পাকিস্তান পার্লামেন্টে আজ ভাগ্য নির্ধারণী ‘ম্যাচ’: রান আউটের পথে ইমরান!
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৪:০০
পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট ব্যাতিক্রম এক রায়ে অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে। রায়ে জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকারের অনাস্থা ভোট খারিজকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইমরান খানের সরকারের ভাগ্য সংসদে আজ শনিবার ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। রায় মেনেও নিয়েছেন ইমরান খান। কি হতে যাচ্ছে ইমরানের ভাগ্যে? বিস্তারিত লিখেছেন সাইফুল অনিক।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ভাগ্য এখন শূন্যে ঝুলে আছে। তার ভাগ্যে কি আছে সেটা হলফ করেই বলে দেয়া যাচ্ছে না। অস্বাভাবিক কিছু না ঘটলে ইমরান খানই হবেন অনাস্থা ভোটে বিদায় নেওয়া পাকিস্তানের প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী। এর আগে দুই প্রধানমন্ত্রী অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হয়েও টিকে যান। সেনা হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস থাকা পাকিস্তানে কোনো প্রধানমন্ত্রীই তাদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। কারও কারও মতে, জোটের ঐক্য টেনে বেঁচে যাওয়ার খানিক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যাই ঘটুক, পাকিস্তানের জনগণ আজ নতুন ইতিহাসের অংশ হতে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
গতকাল শুক্রবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে মেনে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। অনাস্থা ভোট খারিজ ও জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করলে নতুন মোড় নেয় দেশটির অস্থিতিশীল রাজনীতি।
রায় মেনে নিয়েছে ইমরান খান
জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ইমরান বলেছেন, আমি সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছি। গতকাল শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন যে তিনি একদিন আগে জারি করা সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে নিচ্ছেন। আস্থা ভোটের আগে দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ পাক প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “আমি এই রায়ে দুঃখিত, কিন্তু আমি এটা মেনে নিচ্ছি।”
বিদেশি হস্তক্ষেপের দাবি নিয়ে তদন্ত করল না শীর্ষ আদালত, সুপ্রিম কোর্টের রায়কে মেনে নিয়েও ইমরান খান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে তিনি অন্তত সুপ্রিম কোর্ট দ্বারা তদন্তের প্রত্যাশা করছেন। তিনি বলেছেন, “পাকিস্তানের অনাস্থায় বিদেশী হস্তক্ষেপ ছিল। আমি চেয়েছিলাম যে সুপ্রিম কোর্ট অন্তত এটি দেখুক, এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ যে একটি বিদেশী দেশ একটি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সরকারকে পতন করতে চায়।”
একটি দীর্ঘ টেলিভিশন ভাষণে তিনি ফের বিরোধীদের বিরুদ্ধে ঘোড়া কেনাবেচার অভিযোগ তুললেন। পাক প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি বিশ্বের নানা দেশ ঘুরেছি, কিন্তু কোথাও এমন খোলামেলা দুর্নীতি দেখিনি।”
কী ঘটবে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে?
সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যেই ভাগ্য নির্ধারণী অধিবেশন শুরু হবে। ৩৪২ আসনের পাক ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের ‘জাদু সংখ্যা’ ১৭২। গত রবিবার ১৯৭ জন সদস্য ইমরানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন। সেই হিসেবে ইমরানের বিদায় সময়ের ব্যপার। তবে ইমরান যদি নিজের দলের জোট পুনঃগঠিত করতে পারে তাহলে, ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিবে বৈকি। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, আদালতের এই রায়ের অর্থ হলো বিরোধীদল শনিবার (আজ) প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ওপর অনাস্থা ভোট করে তাকে পরাজিত করবে, এবং তাকে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে।
এদিকে, এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারবেন না স্পিকার আসাদ কায়সার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পিকার আসাদ কায়সারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব থাকলেও তিনি শনিবারের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারবেন না। ৩ এপ্রিল অধিবেশন শুরুর আগমুহূর্তে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে স্পিকারের বিরুদ্ধেও অনাস্থা প্রস্তাব এনেছিলেন বিরোধীরা। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৩(৪) অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সভার সভাপতিত্ব করতে পারবেন না যদি তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে কোনো প্রস্তাব আনা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আইন অনুযায়ী আসাদ কায়সার কেবল তার বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা ভোট চলাকালে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করতে পারবেন না। তিনি শনিবারের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারবেন।

বিরোধীরা শাহবাজকে প্রধানমন্ত্রী চান
ইমরানের বিদায়ের বিষয়টিকে নিশ্চিত ধরে নিয়ে ইতোমধ্যে পাকিস্তানের অন্তবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন— সে বিষয়ে ইতোমধ্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে বিরোধী দলগুলো। এই পদে দেশটির বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের (নওয়াজ) প্রেসিডেন্ট শেহাবাজ শরিফকেই দেখতে চান বিরোধী নেতারা। বিরোধী জোটের সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে গোণমাধ্যম আরও বলছে, জাতীয় সরকারের মতো নতুন ফেডারেল সরকার গঠন করা হবে। এতে আনুপাতিক হারে শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব থাকবে। তারা দাবি করছেন, তাদের সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। ইমরান আস্থাভোটে হেরে গেলে বিরোধীরা নতুন যাকে প্রধানমন্ত্রী বানাবে, তিনি আগামী বছরের অগাস্ট পর্যন্ত পারমাণবিক শক্তিধর দেশটি শাসন করতে পারবেন।

ইমরানের বিপক্ষে কলকাঠি নাড়ছেন যিনি
২০১৮ সালে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে তিনটি আসনে লড়ে সব ক’টিতেই হেরে যান পাকিস্তানের ঝানু রাজনীতিবিদ মাওলানা ফজলুর রেহমান। কার্যত পাকিস্তানি পার্লামেন্টের সদস্য না হয়েও ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ফজলুর রেহমান পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম)-এর প্রধান। ইমরান খানের বিরুদ্ধে প্রচারণা জোরদারে গেল বৃহস্পতিবার ভোরে ইসলামাবাদে তার বাসভবনে বৈঠক করেছিল সরকারবিরোধী এই জোট। পাকিস্তানি পার্লামেন্টের প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পিডিএমের অন্যতম অংশীদার।
এখনই ইমরানকে বিরোধী দলের নেতা দেখছেন জারদারি
সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের সমর্থন আছে দাবি করে বিরোধীরা ইতোমধ্যে সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখা শুরু করে দিয়েছেন। এর মধ্যে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও পিপিপির কো-চেয়ারম্যান আসিফ আলী জারদারি ইমরান খানকে পার্লামেন্টে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে স্বাগত জানাবেন বলে জানিয়েছেন। জারদারি বলেন, ‘শেহবাজ শরিফ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ইমরান খান বিরোধী দলের নেতায় পরিণত হবেন। তখন আমি তাকে স্বাগত জানাব।’
‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ তদন্তে কমিশন গঠন
এদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবের পেছনে কথিত ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ তদন্তের জন্য একটি কমিশন করেছে দেশটির সরকার। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরীর বরাত দিয়ে গতকাল শুক্রবার দেশটির গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে। শুক্রবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী ফাওয়াদ বলেন, ‘তদন্ত কমিশনের নেতৃত্বে থাকবেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) তারিক খান।’
তিনি বলেন, কমিশন প্রমাণ করবে ওই বিদেশি চিঠির অস্তিত্ব আছে। তবে এর আগে বিরোধী নেতা শেহবাজ শরিফ দাবি করেন, ওই চিঠি ভুয়া। এছাড়া ফাওয়াদ চৌধুরী বলেন, ‘শাসন ক্ষমতা পরিবর্তনের’ হুমকি থাকলেও কমিশন তা তদন্ত করবে। এরআগে, ইমরান খান বার বার দাবি করে আসছেন তাকে সরাতে বিদেশি শক্তি কাজ করছে। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি এক ভাষণে একটি চিঠি দেখান। এছাড়া নাম ফসকে এই চিঠির পেছনে আমেরিকার আছে বলে জানান।
ইমরানের রাজনৈতিক ধাক্কা
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে রাজনৈতিক ধাক্কা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্রিকেটার থাকার সময় অনেক হারা ম্যাচ জিতিয়েছেন ইমরান। কিন্তু রাজনীতির ময়দানে যেভাবে তিনি বিরোধীদের আনা অনাস্থার মোকাবিলা করতে চাইছিলেন, তা সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে বানচাল হয়ে গেল। প্রবীণ সাংবাদিক আশিস গুপ্ত গণমাধ্যমকে বলেছেন, এটা ইমরানের রাজনৈতিক জীবনে বড় ধাক্কা হয়ে থাকবে।

গণতন্ত্রই আসল প্রতিশোধ
পাকিস্তানে পার্লামেন্ট পুনর্বহালের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পর উল্লাসে মেতেছে ইমরানবিরোধী শিবির। একে গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবে দেখছে তারা। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আনন্দ প্রকাশ করে টুইটারে পিপিপি নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো লিখেছেন, ‘গণতন্ত্রই শ্রেষ্ঠ প্রতিশোধ! জিও ভুট্টো, জিও আওয়াম, পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’
জাতীয় পরিষদের বিরোধীদলীয় নেতা শাহবাজ শরিফ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শীর্ষ আদালতের এ রায় গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তিনি আরও বলেন, এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সংবিধান ও পাকিস্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছে। আদালতের স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা সমুন্নত থেকেছে। বিলাওয়াল বলেছেন, অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে এবার ভোটাভুটি হবে। তারপর বিরোধীরা ক্ষমতায় আসবে। নির্বাচনী সংস্কার হবে। এরপর স্বচ্ছতার সঙ্গে ভোটে যাওয়া হবে।

ইমরানের ঘাটতি ও আমেরিকা
ইমরান খান ২০১৮ সালে নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি দুর্নীতির মোকাবেলা করা এবং অর্থনীতি ঠিক করার কথা বলে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। পাকিস্তানের জনগণের বিরাট অংশের মধ্যে এখনো তার জনপ্রিয়তা আছে। তবে পাকিস্তানে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকায় এবং বিদেশি দেনার বোঝা আকাশচুম্বী হওয়ার প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিতে যে সংকট দেখা দেয়, তার কারণে মিস্টার খানের সমর্থন অবশ্য ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, ২০১৮ সালে ক্ষমতায় বসা ইমরান ও তার রক্ষণশীল এজেন্ডাগুলোকে দেশটির রাজনীতিতে বেশ প্রভাবশালী সেনাবাহিনী পছন্দ করলেও পরবর্তীতে ওই সমর্থন ধরে রাখতে পারেননি পিটিআই নেতা।
আফগানিস্তানে আমেরিকা-নেতৃত্বাধীন বাহিনীর আগ্রাসনের বিরোধিতা করে আসা ইমরান ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছিলেন। আমেরিকার মদদেই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চক্রান্ত হচ্ছে বলে সম্প্রতি অভিযোগও করেছেন তিনি। ওয়াশিংটন তার এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে, ইমরানের সমর্থকরা দাবি করছেন সমস্যা উতরে যাবেন ইমরান। পিটিআই নেতা ফয়সাল জাভেদ খান বলেন, ইমরান তার পথে আসা চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে মোকাবেলা করবেন তা ভালভাবে জানেন। আপাতদৃষ্টিতে বিরোধীরা ভাবছে তারা জিতে গেছে কিন্তু সেটা না। তারা হেরে গেছে।
ইমরান পক্ষ ও বিরোধীদের বক্তব্য ও আশা ছাপিয়ে আজই নির্ধারণ হবে ক্ষমতার মসনদ কার। এখন ইমরানের জয়-পরাজয় যাই হোক না কেন তা পাকিস্তানের জন্য ইতিহাস হয়েই থাকবে। এখন শুধু কিছু সময়ের অপেক্ষা।
ইউডি/অনিক

