জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও ধর্মান্ধদের দাপট: কাঠগড়ায় গোটা জাতি

জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও ধর্মান্ধদের দাপট: কাঠগড়ায় গোটা জাতি

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১১ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:৩০

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মুন্সীগঞ্জের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সরব দেশের শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী মহল। ১৯ দিন কারাগারে থাকার পর রবিবার জামিনে বের হয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন সেই শিক্ষক। বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে সম্প্রীতি নষ্টের পায়তারা ও ভিন্ন কোনো ষড়যন্ত্র হিসেবেই মনে করছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও ধর্মান্ধদের দাপটে গোটা জাতি আজ যেন কাঠগড়ায়। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী

বিজ্ঞানের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রশ্ন আসে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল কী সত্যিই ধর্ম অবমাননা করেছেন নাকি তিনি কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার। কেননা ১৯ দিন পর জেল থেকে বেরিয়ে তিনি বেশকিছু বিষয় গণমাধ্যমে জানিয়েছেন। তার মধ্যেই অন্যতম ছিলো টিউশন নিয়ে রেষারেশি, এছাড়াও বিদ্যালয়ের অর্ন্তকোন্দলসহ সামগ্রিক বিভিন্ন ইস্যু। বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্ম একান্ত যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে, কেউ যদি অন্যায়ভাবে কারো ধর্মে আঘাত করে তবে তাকে অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। তা অবশ্যই সঠিক তদন্তের মাধ্যমেই গ্রহণযোগ্য হবে। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ যারা ধর্মান্ধ, তারা জাতির সম্প্রীতির বন্ধন ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় গোটা জাতিকে।

‘আমরা তো বিজ্ঞানবিবর্জিত হতে পারি না’: শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এই প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের এগিয়ে যাওয়ার স্বার্থে একজন শিক্ষককে হয়রানির মধ্যে পড়া উচিত নয়। একজন শিক্ষকের সঙ্গে কেন এমন ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখা দরকার। ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত বিশ্বাস। আর বিজ্ঞান শিক্ষাকে বাদ দিয়ে দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। দীপু মনি বলেন, আমি মনে করি, পুরো বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। বিজ্ঞানের একজন শিক্ষক বিজ্ঞান পড়াবেন। আমরা তো বিজ্ঞানবিবর্জিত হতে পারি না । ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত বিষয় উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সবার জীবনে ধর্ম একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ধর্মশিক্ষার যদি ক্লাস হয় সেখানে শিক্ষক ধর্ম শেখাবেন। শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, একজন শিক্ষককে তার বিষয়ে পড়ানোর জন্য নিশ্চয়ই হয়রানির মধ্যে পড়া উচিত নয়।

ডা. দীপু মনি

সম্প্রীতি নষ্টে কাউকে উসকে দেওয়া মারাত্মক অপরাধ: শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সবাইকে বলবো আমাদের বোধহয় ধৈর্য ধরার প্রয়োজন রয়েছে। যেকোনো ছুতোয় আমাদের শান্তি-শৃঙ্খলা, সম্প্রীতির মতো বিষয়গুলো নষ্ট হওয়ার মতো কোনও কিছু করা বা উসকে দেওয়া একেবারেই ঠিক নয়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে: হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল ইস্যুতে শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, আমরা সবসময় শুনে আসছি, আমাদের দেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়ে এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এর প্রথম ধাপ হল স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে বিজ্ঞান শেখানো। এই দায়িত্বই পালন করতে গিয়েছিলেন হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল।এটি কীভাবে সম্ভব; একজন শিক্ষক তার দায়িত্ব পালন করে জেলে যেতে হবে। তিনি বলেন, দুঃখের বিষয় এই যে, যেই বিজ্ঞান পড়ানোর জন্যে তিনি নিগৃহীত হচ্ছেন, সেই বিজ্ঞানের বইগুলো আমরা বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষক-গবেষকরাই লিখেছিলাম এবং সম্পাদনা করেছিলাম। সেই বই পড়াতে গিয়ে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে আজকে কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। যে কথাগুলো উচ্চারণ করার জন্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, হুবহু সেই কথাগুলো পৃথিবীর সব বিজ্ঞানমনস্ক মানুষেরা বলে থাকেন। তিনি আরও বলেন, আমরা জ্ঞানভিত্তিক একটি সমাজ গড়ে তুলতে চাই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। এজন্য হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের মতো যে শিক্ষকরা ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন, আমি তাদের অভিনন্দন জানাতে চাই।

ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল

তবে কী আলোচনা করা মানেই ‘অবমাননা’: শিক্ষাবিদ ড. সলিমুল্লাহ খান এই বিষয়টি নিয়ে বলেন, এর মধ্যে ধর্ম অবমাননার কোনো ব্যাপার ছিল না৷ সলিমুল্লাহ খান বলেন, তিনি যা বলেছেন সেটার মধ্যে ধর্ম নিয়ে আলোচনা আছে, অবমাননা নেই৷ সব আলোচনাই যদি অবমাননা হয়, তাহলে তো আলোচনাই করা যাবে না৷” ধর্ম নিয়ে যুক্তিশীল আলোচনা ধর্মের অবমাননা হবে কিনা, সেটাও ভেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি৷ এক্ষেত্রে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের উদাহরণ তুলে ধরেন৷ ‘সক্রেটিসের বিরুদ্ধেও একসময় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল৷ কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণ হয়েছে, উনি ধর্মের কোনো অবমাননা করেননি৷ উনি মানুষের সত্য অনুসন্ধানের পথ হিসাবে যুক্তিশীলতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন৷

ড. সলিমুল্লাহ খান

১৯ দিন পর জামিনে মুক্তি শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের: শ্রেণিকক্ষের আলোচনার সূত্র ধরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার মুন্সীগঞ্জের স্কুল শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল অবশেষে ১৯ দিন কারাবাস শেষে
জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। মুন্সীগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক অতিরিক্ত জেলা জজ মোতাহারাত আক্তার ভূইয়া রবিবার (১০ এপ্রিল) জামিন মঞ্জুরের পর বিকাল ৫টার পরে তিনি জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। এ সময় সেখানে হৃদয় মণ্ডলের স্ত্রী ববিতা হাওলাদার, তাদের দুই সন্তান, আইনজীবীসহ গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কারাগার থেকে বেরিয়ে আপ্লুত হৃদয় মণ্ডল সাংবাদিকদের বলেন, তার বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে সেটা মিথ্যা। গত ২০ মার্চ দশম শ্রেণির একটি অনির্ধারিত ক্লাসে গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করছিলেন হৃদয় মণ্ডল। সেখানে একজন ছাত্র বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের তুলনা করে কিছু প্রশ্ন করে। হৃদয় মণ্ডল সেগুলোর জবাব দেন। ক্লাসের এক ছাত্র ওই আলোচনা মোবাইলে রেকর্ড করে এবং তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। দুদিন পর কিছু ছাত্র ও স্থানীয় লোকজন মিলে হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে থানায় নিয়ে যায়। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে। ওই রাতেই স্কুলের অফিস সহকারী আসাদ বাদী হয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা করলে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে, যা নানামুখী আলোচনার জন্ম দেয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, হৃদয় মণ্ডলকে ‘ফাঁসানোর জন্য শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করেছে’ একটি মহল শিক্ষাবিদ, অধিকারকর্মী, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এর প্রতিবাদে সরব হয়।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১১ এপ্রিল ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

আপ্লুত হৃদয় মণ্ডল বললেন সকল অভিযোগ মিথ্যা: দ্বন্দ্বের জেরে কেউ হয়তো ‘বিপথগামী’ শিক্ষার্থীদের উসকানি দিয়েছে এবং মামলা করিয়েছে বলে মনে করছেন হৃদয় মণ্ডল। এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে সেটি মিথ্যা। এতে স্কুলের নানা বিষয় জড়িত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, স্কুলে রেষারেষি আছে। আমি আসলে বলতে পারছি না। তবে প্রাইভেট পড়ানো নিয়েও এই ঘটনা ঘটতে পারে। জেলে নেওয়ার কী কারণ থাকতে পারে জানতে চাইলে হৃদয় মণ্ডল বলেন, হয়তো আমার নিরাপত্তার কথা ভেবেই আমাকে কারাগারে রেখেছে। এ সময় রাষ্ট্রের কাছে পরিবারের নিরাপত্তা চান এই শিক্ষক। এর আগে তার স্ত্রী ববিতা হাওলাদারও নিরাপত্তা চেয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এমন ষড়যন্ত্রের কী কারণ থাকতে পারে- প্রশ্নের জবাবে বিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, যারা লেখাপড়া করে না, কিছু বিপথগামী পোলাপান আছে, যারা হয়তো বিপথগামী স্যারদের সঙ্গে মিলে এটা করেছে। আমি এই মুহূর্তে কারও নাম বলতে পারছি না। এখানে টিউশনির ব্যাপার আছে। আশপাশের অনেকেই আছে।

‘এমন কোনো কথা বলিনি যা সমস্যা হতে পারে’: ঘটনার দিনের কথা বর্ণনা করে তিনি আরও বলেন, ওই দিন আমি ক্লাসে বিজ্ঞান পড়াচ্ছিলাম। ওরা আমাকে ধর্মীয় বিষয়ে প্রশ্ন করছিল, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। আমি এমন কোনো কথা বলিনি যেটা সমস্যা হতে পারে। আমি বুঝতে পারিনি ওরা মোবাইলে রের্কড করছিল। ছাত্রদের গণিত ও বিজ্ঞান দুটো বিষয়ই পড়াতেন হৃদয় মণ্ডল। তার ওপর প্রথম হামলা হয় বছর দুয়েক আগে, টিউশনি থেকে বাসায় ফেরার পথে। সর্বশেষ মাস দেড়েক আগেও হামলাকারীরা হৃদয়ের গায়ে ইটের টুকরো ছুড়ে মারে, ঘরে দরজায় লাথিও মারে বলে অভিযোগ করেন তার স্ত্রী ববিতা হাওলাদার।তাছাড়া, প্রায়ই দরজায় লাথি মেরে মণ্ডল বলে তিরস্কার করত কে বা কারা, এখন তা আরও বেড়ে গেছে।
হৃদয় মণ্ডল বলেন, এর আগেও আমাকে ঢিলা মেরেছিল। মনে হয় ছাত্ররাই। আমি দেখতে পাইনি।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading