ইউক্রেনে রুশ হামলা: এ যুদ্ধের শেষ কোথায়?
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:৩০
দুই প্রতিবেশী রাশিয়া-ইউক্রেন সম্পর্ক ছিলো বন্ধুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা ইস্যুতে তাদের মধ্যে কোনো প্রশ্নের অবকাশই ছিলো না। কিন্তু আচমকাই সম্পর্কে বাঁধল টানাপোড়েন। বিশ্ব দেখল অসম শক্তির দুই প্রতিবেশী লড়াই আর প্রতিরোধ। ঘৃণা আর নিষেধাজ্ঞা বসিয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করল পশ্চিমাদের সিংহভাগ দেশই। কিন্তু এই সংঘাতের শেষ কোথায়। একি কেবল সামরিক যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাকি অন্য কোনো দিকে মোড় নেবে। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান
গোটা পৃথিবী যাকে যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সেই সংঘাতকে সামরিক অভিযান হিসেবেই কোড করে আসছেন ভøাদিমির পুতিন। ইউক্রেনে হামলা চালানোর আগে তার ধারণা ছিলো যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই যাত্রা তা খুব সহজেই আদায় করা সম্ভব হবে। কিন্তু মাঠে নেমে মুদ্রার উল্টোপথটা দেখতে যে একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না পুতিন সেটা বলাই যায়। ইউক্রেনীয়দের বারবার ঘরে ফেরার আহ্বান করলেও পুতিন দেখলেন কীভাবে দেশকে রক্ষা করতে নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে তারা। আর আচমকা এমন প্রতিরোধের মুখে রাশিয়ার হোঁচট নিজেদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবেই চিহ্নিত হচ্ছে। কিন্তু এই সংঘাতের শেষ কী দাঁড়াবে। পশ্চিমাদের তরফ থেকে নতুন কী কী পদক্ষেপ আসবে। রাশিয়া শেষতক কী ঘোষণা করবে এমন প্রশ্ন এখন সবার মনেই নাড়া দিচ্ছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন সশস্ত্র যুদ্ধ থামলেও সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যাবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। চার কোটি ৪০ লাখ মানুষের একটি গণতান্ত্রিক দেশে হামলার মাধ্যমে যখন ইউরোপের শান্তি ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হলো তখন স্পষ্ট করে বলাই যায় এর রেশ সহসাই যাবে না। প্রায় দেড় মাস ধরে বোমাবর্ষণ, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু আর লাখ লাখ মানুষের ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী হওয়ার পর পশ্চিমা গোষ্ঠী তাদের নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্র আরও বহুগুলে বৃদ্ধি করছে। নিন্দার ঝড় উঠেছে জাতিসংঘে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে আগেই। বুশা শহরে চার শতাধিক মৃতদেহ আবিষ্কারের পর এখন গণহত্যার অভিযোগও উঠছে। গোলাগুলি থামলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়া হবে একথা পরিস্কার করে বলা যাবে না।

ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার এমন সংঘাত বিশ্বকে বেশকিছু বিষয়ে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করাচ্ছে। ইতোমধ্যেই ইউরোপের দেশ জার্মানি নিজেদের শান্তিবাদ ছেড়ে প্রতিরক্ষা খাতকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাতে এটা পরিস্কার যে আত্মরক্ষা এখন সবার প্রথম পদক্ষেপ। আর ইউরোপের নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে এ পরিবর্তন কী প্রভাব রাখে, তা দেখা যাবে আগামী দিনগুলোয়। এছাড়াও ইউক্রেনে দেড় মাস রাশিয়ার সামরিক হামলা বিশ্বকে দেখাল প্রবল শক্তিশালী কিংবা ক্ষমতাশালী হলেও জাতীয় ঐক্য যেকোনো আগ্রাসনকে রুখে দিতে পারে। ফলাফল সহজেই অনুমেয় যে কিয়েভ দখলের দাড়প্রান্তে এসেও পুতিন বাহিনীর হোঁচট। পুতিনের লক্ষ্য ছিল বিপুল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যেই কিয়েভ দখল করে অবাধ্য জেলেনস্কি সরকারকে হটিয়ে সেখানে একটি ‘রাশিয়ার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন’ সরকার বসিয়ে দিয়ে অভিযানের সমাপ্তি ঘটানো। তার সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। বিপুল রক্তপাতের পর পুতিন এখন পরিকল্পনা পরিবর্তন করে শুধু পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস এলাকা দখলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর পশ্চিমা দেশগুলো যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে হতবাক হয়ে গেছেন পুতিন। তিনি জানেন, নেটো সদস্যরা কখনোই ইউক্রেনে আসবে না। কিন্তু যে মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তা হয়তো তিনি ভাবেননি। এসব নিষেধাজ্ঞা এর মধ্যেই রাশিয়ার অর্থনীতিতে নাটকীয় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং অনেকগুলো ব্যাংককে আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বছরের মধ্যেই রাশিয়া থেকে গ্যাসের আমদানি দুই তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনতে লক্ষ্য ঠিক করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ব্রিটেন ২০২২ সাল শেষ হওয়ার আগেই রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরশীলতা বন্ধ করতে চায়। রাশিয়ার নর্ড স্ট্রিম-২ গ্যাস পাইপলাইনের অনুমোদন স্থগিত করেছে জার্মানি। রাশিয়ার বিমানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, আমেরিকা এবং কানাডা। ইউক্রেনের সঙ্গে কোন শান্তি চুক্তিই এসব নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটাতে পারবে না।
বিশ্লেষকরা এই আগ্রাসনকে ব্যাখ্যা করছেন ভিন্নভাবে। তারা বলছেন এটা অনেকটাই নিজেদের প্রভাব পরিস্কারের বাহক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু আমেরিকা এখন কিংকতর্ব্যবিমূড়। তারা বুঝতে পারছে না কীভাবে এই সংঘাতের ইতি উইক্রেনকে দিয়ে টানবে। আর যুদ্ধ শুরু করে রাশিয়াও এখন বুঝতে পারছে না শেষটা কোথায় করতে হবে। রাশিয়ার প্রাথমিক উদ্দেশ্য যদি সফল হতো, যুদ্ধটা তাহলে থেমে যেত তখনই। এখন যুদ্ধ শেষ করতে হলে পুতিনকে অবশ্যই কিছু দৃশ্যমান অর্জন নিয়ে বেরিয়ে আসতে হবে মুখ রক্ষার জন্য।
ইউডি/সুপ্ত

