গুগলিয়েলমো মার্কনি: যার যুগান্তকারী আবিষ্কারে বদলেছে যোগাযোগের মাধ্যম
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১৯ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:৫০
পৃথিবীকে জ্ঞান বিজ্ঞানে যারা অগ্রসর করে গেছেন তাদের অন্যতম বেতার আবিষ্কারক গুগলিয়েলমো মার্কনি। বেতারের জনক মার্কনি নামেই যিনি সমধিক পরিচিত। রেডিও আবিষ্কার করে পৃথিবীকে বদলে দিয়েছেন বিজ্ঞানী মার্কনি। তিনি ছিলেন ইতালীয় উদ্ভাবক এবং প্রকৌশলী যিনি বেতার যন্ত্রের সম্প্রচার পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। বেতার যন্ত্রের জনক গুলিয়েলমো মার্কনির সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
মার্কনি শুধু ইটালীরই নাগরিক নন, বরং নিজেকে সারা বিশ্বের নাগরিক মনে করতেন। তিনি একাধারে ইংরেজী, ল্যাটিন এবং ফরাসী ভাষায় কথা বলতে পারতেন। মধুর ব্যবহার দ্বারা সবার মন জয় করতেন। বিশ্বের সেরা আবিষ্কারক টমাস আলভা এডিসন ছিলেন মার্কনির একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু।
গুলিয়েলমো মার্কনি কে ছিলেন?
গুলিয়েলমো মার্কনি ছিলেন ইতালিয়ান উদ্যোক্তা, রেডিও ইঞ্জিনিয়ার। পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একজন আবিষ্কারক হিসাবে পরিচিত। বিখ্যাত পদার্থবিদ অনেক সম্মানজনক পুরষ্কার এবং শিরোনামের মালিক ছিলেন। গুলিয়েলমো মার্কনি একটি ব্যবহারিক রেডিওগ্রাফ পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। এই উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করেই বিশ্বের অসংখ্য ব্যবসায়িক ও প্রাযুক্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। ১৯০৯ সালে কার্ল ফের্ডিনান্ড ব্রাউনের সঙ্গে যৌথ ভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বেতার সম্প্রচার পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপনের জন্যই তাদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
মার্কনির জন্ম ও শৈশব
বেতার যন্ত্রের জনক গুলিয়েলমো মার্কনি ১৮৭৪ খ্রীস্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল ইটালীর বেলেগনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জিউশেপ মার্কনি। মায়ের নাম এ্যানি জেমসন। তিনি স্কচ পরিবারের মেয়ে ছিলেন। মার্কনির বাবা জিউশেপ ছিলেন পন্টেসিও এলাকার একজন ধনী জমিদার।
জন্মস্থানেই ছেলেবেলা কাটে মার্কনির। শৈশবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দীক্ষা তার হয়নি। শুধুমাত্র গৃহশিক্ষকের কাছেই তিনি নানা বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেছিলেন। শীতকালে মার্কনিদের এলাকায় খুব শীত নামতো। এই সময় তার বাবা–মা ছেলে–মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে ইটালীর ফ্লোরেন্স বা লিভর্নোতে চলে যেতেন।
পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষা
ছোটবেলা থেকেই অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকদের মতো মার্কনিরও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির প্রতি অপরিসীম আগ্রহ লক্ষ্য করা যেতো। শীতকালে একবার নিভর্নোতে থাকার সময় সেনতৃসসা রোসা নামক এক বিজ্ঞানের অধ্যাপকের সাথে মার্কনির আলাপ হয়। তখন তার বয়স মাত্র দশ বছর। মার্কনি ইতিমধ্যে বৈদ্যুতিক শক্তি সম্পর্কে অনেক বই পড়ে ফেলেছিলেন। এতো কম বয়সে বৈদ্যুতিক শক্তি সম্পর্কে তার আগ্রহ দেখে রোসা অবাক হয়ে গেলেন। তিনি মার্কনিকে পদার্থবিজ্ঞান শেখাতে শুরু করলেন।
গুলিয়েলমো মার্কনির শিক্ষাজীবন
মার্কনি পড়াশুনা খুব পছন্দ করতেন। বিজ্ঞানের নানা বিষয়ক বই পড়ে এবং গৃহশিক্ষকের কাছে বিজ্ঞানের নানা তথ্য জেনে নিয়ে অল্প বয়সেই অসাধারণ জ্ঞানার্জন করেন। তিনি বাড়িতে বসে নানা বিষয়ে একা একা পরীক্ষা–নিরীক্ষা চালাতেন এবং ভবিষ্যতে বড় বিজ্ঞানী হবার স্বপ্ন দেখতেন। যৌবনে পদার্পণ করে প্রথমে মার্কনি ফ্লোরেন্সের কতেরো ইনস্টিটিউট এবং পরে লেংহর্ন টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে গিয়ে হাতে কলমে শিক্ষা গ্রহণ করেন।
বিশ বছর বয়সে মার্কিন বিজ্ঞানী হার্জের একটা প্রবন্ধ থেকে জানতে পারেন যে, সদ্যপ্রয়াত ঐ বৈজ্ঞানিক এমন একটা বৈকি যন্ত্র বের করতে পেরেছেন যার সাহায্যে ঘরের একদিক থেকে প্রেরিত বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বিনা তারে ঘরের অন্যদিকে আগুনের ফুলকিনিতে দেয়। হাতের লিখিত তত্বে এই মত প্রকাশ করা হয়েছি যে, বাতাসকেই তড়িৎ পরিবহনের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
বৈদ্যুতিক যন্ত্র তৈরি
পন্টেসিওতে নিজের দেশের বাড়িতে ফিরে এসে মারর্কনি লোকান্তরিত চার্জের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্র তৈরির চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকলেন। তিনি নিজেদের বাড়ির চার তলায় একটা গবেষণার গড়ে তোলেন। সেখানে তিনি তার বড় ভাইয়ের সাথে গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি ইংরেজ বিজ্ঞানী প্রফেসর ব্রনলি এবং প্রয়াত হার্জের পদয়ে অনুসরণ করে এমন একটা যন্ত্র তৈরি করতে পারলেন, যারা এক মাইল দূর পর্যন্ত বিনা তারে তিনি সংকেত পাঠাতে পারতেন। তার পিতা ছেলের এই সাফল্যে খুব খুশি হলেন। ছেলেকে তিনি সব রকম আর্থিক সহায়তা দিতে লাগলেন।
পেটেন্ট লাভ ও কোম্পানী প্রতিষ্ঠান
১৮৯৬ খ্রীস্টাব্দে মার্কনি ইটালী থেকে ইংল্যান্ডে চলে এলেন এবং তার আবিষ্কৃত যন্ত্রটির পেটেন্ট লাভ করলেন। ১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দে তিনি লন্ডনে মার্কনি কোম্পানী নামে এটা প্রতিষ্ঠান খুললেন।
আবিষ্কার ও সম্মান
১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দে ইংলিশ চ্যানেলের এপার থেকে ওপার পর্যন্ত বিনাতারে সংবাদ আদান প্রদান করতে সক্ষম হলেন। পরবর্তীতে দ্রুতগতিতে মার্কনির আবিষ্কৃত বেতারযন্ত্রের ব্যবহার বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯০২ খ্রীস্টাব্দে আমেরিকান ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে মার্কনিকে সম্মানিত করা হয়।
মার্কনি নোবেল পুরস্কার
১৯০৯ খ্রীস্টাব্দে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মার্কনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের দুর্লভ সম্মান লাভ করেন। এর পরবর্তী বছর ১৯১০ খ্রীস্টাব্দে ছয় হাজার মাইল দূরত্বে বেতারের মাধ্যমে সংবাদ প্রেরণ করা সম্ভব হয়।
রেডিও আবিষ্কারে বিতর্ক
মার্কনি ১৯০১ সালে মার্কনি আটলান্টিকের ওপারে প্রথম বেতার সংকেত পাঠান এবং পাল্টাসংকেত গ্রহণ করেন। এর আগেই ১৮৯৯ সালে মার্কনি বাংলার জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ তথ্য দিয়েছেন ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির জ্যেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ খোদ মার্কনির নাতি পারসেশচে মার্কনি। তার মুখের কথাতে, ‘এই যোগাযোগের কোনো দলিল আমরা পাইনি এখনো, তবে এর প্রক্রিয়া চলছে।’
আমেরিকা ভিত্তিক এক কোম্পানির একটি অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে, মার্কনি যে ডিটেক্টর ব্যবহার করেছেন, তার আবিষ্কারক জগদীশ বসু। এ প্রতিষ্ঠান বসুকে রেডিও বিজ্ঞানের জনক বলে অভিহিত করে।
মারকুইস খেতাব ও মৃত্যু
১৯২৯ খ্রীস্টাব্দে ইটালীর তৎকালীন রাজা তাকে “মারকুইস” খেতাব দানে সম্মানিত করেন। ১৯৩৩ খ্রীস্টাব্দে মার্কনি সস্ত্রীক বিশ্বভ্রমণে বের হন। মার্কনি ১৯৩৯ খ্রীস্টাব্দের ১৮ই জুলাই ৬৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
ইউডি/অনিক

