শান্তিপূর্ণ সমাজের জন্য চাই সবার সচেতনতা
নাহিদুর রহমান । সোমবার, ১৮ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:১০
সমাজে নানা কারণে অস্থিরতা বাড়ছে। সামাজিক বন্ধনও দিনে দিনে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এ কারণে সমাজ থেকে অপরাধপ্রবণতা দূর করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারী ও শিশুর প্রতি নির্মম এবং বর্বর ঘটনার খবর আসছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, নিপীড়কের রাজনৈতিক প্রভাব, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, সামাজিক মূল্যবোধের অভাব, মাদক, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, সামাজিক অস্থিরতা, পুরুষের বিকৃত মানসিকতা সামাজিক অপরাধ বাড়ার মূল কারণ। তাছাড়া পারিবারিক মূল্যবোধের অভাবেও অনেকেই বিপথে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের।
সামাজিক অস্থিরতার কারণে খুনের ঘটনা বাড়ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইদানীং দেশে সামাজিক অপরাধের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এখনই যদি এ অবস্থা প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া না হয় তবে তা মহামারির রূপ নেবে। পত্রপত্রিকার পাতা খুললেই এখন দেখা যায় ধর্ষণ, খুন যেন সাধারণ বিষয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তানের হাতে বাবা খুন, বাবা কিংবা মায়ের হাতে সন্তান, স্বামীর হাতে স্ত্রী, স্ত্রীর হাতে স্বামী অথবা ভাইয়ের হাতে ভাই। এমন সংবাদ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে সচেতন নাগরিক এমনকি জনসাধারণের মাঝে। করোনা সংকটকালীনও প্রতিদিনই ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে এক গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় সমালোচনা ঝড় উঠেছে দেশজুড়ে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। এমন ঘটনা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়াবে, সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। শিশু হত্যা, শিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ, পারিবারিক ও সামাজিক কোন্দলে আহত ও নিহত, নারী নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা প্রায় দেখছি আমরা। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রেমে ব্যর্থতা, অভিমান, রাগ ও যৌন হয়রানি, পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল, এমনকি পছন্দের পোশাক কিনতে না পারার কারণেও আত্মহত্যার ঘটনাও কম নয়। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিটি পরিবারেরই ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা থাকে। আর অনেক কারণ একত্রিত হয়ে এ ধরনের পারিবারিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
নানা কারণে কিছু মাত্রায় অপরাধ সব সমাজেই সংঘটিত হয়। সেসব যাতে না হয়, তার জন্য সভ্যসমাজ বিচারিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। তাতে অপরাধের মাত্রা ন্যূনতম পর্যায়ে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া বা আর্থিক-সামাজিক প্রতিপত্তির কারণে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়, সেসব বন্ধ করা কঠিন কাজই বটে।
আমরা প্রত্যেকেই চাই নিরাপত্তার সাথে শান্তিতে বসবাস করতে। সবচেয়ে কম অপরাধ সংঘটনের একটি সামাজিক পরিবেশে, সবচেয়ে কম ঝুঁকিসম্পন্ন একটি সমাজে বাস করার আকাংক্ষা দেশের জনগণের। মানুষ সামাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে ভালোবাসে। এই সমাজকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাখতে সমাজের প্রত্যেককে স্বীয় দায়িত্ব সততা, স্বচ্ছতা ও দেশপ্রেমের সাথে পালন করতে হবে। প্রত্যেকের মধ্যে পারস্পরিক কল্যাণবোধ, মমতোবোধ, দেশপ্রেম জাগ্রত করতে হবে। আসুন আমরা মানবতার কল্যাণে জনহিতকর কাজে সর্বদা অংশগ্রহণ করি।
কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা, অহংকার, পরশ্রীকাতরতা মানুষের রিপু হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে বহুকাল থেকে। সব জাতি ও সমাজের মানুষের মধ্যেই তা বিদ্যমান। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শনে যেসব জাতি অতি উন্নত তাদের মধ্যেও ক্রোধের বশে খুন-খারাবি ও শারীরিক সহিংসতার প্রবণতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম নানা মাত্রায়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি ইতিবাচক ঘটনার পাশাপাশি সামাজিক অপরাধ, অনৈতিকতা, সন্ত্রাস ও অবক্ষয়ের মতো নেতিবাচক দিকগুলোও যথেষ্ট ব্যাপক, যা নষ্ট করে দিচ্ছে ইতিবাচক অর্জন। শিক্ষায়তন থেকে পেশাগত কর্মস্থল পর্যন্ত সর্বত্র এ ব্যাধির বিস্তার। উন্নয়নশীল বিশ্বে অপরাধপ্রবণতা অধিক। বিশেষ করে খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতির মতো সামাজিক অপরাধ। এর প্রধান কারণ আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা, মৌলিক চাহিদা পূরণ না হওয়া, রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকা ইত্যাদি। এ মুহূর্তে দেশে বিগত দিনের চাইতে সামাজিক অপরাধ অনেক গুণ বেড়েছে বলে সমাজবিজ্ঞানীরা মতপ্রকাশ করেছেন। প্রতিদিন পত্রপত্রিকা খুললেই আমরা দেখতে পাই হত্যা-ছিনতাইয়ের সংবাদে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠা ভরে আছে। নারী ও শিশু ধর্ষণও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এরও একটি বড় অংশের সঙ্গে অর্থনৈতিক হতাশা রয়েছে। মাদকাসক্তি ও মাদকাসক্তি থেকে উদ্ভূত অপরাধের পেছনেও বড় ভূমিকা রয়েছে অর্থনৈতিক হতাশার। সুতরাং একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ নির্মাণ করতে চাইলে সবার সচেতনতা জরুরি।
লেখক- সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

