শ্রীলঙ্কায় সংকট: সতর্ক থাকতে হবে আমাদেরও
রহিম রহমান । শনিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:১০
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পর্যটনময় রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে এই দ্বীপ রাষ্ট্র। ১৯৮৩ সালে তামিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে ২০০৯ সালে শেষ হয়। তখনও তাদের অর্থনৈতিক কিংবা অন্যান্য পরিস্থিতি এতটাও খারাপ হয়নি। বিদেশি মুদ্রার সংকটে থাকা শ্রীলঙ্কাকে দুই কিস্তিতে মোট ১৫ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ। কারেন্সি সোয়াপের আওতায় গত বছর এই ঋণ ছাড় করা হয়। মূলত ২০২০ সালে করোনার মহামারির ধাক্কার ফলে বিপর্যয় আরও তীব্র হয়েছে। জ্বালানি, খাদ্য, তারল্য সংকট এতটাই চরমে পৌঁছেছে, নিরুপায় হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে সাধারণ মানুষ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এতটাই নিচে নেমেছে যে আমদানি করা কাগজের অভাবে স্কুল পরীক্ষা বন্ধ অনির্দিষ্টকালের জন্য। রান্নার গ্যাসের পাশাপাশি অভাব দেখা দিয়েছে কেরোসিন কিংবা পেট্রোলের ক্ষেত্রেও। বিদ্যুতের অভাবে শুরু হয়ে গিয়েছে ব্ল্যাক আউট।
শ্রীলংকা একযুগের বেশি সময় ধরে তাদের দেশে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, রাস্তা এবং আরও নানা ধরণের প্রকল্প রয়েছে, যেগুলো বর্তমানে অপ্রয়োজনীয় ও অতিবাহুল্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে দেদারছে ঋণ নিয়েছে শ্রীলংকার বিভিন্ন সরকার। যার কারণে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে খালি হতে থাকে। সেদেশের অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, গত ১৫ বছর ধরে শ্রীলংকায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ তেমন একটি হয়নি। বিদেশি বিনিয়োগের পরিবর্তে বিভিন্ন সরকার ঋণ করার প্রতি মনোযোগী হয়েছে।
এরই আলোকে অনেকেই বলছেন বাংলাদেশেও শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থায় যেতে পারে, তবে এটা নিছকই বলা। অর্থনৈতিক সমীকরণের কোনো দিক দিয়েই শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থানে বাংলাদেশ পৌঁছাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই বিষয়ে দৃষ্টি রাখছেন। বাংলাদেশ ঋণ পরিশোধে কখনও ‘খেলাপি হয়নি’ এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি ‘অনেক মজবুত’ উল্লেখ করে শ্রীলঙ্কার মত অর্থনৈতিক সংকট এড়াতে সরকার ‘অত্যন্ত সতর্ক’ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে যত ঋণ নেয়, সব সময় সময়মতো পরিশোধ করে। বাংলাদেশ একটা দেশ যে দেশটি কোনোদিন ঋণ পরিশোধে ডিফল্টার হয় নাই, হবেও না। সেদিক থেকেও আমাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি অনেক মজবুত।
ক্রমাগত উন্নতিতে এক যুগ আগে যে শ্রীলঙ্কা উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উঠার পথে ছিল, সেই শ্রীলঙ্কা এখন দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে।শ্রীলঙ্কার পরিসংখ্যান বিভাগ জানিয়েছে, মার্চে মূল্যস্ফীতি হয়েছে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৮.৭ শতাংশ। খাদপণ্যের মূল্যস্ফীতি ৩০.২ শতাংশে পৌঁছেছে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে শ্রীলঙ্কার রুপির অবমূল্যায়ন। মার্চের শুরুতে শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক রুপির বিনিময় হার খোলাবাজারের উপর ছেড়ে দেওয়ায় তা ৩০ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ডলারের বিপরীতে ২৭৫ রুপি দরে লেনদেন হয়। তা ছাড়া বিদেশি মুদ্রা বাঁচাতে গত বছর কিছু দিন সার আমদানি বন্ধ রেখেছিল সরকার। তার খেসারতও এখন দিতে হচ্ছে পণ্যমূল্যে। ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় গত মাসে শ্রীলঙ্কা তাদের একমাত্র তেল শোধনাগারটি বন্ধ করে দেয়। ডিজেল সঙ্কট যত বাড়বে বিদ্যুতের লোডশেডিংও তত বাড়তে থাকবে। লেখক: বেসরকারি চাকুরিজীবী
ইউডি/সুপ্ত

