আব্রাহাম লিংকন : ইতিহাসে স্মরণীয় এক রাষ্ট্র নেতা

আব্রাহাম লিংকন : ইতিহাসে স্মরণীয় এক রাষ্ট্র নেতা

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২২ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:২০

মানবতাবাদী রাষ্ট্রনায়ক আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক। শুধু এইটুক বললে তার পরিচয় অসম্পূর্ণ থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে যে কয়জন মানবতাবাদী গণতন্ত্রপ্রেমী মহান রাষ্ট্রনায়ক জন্মেছেন, আব্রাহাম লিংকন তাদের অন্যতম। আমেরিকান রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী আব্রাহাম লিংকনের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম

একটি সামান্য কাঠের ঘরে বাস করা আব্রাহাম পরবর্তীকালে স্বীয় প্রতিভাবলে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ছিলেন। তার চরিত্র মাধুর্য এবং মানবিকতাবোধের সাথে দুর্লভ রাজনীতি জ্ঞান তাকে কেবল আমেরিকার ইতিহাসেই নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও চিরস্মরণীয় এবং বরণীয় করে রেখেছে।

আব্রাহাম লিংকনের পরিচিতি
আব্রাহাম লিংকন ১৮৬১ সাল থেকে ১৮৬৫ সালে তার হত্যার আগপর্যন্ত আমেরিকার ১৬তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। নৈতিক, সাংস্কৃতিক, সাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক সঙ্কটে আব্রাহাম লিংকন আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ইউনিয়ন সংরক্ষণ, দাসত্ব বিলোপ, ফেডারেল সরকারকে মজবুত এবং আমেরিকার অর্থনীতিকে আধুনিকীকরণে সফল হন। তার চরিত্র মাধুর্য এবং মানবিকতাবোধ আর সেইসঙ্গে তার দুর্লভ রাজনীতি জ্ঞান তাকে কেবল আমেরিকার জাতীয় ইতিহাসেই নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও চিরস্মরণীয় এবং বরণীয় করে রেখেছে।

এই মনীষীর শৈশব ও বাল্যজীবনের কাহিনী বড় বেদনাদায়ক। এক দরিদ্র ছুতারের ঘরে জন্মে কঠোর জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজ চেষ্টা, চরিত্র ও বুদ্ধির বলে সাফল্যের শিখরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আমেরিকার বিশাল অঞ্চলে অনাদিকাল থেকে ছিল অরণ্যে আচ্ছন্ন। শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়রা আমেরিকায় আসতেন ভাগ্যান্বেষণে। সেখানে তারা জঙ্গল কেটে ছোট ছোট গ্রাম তৈরি করে বসবাস করতেন। এভাবেই আমেরিকায় গড়ে উঠেছিল শ্বেতাঙ্গদের উপনিবেশ।

শৈশবে ছিল দারিদ্রের কষাঘাত
লিংকনের বাবা টমাস লিংকন বাস করতেন আমেরিকার কেন্টাফি প্রদেশের একটি ছোট গ্রামে। সেখানেই ১৮০৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি লিংকনের জন্ম। তার বাবা ছিলেন ছুতোর মিস্ত্রী। তিনি ছিলেন নিরক্ষর, নিজের নামটাও ভালভাবে পড়তে পারতেন না। অতিকষ্টে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সংসার চালাতে হত তাকে।
লিংকনের যখন চার বছর বয়স তখন তার বাবা কেন্টাফির বাস উঠিয়ে ইন্ডিয়ানা প্রদেশের অরণ্যময় অঞ্চলে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে আসেন। তারা যে গ্রামে বাস করতেন সেই গ্রামের সমস্ত ঘরবাড়িই ছিল কাঠের তৈরি। বড় বড় গাছ কেটে তার গুঁড়ি দিয়ে ঘর বানিয়ে ছিলেন তার বাবা।

আব্রাহাম লিংকনের শিক্ষাজীবন
লিংকনের বাবা ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার ব্যাপারে ছিলেন উদাসীন। এই অঞ্চলে কিছু শিক্ষিত লোকের চেষ্টায় একটা প্রাথমিক স্কুল খোলা হয়েছিল। সমায়ের আগ্রহে তিনি সেই স্কুলে ভর্তি হলেন। এইখানেই তিনি প্রথম লিখতে পড়তে শিখেছিলেন। পাঠশালায় মাত্র এক বছর পড়াশুনা করেছিলেন লিংকন। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই লেখাপড়ার প্রতি তার গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে বই সংগ্রহ করে তিনি তার পড়ার পিপাসা মেটাতেন৷ কেবল তাই নয়, গ্রাম থেকে যখনই কেউ শহরে যেত, তিনি তাদের দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ের বই আনাতেন। তিনি যখন মাঠে বা জঙ্গলে কাজে যেতেন সেই সময় তার সঙ্গে থাকত বই৷

আব্রাহাম লিংকনের কর্মজীবন
যে বয়সে শিশুরা নিজের মনে খেলা করে বেড়ায়, মায়ের কোলে বসে গল্প শোনে সেই বয়সেই তিনি বাবার সঙ্গে জঙ্গলে যেতেন কাঠ কাটতে৷ জমি চাষের কাজেও বাবাকে সাহায্য করতে হত শিশু লিংকনকে। তার যখন নয় বছর বয়স, সেই সময় তার মা মারা যান। ফলে সংসারের অবস্থা বেহাল হয়ে পড়ল। এইসময় বাড়ির কাজ করতে হত লিংকন আর তার ছোট বোনকে। বাইরের কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য বাবা ঘরের কাজে সময় দিতে পারতেন না।

নানান রকমের কাজ আব্রাহাম লিংকনকে করতে হয়েছিল। প্রথমে তিনি খেয়া নৌকার কাজ নেন। তার মনিবের অনেক বই ছিল। সেই আকর্ষণেই খেয়া নৌকার কাজ নিয়েছিলেন তিনি। সব বই যখন তার পড়া হয়ে গেল তিনি তখন সে কাজ ছেড়ে দিলেন। তারপর আস্তাবলে, কসাইখানায়, প্রতিবেশীর খামারে, মুদীর দোকানে, এরকম আরো বহু জায়গায় কাজ করেছিলেন তিনি।

ওকালতি পাস করে উকিল হন
ছাত্র হিসেবে যদিও আব্রাহাম লিংকন মেধাবী ছিলেন কিন্তু দারিদ্রের কারনে বেশি লেখাপড়া শিখতে পারেননি। তিনি ক্লার্ক হিসাবে জীবন শুরু করেন। পরে অবশ্য ওকালতি পাস করে উকিল হন।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়া
আব্রাহাম লিংকন ১৮৪৭ সালে রক্ষণশীল দলের (কনজারভেটিভ পার্টি) সদস্য হিসাবে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন। কঠোর পরিশ্রম, প্রশংসনীয় চরিত্র মাধুর্য, বুদ্ধিমত্তা, যথার্থ মানবতাবোধ এবং দৃঢ় মনোবলের কারণে তিনি অতি সাধারণ অবস্থা থেকে শেষ পর্যন্ত আমেরিকার শাসন বিভাগের সর্বোচ্চ পদে আসীন হন। প্রেসিডেন্ট হিসাবে মূলত দুটি কারণে তিনি সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। প্রথমটি হচ্ছে ঘৃণিত দাসপ্রথার বিলোপ সাধন এবং অপরটি হলো শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করতে সক্ষম হওয়া।

দাসপ্রথার বিলোপ ও গৃহযুদ্ধ
আব্রাহাম লিংকন এমন এক ক্রান্তিকালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন যখন দেশটির দুই অংশের উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে দাসপ্রথা অব্যাহত রাখা ও দাসপ্রথার বিলোপ সাধন প্রশ্নে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধ চলাকালে ১৮৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন দাসপ্রথা সম্পূর্ণ বিলোপ করতে সক্ষম হন।

আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যু
মানুষকে মানুষের জন্মগত অধিকার ফিরিয়ে দেবার দীর্ঘ দশ বছরের সংগ্রাম এভাবেই সম্পূর্ণ করে অবশেষে ১৮৬৫ সালে এক দক্ষিণী গুপ্তঘাতকের গুলিতে প্রাণ বিসর্জন দেন মানবতার অবিসংবাদী প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading