নতুন ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ঘটাবে শিল্পবিপ্লব
আশিকুর রহমান । শনিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৪:১০
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদতবরণের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তি থমকে যায়। অনেক চড়াই-উতরাই পার করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর কৃষি, শিল্প, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্যাস-বিদ্যুতের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ও বিপ্লব ঘটিয়েছেন, তা ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে কানেক্টিভিটি তৈরি যোগাযোগব্যবস্থায় অন্যমাত্রা সৃষ্টি করেছেন। দেশের সক্ষমতায় পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে। স্বপ্নের মেট্রোরেল তৈরি হচ্ছে। তাই তো ২০৩০ সালের মধ্যে শিল্পবিপ্লব ঘটানোর লক্ষ্যে নতুন সংযোজন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নিলেন।
দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির প্রত্যাশা নিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনায় এ জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়ে বাস্তবায়ন করছে ধাপে ধাপে। অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য মূলত: খাস জমি, ভূমি পুনরুদ্ধার ও অকৃষি জমিকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্পায়নের সুবিধার জন্য একটি ভূমি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বেজার তথ্যানুসারে, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নির্মাণাধীন ও পরিকল্পনাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে আগামী ৫ বছরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বেজা‘র দেওয়া তথ্য অনুসারে, এ পর্যন্ত দেশে অনুমোদন পেয়েছে ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল। তার মধ্যে উৎপাদনরত অর্থনৈতিক অঞ্চল ৮টি। এছাড়া বাস্তবায়নাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চল আছে ২৮টি। অর্থনৈতিক অঞ্চলে উৎপাদনশীল শিল্প রয়েছে ২৯টি। অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মাণাধীন শিল্প রয়েছে ৩৯টি। বেজা গভর্নিং বোর্ড যে ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান নির্ধারণ ও জমির পরিমাণ অনুমোদন করেছে, তার মধ্যে সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ৬৮টি। আর বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ২৯টি।
এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে দুটো। ট্যুরজিম পার্ক রয়েছে ৩টি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর, মহেশখালী, শ্রীহট্ট, জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সাবরাং ট্যুরিজম পার্কে ১৬৮ বিনিয়োগকারীর অনুকূলে সর্বমোট ৭২১৫ একর জমি ইজারা দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমান প্রায় ২৪.৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া প্রায় ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয়। সর্বমোট বিনিয়োগের প্রস্তাব দাঁড়িয়েছে ২৮.২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ১০ (দশ) লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরকে বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পিত শিল্পনগর হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এ শিল্পনগরের আয়তন প্রায় ৩০ হাজার একর । এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ একটি শিল্পনগর হচ্ছে।এ শিল্পনগরীর মহাপরিকল্পনা করা হয়েছে। এই শিল্পনগরকে কয়েকটি জোনে ভাগ করে বিভিন্ন ধরনের শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। শিল্প ছাড়াও একটি পূর্ণাঙ্গ শহরের সম্ভাব্য সকল ধরণের নাগরিক সুযোগ সুবিধাসহ এ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা রয়েছে। এই শিল্পনগরে থাকছে হালকা, মাঝারি, বৃহৎ ও ভারি শিল্প। শিল্পনগরে থাকবে আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা, নগর কেন্দ্র, বিজনেস হাব, সার্ভিস জোন, প্রশাসনিক/ প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা ও পুর্নবাসন এলাকা।
পরিকল্পনায় শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। সমুদ্রপথে আমদানি রফতানির জন্য শিল্পনগরে একটি সমুদ্র বন্দর এবং সংশ্লিষ্ট লজিষ্টিক সুবিধা প্রদান করার জন্য রাখা হয়েছে লজিস্টিক এলাকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য তিনটি সংযোগ সড়কের প্রস্তাব করা হয়েছে এবং একটি ০৪ লেন সড়কের মধ্যে ২ লেনের শেখ হাসিনা সরণির নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর এর মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন হলে আগামী ২০ বছরে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মোট জমির পরিমাণ ১,৩০০ একর। মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল ২য় পর্যায়ের জন্য ইতোমধ্যে ফিজিবিলিটি, সামাজিক ও পরিবেশগত সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার মোংলা সমুদ্র বন্দর ও মোংলা ইপিজেড এর পাশে ২০৫ একর জমির ওপর অবস্থিত। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ফলে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ২৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল (১ম পর্যায়) এ মোট জমি ৫০০ একর। অর্থনৈতিক অঞ্চলটি নির্মাণে ডেভেলপার নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এই অঞ্চল বাস্তবায়ন হলে এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখন দরকার নিবিড় তদারকি। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন অগ্রগতি আমরা দেখতে চাই প্রতিটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের।
২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু করতে পারলে তাতে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান হবে। রপ্তানি আয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। বেজা বেকার সমস্যা সমাধান করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তার জন্য বেজা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন সদিচ্ছার এবং নিজেদের দুর্নীতিমুক্ত রাখা। নিজেদের এক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। তাহলে জনগণ পাবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা।
ইউডি/অনিক

