অ্যারিস্টটল: মধ্যযুগের বিস্ময়কর বিজ্ঞান প্রতিভা
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:৩৫
প্রাচীন পৃথিবীর যে ক’জন ব্যক্তি সম্পর্কে না জানলেই নয় তাদের মধ্যে অ্যারিস্টটল সম্ভবত সবার উপরেই থাকবেন। তিনি বিজ্ঞানী ছিলেন, ছিলেন দার্শনিক, এমনকি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীও। তিনিই ছিলেন তার সময়ের শেষ ব্যক্তি যিনি জ্ঞানের সকল পরিচিত শাখায় দক্ষ ছিলেন! জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় সকল শাখায় তার বিস্ময়কর অবদান তাকে করেছে পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম প্রভাবশালী এক ব্যক্তিত্বে। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী অ্যারিস্টটল এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
অ্যারিস্টটল কে ছিলেন?
অ্যারিস্টটল ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। তাকে প্রাণিবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। এছাড়া প্লেটোর সাথে যৌথভাবে তাকে “পশ্চিমা দর্শনের জনক” বলে অভিহিত করা হয়। এরিস্টটল সক্রেটিস ও প্লেটোর দর্শনসহ তার পূর্বের সময়ের বিদ্যমান বিভিন্ন দর্শনের জটিল ও সদৃশ সমন্বয় দেখান। সব পরিচয় ছাড়াও তার আরো একটি পরিচয় আছে। তিনি দ্বিগ্বীজয়ী বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এর শিক্ষক ছিলেন, আবার বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটোর ছাত্র ছিলেন। বই লিখে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি। তার লেখার বিষয়ের মধ্যে ছিল পদার্থবিজ্ঞান, অধিবিজ্ঞান, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রাজনীতি, ভাষা, সঙ্গীত, থিয়েটার, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণীবিজ্ঞান, রসায়ন, জোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি। নিজের সময়ের চেয়ে তিনি কতটা অগ্রসর ছিলেন তা বোঝাতে তাকে কেবল আইনস্টাইন আর আর্কিমিডিস এর সাথেই তুলনা করা যেতে পারে।
অ্যারিস্টটল এর জন্ম
খ্রীষ্টপূর্ব ৩৮৪ অব্দে এথেন্স থেকে প্রায় দুইশত মাইল উত্তরে মেসিডোনিয়ার অন্তর্গত স্টোগিরা নগরে মহামতি এরিস্টটল জন্মগ্রহণ করেন। প্রাচীন বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে বিশ্বে এরিস্টটলই সর্ব অগ্রগণ্য। তাকে বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ও দর্শনের গুরুও বলা হয়। এই মনীষীর পিতা ছিলেন আলেকজান্ডারের দাদা (পিতামহ), মেসিডোনিয়ার রাজা এরিমনটাসের বন্ধু ও চিকিৎসক।
অ্যারিস্টটল ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। তাকে প্রাণিবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তিনিই ছিলেন তার সময়ের শেষ ব্যক্তি যিনি জ্ঞানের সকল পরিচিত শাখায় দক্ষ ছিলেন! নিজের সময়ের চেয়ে তিনি কতটা অগ্রসর ছিলেন তা বোঝাতে তাকে কেবল আইনস্টাইন আর আর্কিমিডিস এর সাথেই তুলনা করা যেতে পারে।
অ্যারিস্টটল শৈশবকাল
শৈশবকাল থেকেই চিকিৎসাবিদ্যা চর্চার পরিবেশে মানুষ হওয়ায় এরিস্টটল পিতার মতো বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে পড়েন। তবে সেই প্রাচীন যুগে বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যম ছিলো কোনো যন্ত্রপাতি নয়, শুধু জ্ঞানী ও বিত্ত মানুষের অসাধারণ মেধা ও পর্যবেক্ষণ শক্তির দক্ষতা। যে জন্য আধুনিক যুগের একজন গ্রীক বিশেষজ্ঞ এবং লেখক পেলার এরিস্টটল সম্পর্কে বলেছেন, তিনি ঘড়ি ছাড়া সময় নির্ণয় করতে, থার্মোমিটার ছাড়া আবহাওয়া পরীক্ষা করতে পারদর্শী ছিলেন। কারণ, যে সবের উপর আধুনিক বিজ্ঞানের ব্যবহারিক মতামত প্রতিষ্ঠিত তার কিছুই তো তখন আবিষ্কৃত হয়নি।
এজন্যে একটা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের অভাবে অ্যারিস্টটলের জ্যোতির্বিদ্যা -চর্চা হয়ে পড়েছে ছেলেমানুষী কল্পনাপ্রসূত। এক অণুবীক্ষণের অভাবে তার জীববিদ্যা হয়ে পড়েছে লক্ষহীন আর বিপথগামী। বিভিন্ন দিকে তার সময়কালে অতুলনীয় সাফল্য সত্বেও গ্রীস শিল্প ও কারিগরী আবিষ্কারের ক্ষেত্রে অনেক পিছনে পড়ে ছিলো। সম্ভবত এ কারণেই এরিস্টটল কদাচিৎ পরীক্ষা নিরীক্ষার কথা বলেছেন কারণ পরীক্ষা নিরীক্ষার যন্ত্রপাতিই তো তখন আবিষ্কৃত হয়নি। বড় জোর তিনি অবিরাম এবং সার্বিক পর্যবেক্ষণেরই শুধু ব্যবহার করতে পারতেন।
অ্যারিস্টটল এর গ্রন্থ
তবুও এসব সীমাবদ্ধতা সত্বেও অ্যারিস্টটল অক্লান্ত চেষ্টা, পরিশ্রম এবং নিজস্ব অসাধারণ মেধার সঙ্গে তার অন্যান্য সহযোগীদের সাহায্যে যে সব বিপুল তথ্য রাজির সংগ্রহ রেখে গেছেন মাত্র ৬২ বছরের জীবনকালে, তাতে বিস্ময়ে মানুষকে হতবাক হতে হয়। তিনি বিভিন্ন বিষয়ের উপর লিখে গেছেন অজস্র গ্রন্থ। কেউ বলেন চারশোটি, কেউ বলেন হাজার খানেক। তার রচনার একটা অংশ মাত্র সংরক্ষিত হয়েছে। তবুও তা-ই একটা লাইব্রেরীর সমতুল্য।
অ্যারিস্টটল এর রচনাবলী
প্রথমেই রয়েছে তার লজিক বা যুক্তিবিদ্যা সম্বন্ধীয় রচনাবলী। এরপর রয়েছে তার বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় রচনাবলী। যেমন পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, আবহাওয়াবিদ্যা, বিকাশ ও অবক্ষয়, প্রাকৃতিক ইতিহাস, আত্মা সম্বন্ধে, জীবজন্তুর অঙ্গ, জীবজন্তুর গতিবিধি এবং জীব প্রজনন। তৃতীয়ত আছে তার সৌন্দর্য–তত্ব সম্বন্ধীয় রচনাবলী। যেমন অলঙ্কার আর কাব্যশাস্ত্র। চতুর্থত আছে তার বিভিন্ন দর্শনতত্বমূলক রচনাবলী। যেমন নীতিবিদ্যা, রাজনীতি এবং পরাবিদ্যা।
যদিও অবশ্য দেখা যায় তার কালের অন্যান্য দার্শনিকদের বিবেচনায় আনলে তার রচনাসমগ্রে ভুলভ্রান্তি যথেষ্ট আছে। বৈজ্ঞানিক তথ্যাদিতেও অনেক ভ্রমাত্মক সিদ্ধান্ত তিনি টেনেছেন, কিন্তু তবুও তার রচনাবলীতে জ্ঞান ও মতের যে অভূতপূর্ব সমন্বয় সাধন ঘটেছে, তা আধুনিক কালের বিচারেও অতুলনীয় ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ।
জ্ঞানের ধরণ
অ্যারিস্টটলের জন্য জ্ঞানের আগ্রহের অভ্যাস পুরুষদের মধ্যে স্বাভাবিক এবং এগুলি প্রাণীগুলিতে রাখার একটি বৈশিষ্ট্যের প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি দুটি ধরণের জ্ঞানকে পৃথক করেছিলেন, যাকে তিনি “সংবেদনশীল” এবং “বুদ্ধিজীবী” বলেছিলেন। সংবেদনশীল জ্ঞান বিশেষ দিকগুলির জন্য দায়ী, যেহেতু অ্যারিস্টটল বিবেচনা করেছিলেন যে ইন্দ্রিয়গুলি বোঝার প্রাথমিক বিন্দু। যাইহোক, দার্শনিক নিশ্চিত করেছেন যে, একই সময়ে, একটি বৌদ্ধিক জ্ঞান ছিল যা বিমূর্ততা, সর্বজনীন ধারণা এবং প্রশ্নের মৌলিক মর্মকে ধন্যবাদ জানাতে পারে।
অ্যারিস্টটল এর গুরু প্লেটো
অ্যারিস্টটলের জ্ঞানের রাজ্যে বিশ্ব বিজয়ী। তার এককালীন ছাত্র মহামতি আলেকজান্ডারের চেয়েও বেশি গৌরবের। যদিও এরিস্টটল তার গুরু প্লেটোর তুলনায় বহুমুখি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন বেশি, একই সঙ্গে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক রচনাবলীর এক বিশাল ভান্ডার বিশ্বকে দান করেছেন। তবে অ্যারিস্টটল তার গবেষণাকর্মে তার ছাত্র আলেকজান্ডারের কাছ থেকে আর্থিক সহ বহু দিক দিয়ে অনেক সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছিলেন যা প্লেটো পাননি।
অ্যারিস্টটল এর মৃত্যু
অ্যারিস্টটল খ্রীষ্টপূর্ব ৩২২ সনে ৬২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
ইউডি/অনিক

