মৎস্য উৎপাদনে দেশের সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃত
সাইদুল মিরাজ । মঙ্গলবার, ০৫ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:২০
চাষের মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। শুধু তা-ই নয়, কয়েক বছর ধরে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য আহরণে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি গত পাঁচ বছরে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিতেও বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে চলে এসেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০২০-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মৎস্য উৎপাদনে শীর্ষে থাকা চীনের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে দ্বিতীয় অবস্থানে তুলে এনেছে।
অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য উৎপাদনে শীর্ষ পাঁচটি দেশ হলো চীন, ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া। চীনের উৎপাদন ২০ লাখ টনের বেশি। কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকে দেশটির মাছ উৎপাদনের তথ্য পুনর্মূল্যায়ন করা শুরু হয়। ফলে ২০১৭ সালে তাদের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়। উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারতের উৎপাদন ছাড়িয়েছে ১৭ লাখ টন। চীনের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির কারণে ভারতের প্রবৃদ্ধি এখন শীর্ষে। এর পরই অবস্থান বাংলাদেশের, যেখানে বছরে মাছের উৎপাদন প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন। বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়া কোনো দেশেরই প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় নেই। মিয়ানমার ও কম্বোডিয়ার প্রবৃদ্ধিতে স্থিতাবস্থা বিরাজ করছে।
মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃত। মৎস্য খাত বাংলাদেশে একটি স্বর্ণালি অধ্যায় সৃষ্টি করছে। বিশ্বে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান এখন তৃতীয়। এছাড়া বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। ইলিশ উৎপাদনে প্রথম ও তেলাপিয়া উৎপাদনে চতুর্থ। উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বৈশ্বিক অবস্থানে বাংলাদেশের আরো একটি সফলতা যুক্ত হয়েছে। কেননা বিশ্বব্যাপী মৎস্য উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার ধীরগতিসম্পন্ন। সেখানে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবেই এগিয়ে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা হচ্ছে ভাতে-মাছে বাঙালির চিরন্তন বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশের মৎস্য খাতকে যেভাবে বিকশিত করা হয়েছে, এ ধারাকে অব্যাহত রেখে মৎস্যসম্পদে বিশ্বে আমরা অনন্য অসাধারণ জায়গায় পৌঁছে যাব। এ লক্ষ্য নিয়ে মৎস্য খাতকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে এবারের মৎস্য সপ্তাহ উদযাপন হতে যাচ্ছে। দেশের মানুষের কাছে যে মাছগুলো দুর্লভ ছিল, সেগুলো ফিরে এসেছে। বিলুপ্তপ্রায় ৩১ প্রজাতির দেশীয় মাছকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মৎস্যজাত পণ্য তৈরি খাতকেও সরকার উৎসাহিত করছে। দেশের বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল তথা হাওর অঞ্চল, পার্বত্য অঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চলে ভিন্ন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। মাছকে নিরাপদ রাখার জন্য অভয়াশ্রম সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করছে সরকার। নদীতে যাতে মাছের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং মাছ বেড়ে উঠতে পারে সেজন্য প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। মৎস্য খাতে উপযুক্ত পদক্ষেপের কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছ, সামুদ্রিক মাছ ও অপ্রচলিত মৎস্যসম্পদের বিস্তার ঘটছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মাছের অভয়াশ্রম ও প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং মৎস্য আইন বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া পোনা অবমুক্তি, বিল নার্সারি স্থাপন, পোনা সংরক্ষণ কর্মসূচি, মুক্ত জলাশয়ে মাছ চাষ নিবিড়করণ, সমাজভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা গ্রহণ এবং মাছচাষীদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কারণে মাছের উৎপাদন বাড়ছে। তবে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য আহরণ হিসেবে নদী, কাপ্তাই লেক ও বিলে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সারা বিশ্বেই মাছ উৎপাদনে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উৎস হলো নদী। কিন্তু মাছ উৎপাদনে আমরা নদীকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। এক সময় নদীতে ২৯০ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও এখন তা ১০০টিতে নেমে এসেছে। নদীতে মাছের উৎপাদন বাড়াতে সবার আগে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহের পাশাপাশি পানি দূষণমুক্ত করতে হবে। এটা হলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পোনা ছেড়ে কিংবা প্রাকৃতিক উপায়ে মাছ চাষ বাড়ানো সম্ভব হবে।
ইউডি/সুস্মিত

