কাজে লাগাতে হবে কৃষিপণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনা
আরাফাত রহমান । মঙ্গলবার, ১২ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৬:২০
দেশে সম্পদ বলতে মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ, কৃষি ও জলজ সম্পদই প্রধান। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, জীবনের চাহিদা, খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্পের কাঁচামাল, সরবরাহসহ অর্থনীতির বড় অংশ হলো কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য। আমাদের দেশ আয়তনে ছোট এবং ঘনবসতিপূর্ণ হলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরে সীমিত সাধ্য নিয়ে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে গৌরবোজ্জ্বল অগ্রগতি রয়েছে। আমাদের কৃষি ও কৃষিজাতপণ্য উৎপাদন, বিতরণ ও প্রয়োজনীয় সরবরাহের কারণে মানুষের খাদ্য ও খাদ্য নিরাপত্তায় বিরাট সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
কৃষি ছিল একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। মোট দেশজ উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসত কৃষি থেকে। কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ। শিল্পের অবদান ছিল ১২-১৩ শতাংশ। ধীরে ধীরে কৃষির অবদান কমে শিল্প ও সেবাখাতের অবদান বাড়তে শুরু করে বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রসারের কারণে। কিন্তু শিল্পের কাঁচামাল কৃষি থেকেই আসে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার স্বার্থে, খাদ্য চাহিদা পূরণে, প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগান দিতে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের বিকল্প নেই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, আলু উৎপাদনে ষষ্ঠ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আম ও পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে তৃতীয়।
ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা বিভিন্ন দেশে আমাদের দেশিজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এসব দেশে মুড়ি, চানাচুর, বিস্কুট ও রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি হচ্ছে জ্যাম-জেলি, সস, নানারকম মসলা, জুস, সরিষার তেল, আচার , সুগন্ধি চালসহ আরো অনেক পণ্য।
ফল উৎপাদনে ও বাংলাদেশ অতীতের তুলনায় অনেক ভাল করছে। একসময় বিদেশি ফল হিসাবে আপেল, নাসপাতি, আঙ্গুর, কমলা, খেজুর, স্ট্রবেরি, ড্রাগন সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে ছিল। এখন এ সকল ফল দেশের সর্বত্র পাওয়া যায়। দেশে অনেক দুর্লভ, সুস্বাদু নানা জাতের ফল উৎপাদিত হচ্ছে। এখন মানুষ বাড়ির ছাদে, বাড়ির আঙ্গিনায়, অনাবাদী জমিতেও ফলের চাষ করছে। দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে অনেক সুস্বাদু ফল উৎপাদিত হচ্ছে। এসব ফল সঠিক ভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে, সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের সুযোগ রয়েছে।
এখন ফল আমদানি অনেক কমেছে। এখন আমাদের দেশে কমলা, আঙ্গুর ও মালটার চাষ হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরায় বিদেশি মালটা উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে অশুল্ক বাধা দূর করা গেলে এবং প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা পাওয়া গেলে আরও বেশি রপ্তানি আয় করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আয় বাড়াতে ব্র্যান্ড এবং গুণগত মান উন্নয়নে জোর দিতে হবে। বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্যসহ আমাদের রপ্তানিমুখী পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত না করার কারণে কৃষকের উৎপাদিত বিভিন্ন ফসল ৩০% নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য আমাদেরকে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
২০২০-২০২১ অর্থ বছরে তা বেড়ে ১০২ কোটি ৮১ লাখ ডলারে পৌঁছে। আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি দিনদিন উন্নত হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আরও বেগবান করতে হলে গ্রামের কৃষি ও কৃষিভভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ বাজার ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। আমাদের জনশক্তির প্রায় অর্ধেক নারী। আর গ্রামের নারীরা কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ও কুটির শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত। মৎস চাষ, ফলচাষ, ফুলচাষ, পাটচাষ, পান চাষ, পশুপালন, দুগ্ধ উৎপাদন, চা ও কাগজ শিল্পের উন্নয়ন অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। গ্রামের শিক্ষিত যুবক যুবতীদের সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে কৃষি ও কৃষিজপণ্য উৎপাদনসহ গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব।
লেখক: সাংবাদিক
ইউডি/সুস্মিত

