দেশের অর্থনীতিতে নতুন দুয়ার উম্মোচন করেছে কাঁকড়া
মোহম্মদ ফিরোজ আলী । বুধবার, ২০ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১১:৪০
একসময় গ্রামের মানুষের কাছে সাপের মতো পরম শত্রু ছিল কাঁকড়া। কিন্তু এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্ভাবনাময় এক সম্পদের নাম কাঁকড়া। কাঁকড়া দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন দুয়ার উম্মোচন করেছে। এ দেশের খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর, সাগরে প্রচুর পরিমাণে কাঁকড়া ছিল। কিন্তু কাঁকড়া আহরণে মানুষের তেমন আগ্রহ ছিল না। ঘের বাণিজ্যের ‘সাদা সোনা চিংড়ি ও কাঁকড়া’ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী জাতীয় মাছ ইলিশ ও চিংড়ির পরেই কাঁকড়ার স্থান। একসময় চিংড়ি মাছ ছিল, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির প্রতিভূ। এখন চিংড়ির স্থান সর্বত্র দখল করছে, জলজ প্রাণী কাঁকড়া।
উৎপাদন কমে যাওয়া এবং চিংড়ি মাছ চাষে নানা সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় চাষিরা পেশার পরিবর্তন করছেন। কম খরচে, কম শ্রমে ব্যাপক হারে কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। কাঁকড়ার দাম আর চাহিদা ইলিশ ও চিংড়িকে পেছনে ফেলে অগ্রসর হচ্ছে। বড় সাইজের প্রতি কেজি কাঁকড়ার দাম হাজার টাকারও বেশি। প্রতিটি পরিপূর্ণ কাঁকড়ার ওজন এক কেজি থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত হয়। উপকূলীবর্তী এলাকার লবণপোড়া ফসলহীন জলাভূমিতে কাঁকড়ার চাষে ভাগ্যের চাকা ঘুরছে লাখ লাখ চাষির এবং দেশ পাচ্ছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। চিংড়ির ঘেরগুলো কাঁকড়ায় রূপান্তরিত হচ্ছে। চিংড়ির আড়তের চেয়ে বাড়ছে কাঁকড়ার আড়তের সংখ্যা। কাঁকড়া রপ্তানি করে প্রতি বছর গড়ে আয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। সুন্দরবন এলাকার ৬০ হাজারেরও বেশি পরিবার কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রাকৃতিকভাবেই লোনা পানিতে কাঁকড়া জন্মায়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এ মৎস্য সম্পদ রপ্তানি বাণিজ্যের সরকারি খাতা কলমে অপ্রচলিত পণ্য বলে পড়ে আছে।
পৃথিবীর ২৪টিরও বেশি দেশে কাঁকড়া রপ্তানি হচ্ছে। চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, থাইওয়ান, হংকং, সিংগাপুর থাইল্যান্ড, আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া, ফ্রান্স, ভারত, মিয়ানমার, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কাঁকড়ার সুখ্যাতি রয়েছে। দেশের অভিজাত হোটেলগুলোতে খাদ্যের পছন্দের তালিকায় কাঁকড়ার নাম সর্বাগ্রে। গ্রামাঞ্চলের মানুষও এখন চিংড়ি মাছের পরিবর্তে কাঁকড়া খাচ্ছেন।
বাংলাদেশের খুলনা, বাগেরহাট, কক্সবাজার, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, সুন্দরবন, সীতাকুণ্ড, মহেশখালি, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, চকরিয়া, যশোর, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে কাঁকড়া চাষ হয় বেশি। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েক হাজার কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ খামার গড়ে উঠেছে। শুধু পাইকগাছাতেই ৩০০-এর বেশি খামার রয়েছে। কক্সবাজারে কাঁকড়ার চাষ হচ্ছে আধুনিক পদ্ধতিতে। কাঁকড়া চাষের জন্য জমির আয়তন তেমন কোনো বিষয় নয়। শুধু প্রয়োজন নেট, পাটা, পুঁজি ও খাদ্যের। এক বিঘা জমিতে কাঁকড়া চাষ করতে হলে আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকার প্রয়োজন হয়। এতে মাসে ২৫-৩০ হাজার টাকা আয় করা যায়। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০০৩ সালে কাঁকড়া পোনা চাষ বিষয়ে গবেষণা শুরু করে। ২০১৪ সালের নভেম্বর থেকে ইউএসআইডির অর্থায়নে ও আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশর অ্যাকয়া কালচার ফর ইনকাম অ্যান্ড নিউট্রিশন প্রকল্পের যৌথ তত্ত্বাবধানে কক্সবাজারে একটি হ্যাচারিতে কাঁকড়ার উৎপাদনে নিবিড় গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর মতে, ১৯৭৭ সালে প্রথম বাংলাদেশ থেকে কাঁকড়া রপ্তানি শুরু হয়। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২ হাজার ৯৭৩ টন, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৪ হাজার ৪১৬ টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৮ হাজার ৫২০ টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দ্বিগুণ কাঁকড়া রপ্তানি করা হয়। একমাত্র সাতক্ষীরায় প্রতি বছর ৩ হাজার মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদিত হয়। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পরেই কাঁকড়া উৎপাদনে সাতক্ষীরা জেলার স্থান। দুভাবে কাঁকড়া বিদেশে পাঠানো হয়ে থাকে, সফট সেল ক্র্যাব হিমায়িত করে এবং হার্ড সেল ক্র্যাব হচ্ছে, জীবিতাবস্থায় কাঁকড়া বিদেশে পাঠানোর পদ্ধতি। এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁকড়া চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ১৯৯৩ সাল থেকে সনাতন পদ্ধতিতে পুকুরে কাঁকড়ার চাষ শুরু হয়। ১৯৯৫ সালে প্রথম হংকংয়ে বাণিজ্যিকভাবে কাঁকড়া রপ্তানি হয়। কাঁকড়া উৎপাদনের ব্যাপারে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারিভাবে জোরালো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নৌযানের সুবিধা থাকলে সাগর থেকে কাঁকড়া ধরে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এতে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধিশালী হবে।
একসময় দেশ জুড়ে কাঁকড়া আহরণ ও রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় কাঁকড়ার বিদেশের বাজার দখল করে নেয়, মিয়ানমার, ভারত, থাইল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ। রপ্তানিযোগ্য কাঁকড়ার প্রজনন বৃদ্ধির জন্য সরকারিভাবে জানুয়ারি মাস থেকে মার্চ পর্যন্ত সুন্দরবনসহ সব নদ-নদী ও জলাশয়ে কাঁকড়া ধরা বিধিনিষেধ ছিল। তার পরও সুন্দরবনের গহিনে ১৯টি অভয়ারণ্যে জেলেরা কাঁকড়া ধরছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও যদি বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর না হয়, তাহলে উন্নত রাষ্ট্র গঠনে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাবে। তাই কাঁকড়া উৎপাদনে দেশের সর্বত্র চাষিদের ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, গ্রামে-গঞ্জে পুকুর নালা খনন করে জেলা উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য অফিসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাষিদের কাঁকড়া উৎপাদনে উৎসাহিত করলে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তিলাভ করা সম্ভব। কোনোভাবেই কাঁকড়া বিলুপ্তি না ঘটে, সে ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগে গ্রহণ করা জরুরি।
ইউডি/সুস্মিত

