বৈষম্যবিরোধী আইন: সমান অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য

বৈষম্যবিরোধী আইন: সমান অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১৮ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:৫০

মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বৈষম্য নিরোধে নতুন আইন করার লক্ষ্যে, বৈষম্যবিরোধী আইনের খসড়া সম্প্রতি জাতীয় সংসদে তোলা হয়েছে। সরকারের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন নাগরিক সমাজ। এই আইন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের দাবি আদায়ের ও মর্যাদা রক্ষার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠবে বলে মনে বিশেষজ্ঞরা। তবে, এই আইনের খসড়ার বেশকিছু ঘাটতি তুলে ধরেছেন তারা। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান

বৈষম্যমূলক আচরণ কী? এমন প্রশ্নে আমাদের মধ্যে অনেকেই উত্তর দিতে পারবে না। কেননা তারা এই আচরণকে আলাদাভাবে বিচার করতেই ভুলে গেছে। এমন আচরণ যেন এক নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ভাবুনতো, একজন যৌন কর্মী, তৃতীয় লিঙ্গ অথবা দলিত শ্রেণীর কাউকে দেখলে আপনি কী তার সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলবেন। উত্তরটি হচ্ছে ‘না’। আর তাদের সঙ্গে আপনার ব্যবহারই হচ্ছে একধরণের বৈষম্যমূলক ব্যবহার। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দলিত, হরিজন, সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসী, ট্রান্সজেন্ডার ও হিজড়া কমিউনিটি, ভূমিহীন ও যৌনকর্মীসহ সমাজের এই সকল মানুষ প্রতিনিয়ত যে ধরণের বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে তা নিয়ে সম্প্রতি একটি আইনের খসড়া জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। নাগরিক সমাজ ও বিশ্লেষকরা এই আইনের প্রস্তাবের খসড়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করছেন। তারা এই আইনের খসড়ার বিভিন্ন থাটতির বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তারা বলছেন, নিঃসন্দেহে সংবিধানের মৌলিক ধারাগুলোর ওপর ভিত্তি করেই আইনটি উত্থাপন করা হয়েছে। তবে এই আইনের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য দৃশ্যমান রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ প্রশাসন ও নাগরিক নজরদারি প্রয়োজন। গত ৫ এপ্রিল আইনের খসড়াটি সংসদে তোলার পর বিলটি ৩০ দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

বৈষম্যমূলক আচরণকে ‘দণ্ডনীয় অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করতে হবে: বাংলাদেশে যে ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ প্রতিনিয়ত ঘটে, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে বৈষম্যমূলক আচরণকে ‘দণ্ডনীয় অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করতে হবে বলে মনে করেন এই আইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, কোনও আইনে ‘ক্রিমিনাল প্রভিশন’ না থাকলে এটি প্রকৃতপক্ষে আইন হয় না। রবিবার (১৭ এপ্রিল) প্রস্তাবিত বৈষম্যবিরোধী আইনের উল্লেখযোগ্য অংশগুলো নিয়ে অনুষ্ঠিত এক ওয়েবিনারে এসব কথা উঠে এসেছে। প্রসঙ্গত, নাগরিক সমাজ, আইন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বৈষম্যবিরোধী আইনের খসড়ায় বৈষম্যমূলক আচরণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করা হয়েছে এবং পাশাপাশি ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল। কিন্তু উপস্থাপিত বিলে শাস্তির কোনও বিধান রাখা হয়নি। ওয়েবিনারের আয়োজন করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপ্রধান শহীদুজ্জামান সরকার। তিনি আয়োজকদের এই অনুষ্ঠানের সব সুপারিশমালা স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছে পাঠানোর অনুরোধ করেন। যাতে করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে পারেন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আইনের ভাষ্য সুনির্দিষ্ট হওয়া চাই: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে দলিত নেতা মিলন বিশ্বাস বলেন, উপযুক্ত কারণ ছাড়া পিতৃ বা মাতৃ পরিচয় প্রদানে অসমর্থতার কারণে কোনও শিশুকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি, অমত বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা বাধা প্রদান করা যাবে না’ বলে আইনে যা বলা হয়েছে তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। কোন কোন কারণে কোনও শিশুকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানানো যাবে বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে, তা সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। নয়তো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ কখনওই শিক্ষায় সমান সুযোগ পাবে না।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন

মানুষের মনোজগত ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন জরুরী: এমজেএফ-এর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম অনুষ্ঠানটি পরিচালনাকালে বলেন, মানুষের মনোজগতে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা না গেলে, আইন করেও কোন লাভ হবে না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টি করা। আইনের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষ যেন বিচার পায়, সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

আইনে বৈষম্যের তালিকাটি আরও প্রসারিত করা দরকার: এসডিজি প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অনেকেই বলেন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। কিন্তু আমি বলতে চাই, আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন রাজনৈতিক ইচ্ছা দৃশ্যমান হয়, দক্ষ প্রশাসন থাকে এবং নাগরিকদের পক্ষ থেকে সক্রিয় মনিটরিং করা হয়। তিনি আরও বলেন, আইনে বৈষম্যের তালিকাটি আরও প্রসারিত ও সামগ্রিক করতে হবে। এই আইনের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য দৃশ্যমান রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ প্রশাসন ও নাগরিক নজরদারি প্রয়োজন।

চাকমা সার্কেলের চিফ রাজা দেবাশীষ বলেন, আইনটিতে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। আন্তর্জাতিক শ্রম আইন কনভেনশনের ১০৭ ও ১১১ ধারা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এখানে আদিবাসীদের অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

শাহীন আনাম

মনিটরিং কমিশনে সব শ্রেণি-পেশার লোকের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা দরকার: সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি বলেন, এই খসড়া আইনটি আমার কাছে খানিকটা অপেশাদার বলে মনে হয়েছে। মনিটরিং কমিশন নিয়েও আমি সন্দেহ পোষণ করছি। কারণ, এখানে সব শ্রেণি-পেশার লোকের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি। এছাড়া আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় নাই। এটা একটা কাঠামোগত ত্রুটি। ফলে বিচারের জন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে ছুটে বেড়াতে হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই আইন নিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বৈষম্যের কাঠামোগত সংজ্ঞায়নে মানসিক প্রতিবন্ধী, বর্ণবৈষম্য ও অ্যাসিড দগ্ধদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তাছাড়া এই আইনে ভূমির আইনগত মালিকদের কথা বলা হলেও প্রথাগতভাবে ভূমির মালিকদের তথা আদিবাসীদের ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৮ এপ্রিল ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

বৈষম্যের সংজ্ঞাকে আরও ব্যাপকভাবে দেখতে হবে: আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রংও একটি শক্তিশালী মনিটরিং কমিটি গঠনের কথা বলেন। নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী প্রধান জাকির হোসেন বলেন, যে খসড়া আইনটি প্রথমে প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেখানে ‘বৈষম্য বিলোপ বা নিরসন’ কথাটি ছিল। এখন বলা হচ্ছে ”বৈষম্য বিরোধী আইন”। এই সংজ্ঞাটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্টের পক্ষ থেকে ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, সেবা প্রাপ্তিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নানারকম বৈষম্যের শিকার হয়। যেমন, শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি পাওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে। বৈষম্যের সংজ্ঞাকে আরও ব্যাপকভাবে দেখতে হবে। এর কারণ ও মনিটরিং কমিটির কার্যপরিধি নিয়ে ভাবতে হবে। এর আগে অপর এক প্রতিক্রিয়ায় ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, সামগ্রিকভাবে একটি আইনের মাধ্যমে সব ধরনের বৈষম্যকে কেন্দ্রীভূত করার প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে আইনে বৈষম্যের সংজ্ঞায় কিছু সমস্যা আছে। যেমন: যৌনকর্মীদের পেশা বৈধ কি না-এ ব্যাপারে আইনে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। এখানে লক্ষণীয়, বৈষম্যের প্রতিকার কীভাবে হবে, তাও আইনে স্পষ্ট নয়। সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের সিনিয়র ফেলো ড. ফস্টিনা পেরেইরা বলেন, প্রতিকারের জায়গাটা আরও বিস্তৃত হওয়া উচিত। যেমন: একজন ব্যক্তি একের অধিক ধরনের বৈষম্যের সম্মুখীন হতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি কী ধরনের প্রতিকার পাবেন, সেটা স্পষ্ট নয়। তাছাড়া উত্থাপিত আইনে অভিযোগ দায়ের থেকে শুরু করে সবশেষে প্রতিকার পেতে এক ধরনের প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা লক্ষণীয়।

সামাজিক ন্যায়বিচার এক ধাপ এগোল: নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী প্রধান জাকির হোসেন বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আইনটির খসড়া সংসদে উত্থাপনের বিষয়টিকে বলা যায় সামাজিক ন্যায়বিচার এক ধাপ এগোল। আইনটিতে শাস্তির বিধান রাখা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে আইনটির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading