মানসিক অসুস্থদের ইতিবাচক থাকতে সাহায্য করুন
শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ । শুক্রবার, ০৮ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১১:১৫
বাংলাদেশে যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতন, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা, দাম্পত্য কলহ, উত্ত্যক্তকরণ, প্রেম ও পরীক্ষায় ব্যর্থতা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব, আত্মহত্যার উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা, মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি কারণে বেশির ভাগ আত্মহত্যা ঘটে। প্রচারমাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদের অতিপ্রচার, অপপ্রচার বা অদায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের কারণেও কখনো কখনো আত্মহত্যার ঘটনা বাড়তে পারে। আত্মহত্যার প্ররোচণার অর্থ এমন পরিস্থিতি সচেতনভাবে সৃষ্টি করা, যা পীড়িত মানুষটির সামনে এ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ই অবশিষ্ট রাখে না। নিদারুণ অপমানের শিকার হয়ে নীরব প্রতিবাদ হিসেবে বহু মানুষকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে দেখা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে ৮ লাখ লোক আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১৬ জন। ২০১৪ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন। আর পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, বছরে গড়ে ১০ হাজার মানুষ ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। এর বাইরে ঘুমের ওষুধ সেবন, ছাদ কিংবা উঁচু স্থান থেকে লাফিয়ে পড়া কিংবা রেললাইনে ঝাঁপ দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোও বিরল নয়। আত্মহত্যা করার কতো গুলো কারণ রয়েছে। যেমন জেনেটিক, হঠকারিতা বা ইমপালসিভিটি, মানসিক রোগ, প্রত্যাশার মানসিক চাপ, পারিবারিক কলহ, দারিদ্র্য, রাত জাগার বদভ্যাস, মাদকাসক্তি, জুয়া খেলা, দীর্ঘমেয়াদি পীড়াদায়ক রোগ এবং প্রেমে ব্যর্থতা। বিবিএস সূত্র জানায়, ২০২১ সালের প্রথম ১০ মাসে দেশে মোট মৃত্যুর কিছু কারণ খুঁজে বের করে বিবিএস। ১০ মাসে যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ৫ হাজার ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তখন ১১ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। মহামারির এ সময়ে দেশে শুধু হার্ট-অ্যাটাক, হার্ট-ফেইলিওর ও হৃদরোগে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি একটি আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আত্মহননকারী ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এসে নিজের পরিবারের সদস্য, সহকর্মীদের কাছ থেকে নানা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। ওই ব্যক্তি নিশ্চয়ই চরম হতাশা থেকেই আত্মহত্যা করেছেন। ফেসবুকে লাখো-কোটি মানুষ তাঁর আত্মহত্যার ভিডিওটি দেখেছেন। প্রশ্ন হলো, আমাদের মানবিক বোধগুলো কি তবে এতটাই ভোঁতা হয়ে গেছে যে কোনো কিছুই এখন আর আমাদের স্পর্শ করে না। জরিপ মতে, বিশ্বের পুরুষ আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা বেশি হলেও বাংলাদেশে নারীরা বেশি আত্মহত্যা করেন। নারী ৫৭ শতাংশ, পুরুষ ৪৩ শতাংশ। কোনো ব্যক্তি কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে আত্মহত্যা করেন না। অনেক কারণ থাকে এর পেছনে। এ থেকে প্রতিকারের জন্য আমাদের সবাইকে ডিপ্রেশন (মানসিক অসুস্থতা) সম্পর্কে জানতে হবে। তাহলে ডিপ্রেশনে থাকা মানুষকে আমরা সহায়তা করতে পারব। মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির পাশে যখন কেউ থাকে, তখন তিনি স্বাভাবিক থাকেন। আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে হলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বলা বাহুল্য, একাকিত্ব মানুষকে ভিতরে ভিতরে শেষ করে দেয়। একাকিত্ত থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই আপনাকে কাজের ভিতর থাকতে হবে। একাকিত্ব দূর করতে যতটা সম্বব বন্ধুদের সাথে মিশুন, তাদের সাথে প্রাণ খুলে কথা বলেন। কোনভাবেই একা একা থাকা যাবে না। পরিবারকে সময় দিন, তাদেরকে আপনার মনের কথা খুলে বলেন। অন্যদিকে, অবহেলিত বাপ-মার দুঃখ কষ্ট দূর করার জন্য সন্তানের কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে সরকার ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন প্রণয়ন করে। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩-এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সন্তান তাঁর বাবা বা মাকে অথবা উভয়কে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধনিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। তা ছাড়া সন্তান তাঁর মা-বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেবেন ও পরিচর্যা করবেন।
পরিশেষে বলছি, বর্তমান সময়ে আমরা পরিবারের বয়োবৃদ্ধদের থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছি। তাদের বাড়তি বোঝা ভাবতে শুরু করেছি। বাবা-মার প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রায়ই করতে পারছি না। এসবেরই নানাবিধ সামাজিক বিষফল এখন দেখা দিচ্ছে। এই অপসংস্কৃতি থেকে মুক্তির উপায় আমাদের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক-সমাজিক বন্ধন অঁটুট রাখা। সেদিকে নজর দেয়া জরুরি।
লেখক: কলামিস্ট।
ইউডি/সুস্মিত

