বর্জ্য কমাতে প্রয়োজন জনসচেতনতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা

বর্জ্য কমাতে প্রয়োজন জনসচেতনতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা

উম্মে সারা সুলতানা । সোমবার, ১১ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:৩৫

জনসংখ্যায় বিশ্বে অষ্টম বৃহত্তম দেশ বাংলাদেশ, যদিও আয়তনে ৯২ তম। ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। মাত্র ৫৬ হাজার বর্গ মাইলেরও কম এই ক্ষুদ্রাতায়নের দেশটির জনসংখ্যা ১৬ কোটিরও বেশি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭%। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে সমানতালে বৃদ্ধি পাচ্ছে মানবসৃষ্ট বর্জ্যও। প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার বা ভোগ করার পর অব্যবহারযোগ্য যে আবর্জনা তৈরি হয় সেগুলিকে বর্জ্য পদার্থ বলে।

জীববৈচিত্র্য রক্ষা, সমস্ত জীবকূলকে রোগের হাত থেকে রক্ষা, পরিবেশ দূষণ ও অবনমন রোধের লক্ষ্যে আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলা হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনটি নীতি: বর্জ্য কমানো ও প্রতিরোধ, বর্জ্যরে পুনর্ব্যবহার এবং রিসাইকল বা বর্জ্যরে পুনশ্চক্রীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরমধ্যে বর্জ্য কমানো বা প্রতিরোধ প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বর্জ্য কমানো বা প্রতিরোধ বলতে মূলত বর্জ্যরে উৎপাদন কম করাকে বোঝায়।

ক্রমবর্ধমান বর্জ্য নিয়ে নাকাল পুরোবিশ্ব। স্থলভাগের পাশাপাশি সাগর, মহাসাগর, নদী ও অন্যান্য জলাশয় বিপুল পরিমাণ বর্জ্য বহন করে চলছে, যা প্রাণীকূলের বেঁচে থাকার জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রতিদিন ঢাকার দুই সিটিতে প্রায় ৬ হাজার ২৫০ টন বর্জ্য তৈরি হয়। এনভায়রনমেন্ট এন্ড সোসাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডোর) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার একমাস পর উৎপাদিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় প্রায় তিন হাজার ৭৬ টন, যেখানে সার্জিক্যাল মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস এবং স্যানিটাইজারের বোতল এই বর্জ্যরে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। এভাবে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অসংখ্য মানুষের আবাসস্থল থেকে প্রচুর পরিমাণ বর্জ্য পদার্থ যেখানে সেখানে ফেলা হচ্ছে, বর্জ্যরে স্তূপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং তা পঁচে গলে বাতাসকে মারাত্মক ভাবে দূষিত করছে, ড্রেনে জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে এবং তা বর্ষা মৌসুমে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।

রান্না ঘরের সৃষ্ট আবর্জনা, হাটবাজারের পচনশীল শাকসবজি, হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্য, কলকারখানার বর্জ্য, কসাইখানার বর্জ্য, প্রাণীজ বর্জ্য ইত্যাদি পরিবেশ দূষণ করছে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে বায়ুদূষণ করছে, পানিতে মিশে পানি দূষণ করছে, মাটিতে মিশে মাটি দূষণ করছে এবং মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী ভুগছে নানা রোগ ও জটিলতায়। বায়ুদূষণের ফলে শ্বাসতন্ত্রের নানাবিধ রোগ, যেমন, হাচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে হার্ট অ্যাটাক ও ক্যান্সারের মতো নানা রোগ সৃষ্টি করছে। প্রতিবছর পানিদূষণের ফলে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ দূষিত পানির সংস্পর্শে এসে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে (কলেরা, ডায়রিয়া) আক্রান্ত হচ্ছে। তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য তেজষ্ক্রিয়তা ছড়ানোর মাধ্যমে রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে।

ট্যানারিসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য, এসিড, বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য, খালবিল ও নদীর পানির সাথে মিশে ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে করে নদী খালবিলের জৈববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে, মাটি দূষিত হচ্ছে। ঢাকার হাজারীবাগ, তেজগাঁও ও ঢাকার নারায়ণগঞ্জে নদী রক্ষা বাঁধ ঘিরে গড়ে উঠেছে ছোট বড় প্রায় সাত হাজার কারখানা। এসব শিল্পকারখানার বর্জ্য সরাসরি পড়ছে বুড়িগঙ্গা নদীতে। ভয়াবহ দূষণে ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা এখন মৃত। একই অবস্থা এর চারপাশের তুরাগ ও বালু নদীর।

বাষট্টি রকমের রাসায়নিক বর্জ্য ও অন্যান্য বর্জ্যে দূষণে বুড়িগঙ্গার পানি এতটাই বিষাক্ত হয়েছে যে, পোকামাকড়সহ কোনো প্রাণীই বেঁচে থাকতে পারে না। বুড়িগঙ্গার বিষে আক্রান্ত হচ্ছে বৃহৎ নদী পদ্মা, মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, গোমতি, ধলেশ্বরী আর শীতলক্ষ্যা। বর্ষাকালে এই দূষিত পানি বিভিন্ন নদী হয়ে গিয়ে পড়ছে বঙ্গোপসাগরে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভয়াবহ এ দূষণ রোধ না করতে পারলে আগামী এক দশকের মধ্যে এসব নদীর পানিও বিষাক্ত হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যাবে। তাই এখনই সচেতন হতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading