রাজা রামমোহন রায়: উপমহাদেশে কুসংস্কার মুক্ত নবযুগের প্রবর্তক
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১২ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:৫০
রাজা রামমোহন রায় উপমহাদেশের নব যুগের প্রবর্তক। উপমহাদেশ এবং স্বজাতির কল্যাণে তার অবদান অবিস্মরণীয়। রাজা রামমোহন রায়ের জীবনাদর্শ একদা উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতিকে অপরিসীম অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলো। রাজা রামমোহন রায়কে মহান পুরুষ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিভা, পান্ডিত্য, মনীষা ও কর্মকুশলতার প্রতীক রামমোহন রায় ছিলেন নবীন ইন্ডিয়ার নব জাগরণের পথিকৃৎ। ইন্ডিয়ার নব যুগের প্রবর্তক রাজা রামমোহন রায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
রাজা রামমোহন রায় কে ছিলেন?
রাজা রামমোহন রায় ছিলেন প্রথম ইন্ডিয়ান ধর্মীয়-সামাজিক পুনর্গঠন আন্দোলন ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালি দার্শনিক। তৎকালীন রাজনীতি, জনপ্রশাসন, ধর্মীয় এবং শিক্ষাক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পেরেছিলেন। রামমোহন রায় সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছেন, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করার জন্য। তখন হিন্দু বিধবা নারীদের স্বামীর চিতায় সহমরণে যেতে বা আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করা হত।
তিনি ছিলেন প্রথম ইন্ডিয়ান ধর্মীয়-সামাজিক পুনর্গঠন আন্দোলন ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালি দার্শনিক। সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি রামমোহন রায় সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত হয়েছেন, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত করার জন্য। মোঘল বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর শাহ তাকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেন।
লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই
রাজা রামমোহন রায় ১৭৭৪ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই মে ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জমিদার রামকান্ত রায়। মাতার নাম তারিণী দেবী। ছোটবেলা থেকেই তার লেখাপড়ার প্রতি ছিলো প্রবল আগ্রহ। তিনি আট বছর বয়সে গ্রামের স্কুলে বাংলা এবং আরবী ভাষা শিক্ষা করেন। তারপর পাটনায় গিয়ে আরবী ও ফারসি দুটো ভাষাতেই বুৎপত্তি অর্জন করেন। বারো বছর বয়সে তিনি সংস্কৃত ভাষা শেখার জন্য কাশীধামে যান এবং চার বছর সেখানে পড়াশুনা করেন। এছাড়া তিনি বেদান্ত শাস্ত্রের উপরেও গবেষণা করেন।
উপাসনা পদ্ধতির বিরোধী
রামমোহন হিন্দুধর্মের উপাসনা পদ্ধতির বিরোধী ছিলেন। তিনি হিন্দুদের পৌত্তলিক ধর্মপ্রণালী নামে একটি বইও রচনা করেন। এই বই পড়ে এবং নানা কারণে রামমোহনের পিতা পুত্রের উপর ক্ষুব্ধ হন এবং বাড়ি থেকে বের করে দেন। রামমোহন তিব্বতে চলে যান ঘুরতে ঘুরতে। তিব্বতে কয়েক বছর থেকে আবার ইন্ডিয়াতে ফিরে আসেন। শিক্ষা করেন ইংরেজী ভাষা। এভাবে মাত্র তেইশ বছর বয়সের মধ্যে তিনি দশটি ভাষা শিখে ফেলেন। রামমোহন রায় বাংলা, ইংরেজী, আরবী ছাড়াও গ্রীক, হিব্রু, ল্যাটিন, ফারসী এবং উর্দু ভাষাতে লিখতে পড়তে পারতেন।
রামমোহন রায়ের কর্মজীবন
শিক্ষাজীবন শেষ করে রামমোহন রংপুরের ডেপুটি কালেক্টর ডিগবি সাহেবের আমন্ত্রণে রাজস্ব বিভাগে এক উচ্চপদে চাকরি গ্রহণ করেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি দেওয়ানি পদে পদোন্নতি লাভ করেন। কিন্তু রামমোহন রায় চাকরি বেশিদিন করেননি। তিনি সাহিত্য সাধনাও সমাজ সংস্কার কাজের জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়ে মুর্শিদাবাদে চলে আসেন। পরে কলকাতার মানিকতলায় বাড়ি কিনে সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। এই মানিকতলার বাড়িতেই তিনি আত্মীয় সভা নামে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। কিছুকালের মধ্যে তিনি বাংলায় ব্রাহ্মণ পত্রিকা এবং ইংরেজীতে ইষ্ট ইন্ডিয়া গেজেট নামে দুটো পত্রিকা বের করেন।
ব্রহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা
১৮২৭ সালে তিনি ধর্ম সমালোচনামূলক প্রতিষ্ঠান ব্রহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রহ্মসভার মাধ্যমেই রামমোহন তার নতুন ধর্ম মতবাদ প্রচার করেন। তিনি বেদে বর্ণিত অদ্বিতীয় ব্রহ্মের উল্লেখ করে প্রচার করেন যে, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। তিনিই বেদের ব্রহ্ম। তিনি অদ্বিতীয় এবং নিরাকার। এই ব্রহ্মের যারা উপাসক তারা হলেন ব্রাহ্ম। রামমোহন প্রবর্তিত এই মতবাদ সেকালে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। আজও ব্রাহ্মধর্ম মতবাদের প্রচুর অনুসারী আছে বাংলাদেশে ও ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গে।
সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান
রামমোহন হিন্দু ধর্মের সতীদাহ প্রথায় খুব মর্মাহত হন। সেকালে হিন্দুধর্মের কোন স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকেও স্বামীর সাথে জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দিতে হতো। একে বলা হতো সহমরণ প্রথা। স্বামীর চিতায় আত্মহুতি দিয়ে সতী হওয়ার হিন্দুধর্মের এই অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রামমোহন প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলেন। পরে ১৮২৯ খ্রীষ্টাব্দে তৎকালীন বৃটিশ ইন্ডিয়ার বড়লাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক-এর সহায়তায় সতীদাহ প্রথা বন্ধ আইন পাস করাতে সক্ষম হন। এভাবেই হিন্দু সমাজে ধর্মের নামে যুগ–যুগ ধরে প্রচলিত সতীদাহ প্রথার বিলুপ্তি ঘটে। শুধু সতীদাহ প্রথা নয়, তার অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে বাল্যবিবাহ, কন্যাপণ এবং গঙ্গায় সন্তান নিক্ষেপের (বিসর্জনের) মতো আরও কিছু সামাজিক কুপ্রথাও বন্ধ হয়।
রাজা উপাধি প্রাপ্তি
রামমোহনের জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো বৃটিশ কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত মোঘল বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর শাহ-এর বৃত্তি বৃদ্ধির জন্য বিলেত গমন। তিনি বাদশাহ দ্বিতীয় আকবরের প্রতিনিধি রূপে বিলেত গমন করে পার্লামেন্টে বাদশাহর পক্ষে বক্তৃতা দিয়ে বাদশাহর বৃত্তির অংক বৃদ্ধি করাতে সক্ষম হন। বিলেতে যাবার আগে বাদশা রামমোহনকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেন।
রামমোহন রায়ের মৃত্যু
১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দের ২৭শে সেপ্টেম্বর রাজা রামমোহন রায় ইংল্যান্ডের ব্রিষ্টল শহরে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে ব্রিষ্টল নাগরীর স্টেপলটন গ্লোভে সমাহিত করা হয়। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রিষ্টলে গিয়ে তার পবিত্র দেহ উক্ত স্থান থেকে সরিয়ে ‘আরনোজভেল’ নামক স্থানে সমাহিত করেন।
ইউডি/অনিক

