পরিবারের বয়স্কদের একাকিত্ব ঘুচাতে হবে আমাদেরই

পরিবারের বয়স্কদের একাকিত্ব ঘুচাতে হবে আমাদেরই

সালাহ্ উদ্দিন নাগরী । মঙ্গলবার, ১২ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৬:০০

মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে, শ্রদ্ধা করবে, পাশে দাঁড়াবে, অন্যের সমস্যা সমাধানে হাত বাড়িয়ে দেবে-এ বিষয়গুলো মনেপ্রাণে সবাই চায়। কিন্তু যখন এ চাওয়া-পাওয়ার হিসাব গোলমেলে হয়ে যায়, তখন অনেকের কাছে বেঁচে থাকাটাই বৃথা ও মূল্যহীন মনে হয়। প্রয়োজনের মুহূর্তে যখন পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাওয়া যায় না, তখনই হয়তো আত্মহত্যা করে। আর আলোচ্য এ আত্মহত্যার পেছনে এ কারণগুলোই অনেকাংশে মুখ্য হয়ে দেখা দিচ্ছে।

মানুষ একা বাঁচতে পারে না। কিন্তু তারপরও যদি কাউকে পরিবার ও সমাজ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয় বা থাকতে বাধ্য করা হয়, তাহলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তো ঘটবেই। সারা জীবন স্ত্রী, সন্তানসন্ততি ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য পরিবেষ্টিত একজন মানুষের পক্ষে তো শেষ বয়সে একাকী থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বয়স্ক ব্যক্তিরা নিয়ত একা হয়ে যাচ্ছেন এবং এ হার ক্রম ঊর্ধ্বমুখী।

এসব মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বেশ সরব। মৃত্যুগুলোয় পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ভূমিকা, দায়দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ হচ্ছে, বহু ধরনের আলোচনা এবং মতামত দেওয়া হচ্ছে। আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে স্বামী-স্ত্রী, সন্তানসন্ততি ও ভাই-বোনের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত। আসলেই ভবিষ্যতে যেন এরকম আর না ঘটে, তাই এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। পরিবার, সমাজকে সে আদলে সাজাতে হবে। করণীয়গুলো আগে থেকেই নির্ধারণ করে নিতে হবে।

আমরা সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠাচ্ছি। পরবর্তীকালে তার দেখভালের জন্য ‘মা’ যাচ্ছেন, বাবা থাকছেন দেশে। ফলে স্বামী-স্ত্রীকে বছরের পর বছর আলাদা আলাদা থাকতে হচ্ছে। হয়তো আর কোনোদিনই একত্রিত হওয়া যাচ্ছে না। আমাদের পারিবারিক বন্ধনগুলো শিথিল হয়ে যাচ্ছে। সচ্ছল ও সক্ষম সন্তানরাও বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না। পরিবার, সন্তানের অবহেলায় আজ বৃদ্ধ মা-বাবার ঠিকানা হচ্ছে পুনর্বাসন কেন্দ্র। তাই তো ইউরোপ, আমেরিকার মতো আমাদের দেশেও বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের চাহিদা বেড়ে চলেছে। সন্তান-পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এসব মানুষ আজ বড়ই একা। লজ্জা, ঘৃণা, ক্ষোভে তারা নিজেদের সমাজ থেকে আড়াল করে নিচ্ছেন।

সন্তান ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বসবাস করা বৃদ্ধরা সবাই যে মানসিকভাবে ভালো আছেন, তাও নয়। বৃদ্ধ মা-বাবার অনেককে অযত্ন-অবহেলায় দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। বাসার সবচেয়ে অন্ধকার, স্যাঁতসেতে কোনো ঘর বা বারান্দার এক চিলতে অংশ পার্টিশান দিয়ে তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন চার দেওয়ালের মধ্যে কাটানোর প্রভাব পড়ছে বয়স্ক মানুষদের ওপর। তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন, অসহায়ত্ব তাদের ওপর জেঁকে বসছে। পরবাসীর মতো অনেকটা একাকী জীবন পার করছেন। শেষ বয়সে যখন প্রিয়জনদের নিয়ে সময় কাটানোর কথা, তখন নিঃসঙ্গতা তাদের গ্রাস করছে। একা একা জীবনযাপন করতে করতে অনেকেই মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।

সমাজ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এভাবে ফেলে রাখলে আমাদেরই ক্ষতি। তাদের সেবামূলক কাজে জড়িত করতে হবে, সামাজিক সমস্যা নিরসনে সম্পৃক্ত করতে হবে। এতে তাদের যেমন সুন্দর সময় কাটবে, একইভাবে সমাজও লাভবান হতে পারবে। বয়স্কদের প্রতি দায়িত্ব পালনে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানকে। বিদেশে স্থায়ী হওয়ার বাসনায় বা স্বামী-স্ত্রীর যথাযথ বনিবনা না থাকার দোহাই দিয়ে পরস্পর আলাদা বসবাস কিন্তু নিত্যনতুন ঝামেলাই তৈরি করে। ভাইবোন, আত্মীয়স্বজনকে পরস্পরের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। বয়স্করা যেন তাদের বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ ও উঠাবসা করতে পারে, সে সুযোগ সৃষ্টির ভার আমাদেরই নিতে হবে।
অবসরে চলে গেলে বা বয়সের নির্ধারিত স্তরে পৌঁছে গেলেই মানুষের সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। অনেকেই এখনো সমাজে অবদান রাখার মতো অবস্থায় আছেন। তাদের যার যে বিষয়ে অভিজ্ঞতা আছে, তা কাজে লাগাতে হবে। সমাজ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এভাবে ফেলে রাখলে আমাদেরই ক্ষতি। তাদের সেবামূলক কাজে জড়িত করতে হবে, সামাজিক সমস্যা নিরসনে সম্পৃক্ত করতে হবে। এতে তাদের যেমন সুন্দর সময় কাটবে, একইভাবে সমাজও লাভবান হতে পারবে। বৃদ্ধ স্বজনদের জন্য পরিবার, বৃহত্তর পরিবার ও সমাজে আনন্দময় ও সুখকর পরিবেশ তৈরি এবং তা বজায় রাখতে সবাইকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।

লেখক- অনলাইন বিশ্লেষক

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading