বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: প্রথম আধুনিক বাংলা ঔপন্যাসিক
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৪:০৫
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন উনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙালি ঔপন্যাসিক। বাংলা গদ্য ও উপন্যাসের বিকাশে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অসীম অবদানের জন্যে তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাধারণত প্রথম আধুনিক বাংলা ঔপন্যাসিক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি একাধারে একজন বিখ্যাত বাঙালি কবি, লেখক এবং সাংবাদিক ছিলেন। উপমহাদেশের মহান লেখকদের মধ্যে অন্যতম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
জন্ম, শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা
বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৬ শে জুন বাংলা ১২৪৫, ১৩ই আষাঢ নৈহাটির কাঠাল পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পিতার নাম যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও মায়ের নাম দূর্গাদেবী।
কুল পুরোহিত বিশ্বম্ভর ভট্টাচার্য পাঁচ বছর বয়সে বঙ্কিমের হাতেখড়ি দেন। ভর্তি হলেন গ্রামের পাঠশালায়। কোন অক্ষরই বঙ্কিমকে দ্বিতীয়বার দেখাতে হত না। গুরুমশাই অত্যন্ত অবাক হয়ে বলেছিলেন, “এত তাড়াতাড়ি করে যদি সব লিখে ফেল তবে তোমাকে আর কতদিন পড়াতে পারব?”
সাত – আট বছর বয়সেই বঙ্কিমচন্দ্র এর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। তার বাবা তখন মেদিনীপুরের ডেপুটি সন ছিলেন। ১৯৪৪ সালে ছয় বৎসর বয়সে সেখানে দাদা সঞ্জীবচন্দ্রের সঙ্গে তাকেও উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। এখানে বঙ্কিমচন্দ্র অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। বঙ্কিমচন্দ্র কোন বছর অকৃতকার্য হতেন না। কয়েকবার বছরে দু’বার প্রমোশনও পেয়েছিলেন।
বাবার বদলির জন্যও ১৮৪৯ সালে বঙ্কিমচন্দ্রকে মেদিনীপুর ত্যাগ করে আবার কাঠালপাড়ায় চলে আসতে হল। এখানে পন্ডিত শ্রীরাম ন্যায়বাগীশের কাছে সংস্কৃত ও বাংলা ভাষা শেখেন। মহাভারতের কথা বিশ্লেষণ করে বোঝাতেন পন্ডিত হলধর তর্ক চূড়ামণি। সে সময়ই বঙ্কিমের মনে সাহিত্যের বীজ দানা বাঁধতে লাগল। তিনি ১৮৪৯ খ্রীষ্টাব্দের ২৮শে অক্টোবর চুঁচুড়ায় হাজি মহম্মদ মহসীন কলেজে বিদ্যালয় বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে তিনি জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং আট টাকা বৃত্তি লাভ করেন।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র একজন খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে পরিচিত। বঙ্কিমচন্দ্র অনেক কবিতা এবং অসংখ্য চিন্তাশীল প্রবন্ধ ও প্রস্তাব রচনা করেন। চমকপ্রদ ছিল তার সাহিত্য জীবন। তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক। তার লেখা আনন্দমঠ উপন্যাস দেশবাসীকে গভীরভাবে স্বদেশিকতায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।
বিবাহ ও প্রথম কবিতা
যাদবচন্দ্র ১৮৪৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নারায়নপুর গ্রাম নিবাসী পাঁচ বছরের মোহিনীদেবীর সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের বিয়ে দেন। ১৮৫৬ খ্রীষ্টাব্দে তিনি সিনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা দেন। তাতেও প্রথম স্থান অধিকার করে কুড়ি টাকা বৃত্তি লাভ করেন। বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বঙ্কিমচন্দ্রের বাইরের বই পড়ার দিকে ভালোই ঝোঁক ছিল। কখনও শ্রেণীতে না গিয়ে গ্রন্থাগারে বসে নানা ধরনের বই পড়তেন। এভাবে তিনি অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন।
কলেজে পড়ার সময় সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্য ও পদ্য লেখা বের হত। ১৮৫৩ খ্রীষ্টাব্দে তিনি সংবাদ প্রভাকর-এ কবিতা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। তার কবিতা (কামিনীর প্রতি উক্তি) সর্বশ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণিত হল ও তিনি কুড়ি টাকা বৃত্তি পান। ১৮৫৩ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র সংস্কৃত সাহিত্যে গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করেন। এ সময়েই রচনা করেন ললিতা ও মানস। এরপর ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এ সময়েই কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়।
প্রথম বাঙালি হিসেবে গ্রাজুয়েট
বি.এ. পরীক্ষার ফল যখন বের হল তখন চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেল। বঙ্কিমচন্দ্র এই পরীক্ষার সর্বপ্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র ও যদুনাথ বসু প্রথম বাঙালি হিসেবে গ্রাজুয়েট হলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের এই অসাধারণ কৃতিত্বে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ছোট লাটসাহেব, অনেক ইংরেজ সাহেব ও দেশের মনীষীগন আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের এই কৃতিত্বের জন্য বঙ্গ সরকারের সচিব ইয়ং সাহেব বঙ্কিমচন্দ্রকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরী গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। পিতার সম্মতি নিয়ে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই চাকরী নিয়ে চলে যান কর্মস্থল যশোরে। এই সময়েই তার সঙ্গে দীনবন্ধু মিত্রের পরিচয় হয়। এই সময়ই ‘রাজমোহন’স ওয়াফ’ নামে একটি ইংরেজী উপন্যাস রচনার কাজেও হাত দেন তিনি।
কর্মজীবন ও সাহিত্য চর্চা
১৮৬৪ খ্রীষ্টাব্দে খুলনা ত্যাগ করে তিনি বারুইপুর চলে আসেন। তার লেখা ‘রাজমোহন’স ওয়াফ’ ধারাবাহিকভাবে সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে। তার ‘কপালকুন্ডলা’ উপন্যাসটি ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয়।
১৮৬৮ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র আইন পরীক্ষা দেবার জন্য প্রস্তুতি নেন। ১৮৬৯ খ্রীষ্টাব্দে চাকুরিরত অবস্থায় প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে আইন পরীক্ষা দেন ও তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। এ বছরেই তার ‘মৃণালিনী’ প্রকাশিত হয় ও ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। তার শারীরিক অবস্থা বিশেষ ভাল না থাকায় কাশী, প্রয়াগ, দিল্লী ভ্রমণ করেন। এই উপন্যাসেই স্বদেশপ্রেমিক বঙ্কিমচন্দ্রের আবির্ভাব লক্ষ্য করা যায়।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর উপন্যাসসমূহ
বঙ্কিমচন্দ্র মোট চোদ্দটি উপন্যাস রচনা করেন। উপন্যাসগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুন্ডলা, মৃণালিনী, বিষবৃক্ষ, ইন্দিরা, যুগলাঙ্গুরীয়, চন্দ্রশেখর, রাধারাণী, রজনী, কৃষ্ণকান্তের উইল, রাজসিংহ, আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরানী ও সীতারাম। এছাড়া তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল কৃষ্ণচরিত, লোকরহস্য, বিজ্ঞানরহস্য, ললিতা, দীনবন্ধু মিত্রের জীবনী, ধর্মতত্ত্ব, শ্রীমদ্ভাগবতগীতা প্রভৃতি।
চাকরি থেকে অবসর ও অর্জন
১৮৮৫ বঙ্কিমচন্দ্র কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট সদস্য নির্বাচিত হন। সুদীর্ঘ তেইশ বছর বিভিন্ন সরকারী পদে অধিষ্ঠিত থেকে ১৮৯১ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে চাকরী থেকে অবসরগ্রহণ করেন। এ বছরেই পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মৃত্যু হয়। বঙ্কিমচন্দ্র ‘সোসাইটি ফর হায়ার ট্রেনিং’ প্রতিষ্ঠা করেন ও তার সাহিত্য শাখার স্থায়ী সভাপতি হন। ১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র ‘রায় বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন। বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৯৪ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে সি.আই’ই উপাধি অর্জন করেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর মৃত্যু
১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই এপ্রিল বঙ্কিমচন্দ্র স্বল্পকাল রোগে ভোগের পর কলকাতার পটলডাঙ্গায় অমৃতলোকে যাত্রা করেন।
ইউডি/অনিক

