক্ষিকার সঙ্গে একজন পুলিশ সদস্যের যে অপ্রীতিকর ঘটনা হয়েছে রাজধানীতে তা সত্যিই মেনে নেয়া যায় না। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের প্রত্যেক ব্যক্তি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে এটাই বাংলাদেশের মূলমন্ত্র। এখানে সকল ধর্মের মানুষ একসাথে বাস করছে। বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের সকল ধর্মের মানুষ স্বাচ্ছন্দেই এখানে থাকছে। বর্তমান সরকার যেখানে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজের সর্বস্তরে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ ভেদাভেদ দূর করে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে কাজ করে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে সরকারের পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্য, যাঁর নারীর নিরাপদ গমনাগমন নিশ্চিত করতে তৎপর থাকার কথা, তাঁর কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ অত্যন্ত অনভিপ্রেত। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতেই হবে। নতুবা এই ধরণের ঘটনা হরহামেশাই ঘটবে।

সেই পুলিশ সদস্য সাময়িক বরখাস্ত, তদন্ত কমিটি গঠন : টিপ পরায় তেজগাঁও কলেজের প্রভাষক ড. লতা সমাদ্দারকে লাঞ্ছনা ও অশালীন আচরণের অভিযোগে পুলিশ কনস্টেবল নাজমুল তারেককে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ওই ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। সোমবার (৪ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ডিএমপির জনসংযোগ শাখা থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশকে শনাক্ত করা হয়েছে। তার নাম মো. নাজমুল তারেক। কনস্টেবল নাজমুল তারেক শিক্ষক ড. লতা সমাদ্দারের সঙ্গে বাকবিতন্ডতায় লিপ্ত হয়। এ কথা তিনি প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন। ফলে, তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এ ঘটনায় দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ওই কমিটিকে আগামী তিন কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এর আগে, হেনস্তার ঘটনায় অভিযুক্ত কনস্টেবলকে শনাক্ত করে পুলিশ। তার নাম নাজমুল তারেক। পুলিশ লাইন থেকে সংযুক্ত হয়ে তিনি ভিআইপি, ভিভিআইপিদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতেন। সোমবার (৪ এপ্রিল) সকালে শেরেবাংলা নগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) উৎপল বড়ুয়া গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, টিপ পরায় এক শিক্ষিকাকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে নাজমুল তারেক নামের পুলিশ কনস্টেবলকে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই নারীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট বিশ্লেষণ করে নাজমুল তারেককে শনাক্ত করা হয়েছে। গত ২ এপ্রিল শেরেবাংলা নগর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন তেজগাঁও কলেজের থিয়েটার অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক লতা সমাদ্দার। থানায় দেওয়া অভিযোগে লতা সমাদ্দার লিখেছেন, শনিবার সকাল সোয়া ৮টার দিকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার বাসা থেকে রিকশায় ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমার সামনে নামেন। সেখান থেকে হেঁটে তেজগাঁও কলেজে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। তখন সেজান পয়েন্টের সামনে থেমে থাকা একটি মোটরসাইকেলের ওপর পুলিশের পোশাক পরা এক ব্যক্তি বসে ছিলেন। ওই মোটরসাইকেলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে ওই ব্যক্তি লতার কপালে টিপ পরা নিয়ে বাজে মন্তব্য করেন। এক পর্যায়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন পুলিশের পোশাক পরা ওই ব্যক্তি। পেছনে ফিরে ঘটনার প্রতিবাদ করায় ফের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় লতাকে। তাকে উদ্দেশ্য করে ‘টিপ পরছোস কেন’ মন্তব্য করেন ওই ব্যক্তি।

একবছর ধরেই আচমকা ‘পরিবর্তন’ সেই কনস্টেবলের: দুই বছর আগেও গান-বাজনা নিয়ে পড়ে থাকতেন সাময়িক বরখাস্তকৃত কনস্টেবল নাজমুল তারেক। কিন্তু টিপ নিয়ে এক শিক্ষিকাকে হেনস্তাকারী ওই কনস্টেবলের মধ্যে গত একবছর ধরেই ‘পরিবর্তন’ লক্ষ করেছেন সহকর্মীরা। দাড়ি বড় রাখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করেছিলেন তিনি। ডিএমপির প্রটেকশন বিভাগের কনস্টেবল নাজমুল তারেকের সহকর্মীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ১৯৯১ সালে জন্ম নাজমুল তারেকের। যশোরের একটি হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ২০১১ সালে কনস্টেবল পদে নিয়োগ পান। আট মাস ধরে ডিএমপির প্রটেকশন বিভাগে কাজ করছেন। তারা আরও জানান, নাজমুল তারেক দুই বছর আগেও গান-বাজনা নিয়ে পড়ে থাকতেন। গত একবছর ধরে তার মধ্যে পরিবর্তন দেখা যায়। দাড়ি রাখার জন্য তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করেছিলেন। তাকে অনুমতিও দেওয়া হয়। একবছর ধরে তিনি সব ধর্মীয় অনুশাসন ও রীতিনীতি মেনে চলছেন। তবে হঠাৎ নাজমুলের মধ্যে এমন পরিবর্তনের কারণ কেউ জানাতে পারেননি।

দেশজুড়ে নিন্দার ঝড়, প্রতিবাদ: ড. লতা সমাদ্দার হেনস্তার ঘটনায় দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় বইছে, চলছে প্রতিবাদ। ক্ষোভের প্রকাশ ঘটছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। বহু নারী-পুরুষ ফেসবুকে টিপ পরা ছবি দিয়ে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। শুধু ফেসবুক নয়, বিভিন্ন দল ও সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিশিষ্টজন সভা-সমাবেশ ও বিবৃতি দিয়ে ড. লতা সমাদ্দারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছেন। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ বিবৃতি দিয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ওই পুলিশ সদস্যকে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে পুলিশ প্রশাসন ও সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে। ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ’ সমাবেশ করে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিচারে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছে। হেনস্তা করা সেই পুলিশ সদস্যের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। সমিতি বলেছে, এ ধরনের অপকর্মের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সভ্য সমাজব্যবস্থা কায়েম করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই দাবি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. রহমত উল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া।
বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত না হোক: এর আগে সংসদে সুবর্ণা মুস্তাফা বলেন, দল-মত নির্বিশেষে বিশেষ করে নারী সমাজের জন্য অত্যন্ত ঘৃণিত একটি ঘটনা। ইভটিজিং আমরা শুনে এসেছি। বখাটে ছেলেরা স্কুলের বাচ্চাবাচ্চা মেয়েদের ইভ টিজ করে। সেই পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু আমি যখন দেশের আইনরক্ষাকারী কাউকে ইভটিজিংয়ের ভূমিকায় দেখি, তখন সেটা আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।
এই বিষয় নিয়ে লেখিকা তসলিমা নাসরিন টুইটে বলেন, কলেজ শিক্ষিক লতা সমাদ্দার টিপ পরার জন্য বাংলাদেশে এক ধর্মান্ধ পুলিশ দ্বারা হয়রানির শিকার হন। তারপর থেকে সকল মুক্তচিন্তার নারী-পুরুষরা টিপ পরে হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। তারা চায় বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত না হোক।

এমন আচরণ ‘বর্ণবাদী ও অবমাননাকর’: লতা সমাদ্দারের সঙ্গে পুলিশ সদস্যের আচরণকে ‘বর্ণবাদী ও অবমাননাকর’ বলে আখ্যা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। সমিতির বিবৃতিতে বলা হয়, এ ঘটনায় শিক্ষক সমিতি ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। এ ঘটনা সর্বস্তরের নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।
এমন ঘটনা সাম্প্রদায়িক আচরণের নগ্ন রূপ: তেজগাঁও কলেজের থিয়েটার অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক ড. লতা সমাদ্দারকে হেনস্তার ঘটনা সাম্প্রদায়িক আচরণের নগ্ন রূপ। সাংবিধানিকভাবেই প্রত্যেক নারী-পুরুষের নিজের পছন্দ অনুযায়ী সাজপোশাক নির্বাচনের অধিকার রয়েছে। লতা সমাদ্দারকে হেনস্তাকারী পুলিশ সদস্যকে অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা আওতায় আনতে হবে। সোমবার (৪ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে এ দাবি জানান বক্তারা। বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস) ও জনউদ্যোগ আয়োজিত কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন বিএনপিএসের উপপরিচালক শাহনাজ সুমী। শাহনাজ সুমী বলেন, নারীদের স্বাভাবিক চলাফেরা বিঘ্নিত করতে ধর্ম ব্যবসায়ী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্নভাবে অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই গোষ্ঠী প্রায়ই নারীর পোশাক-আশাক নিয়ে জনসমক্ষে আপত্তিকর আচরণ করছে এবং তাদের বিরুদ্ধে সহিংস ও যৌন আক্রমণ চালাচ্ছে। হয়রানির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি পুলিশ বাহিনীতে ওই গোষ্ঠীরই প্রতিনিধিত্ব করছেন। জীবনানন্দ জয়ন্ত বলেন, কেবল টিপ পরার কারণে একজন নারী শিক্ষককে অকথ্য ভাষায় গালি দেওয়া এবং তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা স্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ। এ ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।

সাম্প্রদায়িকতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করছে: বিশ্লেষকরা বলেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য ৩০ লাখ মানুষ রক্ত দিয়েছে। এই ৩০ লাখ শহীদের স্বপ্ন ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক ও উন্নত বাংলাদেশ। অথচ এখন মেয়েরা টিপ পরলে দোষ, সাইকেল চালালে দোষ। মেয়েরা যা করবে তাই দোষ। যা সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই লতা সমাদ্দারের ঘটনাসহ প্রত্যেকটা ঘটনার বিচার চাই। তারা আরো বলেন, সরকার ও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সাম্প্রদায়িকতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করছে। এ থেকে মুক্তি না পেলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তাই অবশ্যই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের ওই পুলিশ সদস্যকে খুঁজে বের করে তার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
শোবিজ তারকা টিপ পরে প্রতিবাদ: সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিল্পীরাও প্রতিবাদ মুখর হয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। টিপ পরে ছবি পোস্ট করে জানাচ্ছেন প্রতিবাদ। অভিনেতা সাজু খাদেম কপালে টিপ পরা একটি দারুণ ছবি প্রকাশ করে এ প্রতিবাদের অংশ হলেন। ক্যাপশন জুড়ে দেন, ‘লাল টিপ… লাল সূর্য…।’ এছাড়াও ক্যাপশন ছাড়া কপালে টিপ পরা ছবি প্রকাশ করে এই প্রতিবাদে সংহতি জানিয়েছেন, অভিনেতা প্রাণ রায়, আনিসুর রহমান মিলন, মনোজ প্রামাণিক।চিত্রনায়ক সাইমন সাদিকও টিপ পরা ছবি দিয়ে প্রতিবাদের অংশ নিয়েছেন। এ নায়ক একটি সিনেমায় তৃতীয় লিঙ্গের একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। টিপ পরা সেই ছবিটির একটি স্থিরচিত্র শেয়ার করে প্রতিবাদ জানান তিনি। ক্যাপশনে লিখেন, প্রতিবাদ।
ইউডি/সুপ্ত

