কৃষি খাতে দেশের অর্জন বিশ্বের দরবারে সমাদৃত
ড. জাহাঙ্গীর আলম । রবিবার, ১০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৪:১৫
দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরের পথপরিক্রমায় অনেক গৌরবময় অর্জনের সাফল্যগাথা রচনা করেছে বাংলাদেশ। এক সময় এ দেশের পরিচয় ছিল অতি দরিদ্র একটি দেশ হিসাবে। সেই বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভের পথে। করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে অনেকটা স্থবির ছিল, বাংলাদেশ সেখানে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষুধা সূচকে অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। হ্রাস পেয়েছে পুষ্টিহীনতা। লাগাতার বৃদ্ধি পাচ্ছে দেশের খাদ্য ও কৃষি উৎপাদন।
স্বাধীনতা লাভের পর দেশের বিভিন্ন খাতে যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হলো কৃষি খাত। অতীতে বাংলাদেশ ছিল একটি খাদ্য ঘাটতির দেশ। এ অঞ্চলে প্রতিবছর গড়ে খাদ্য আমদানি করা হতো ১৫ থেকে ২০ লাখ টন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এদেশে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয় কৃষির উৎপাদন। ফলে ১৯৭১-৭২ সালে দেশে খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ লাখ টনে। এটি ছিল মোট উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ।
বর্তমানে সে ঘাটতির হার নেমে এসেছে ১৫ শতাংশেরও নিচে। স্বাধীনতার পর দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ টনে।
কৃষি খাতে উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। বর্তমানে চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নে বাংলাদেশের স্থান সবার উপরে। তাছাড়া পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। চাষকৃত মৎস্য উৎপাদনে দ্বিতীয়, গম উৎপাদনে সপ্তম ও আলু উৎপাদনে অষ্টম বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চারগুণ, গম দুইগুণ, ভুট্টা ১০ গুণ ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচগুণ। আলু, মৎস্য, মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত। বাংলাদেশে সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে ফলের উৎপাদনে।
বর্তমানে দেশে ফলের উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন। ফল উৎপাদনে পৃথিবীর প্রথম সারির ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান। গত ২ দশক ধরে এ দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল বছরে গড়ে ১১ শতাংশের উপরে। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় ফলের মাথাপিছু প্রাপ্যতা সম্প্রতি অনেক বেড়েছে। ২০০৬ সালে আমাদের মাথাপিছু দৈনিক ফল গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৫৫ গ্রাম, ২০১৮ সালে তা বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৫ গ্রামে। তাতে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে আমাদের পুষ্টিহীনতা।
এছাড়াও বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক ধানিজমি পরিণত হয়েছে আম বাগানে। অধিকন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ করা হচ্ছে নতুন ফল স্ট্রবেরি। আরও চাষ করা হচ্ছে রাম্বুতান, ড্রাগন ফল ও অ্যাভোকাডো। মানুষ আপেলের পরিবর্তে বেশি খাচ্ছে কাজী পেয়ারা। তাতে বিদেশি ফলের আমদানি হ্রাস পাচ্ছে। সাশ্রয় হচ্ছে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা। দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট। দীর্ঘমেয়াদের আবাদি এলাকা কমেছে। তবে একরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে। ২০১০ সালে পাটের জিন রহস্য উন্মোচনের ফলে এর উৎপাদন বৃদ্ধির পথ আরও সুগম হয়েছে।
বর্তমানে দেশে পাটের উৎপাদন প্রতিবছর ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল। আগামীতে এর উৎপাদন আরও বাড়বে। অদূর ভবিষ্যতে আবার ঘুরে দাঁড়াবে আমাদের পাট খাত। শুধু শস্য খাতই নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে কৃষির সব উপখাতেই বিপুল উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভর বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালে এ দেশে মাছের মোট উৎপাদন ছিল ২৫ লাখ টন। ২০১৯-২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ টনে।
কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার অনেক সম্প্রসারিত হয়েছে। ভূমি কর্ষণ, ফসল কর্তন ও মাড়াই, ধান ভানা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই এখন কায়িক শ্রমের ব্যবহার সীমিত হয়ে আসছে। বাড়ছে যন্ত্রের ব্যবহার। স্বাধীনতার পর ভূমি কর্ষণের ৯০ শতাংশই সম্পন্ন করা হতো কাঠের লাঙল দিয়ে। ব্যবহার করা হতো পশুশক্তি। এখন পশুশক্তির ব্যবহার হ্রাস পেয়ে নেমে এসেছে ৫ শতাংশে।
বাকি ৯৫ শতাংশই আবাদ হচ্ছে যন্ত্রপাতির মাধ্যমে। ধান কাটা ও মাড়াই ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার এখন বেশ প্রচলিত। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে চলছে শ্রমিক সংকট। তাতে দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে শ্রমিকের মজুরি। তদুপরি ফসল উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে সময়ক্ষেপণ, অপচয় ও অদক্ষতার কারণে কৃষির উৎপাদনে লাভজনকতা হ্রাস পাচ্ছে।
একসময় নতুন কৃষিপ্রযুক্তি প্রসারের একমাত্র বাহন ছিল কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী। এখন তাতে যোগ হয়েছে ই-কৃষি। কৃষি সমস্যা সমাধানের জন্য মোবাইল অ্যাপস ব্যবহার করে বাড়ি থেকে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন গ্রামের কৃষক। তাদের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে স্থাপিত হয়েছে ‘কল সেন্টার’। সেখান থেকে টেলিফোনে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের।
২০৪১ সালের মধ্যে ১ হাজার গ্রামকে স্মার্ট-ফার্মিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। নতুন প্রযুক্তি ধারণ ও বিস্তারে ছোট কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণে তাদের অভিগম্যতা। এটা নিশ্চিত করার জন্য ছোট কৃষকদের অনুকূলে নগদ সহায়তা প্রদান ও বরাদ্দ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতিবাচক নীতিমালা গ্রহণ করা দরকার।
ইউডি/অনিক

