আতঙ্কের আরেক নাম হেলমেট বাহিনী

আতঙ্কের আরেক নাম হেলমেট বাহিনী

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৪:৫০

‘হেলমেট বাহিনী’ ২০১৮ সাল থেকে দেশের যে কোনো আন্দোলন-সংঘর্ষের পরিচিতি এক নাম। কিন্তু এরা কারা, কিইবা এদের পরিচয় তা নিয়ে আজও কোন সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। এদের পেছনের মদতদাতাদের নামও কখনো আলোচনায় আসে নি। সম্প্রতি ঢাকা কলেজ-নিউমার্কেট এলাকায় ঘটে যাওয়া সংঘর্ষেও হেলমেট বাহিনীর তাণ্ডব সবাই। কবে এই বাহিনীর মুখোশ উন্মোচন হবে সেই প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী

২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে শুরু করে সবশেষ ঢাকা-কলেজ-নিউমার্কেট এলাকায় সহিংসতায় জড়িত হেলমেট বাহিনী এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ঘটে যাওয়া এসকল আন্দোলন ও সংঘর্ষে এরা আচমকাই যুক্ত হয় এবং পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে। অতীতে দেখা গেছে এরা আন্দোলনকে ভিন্নমুখী করতে বদ্ধপরিকর ছিল। এদের দৌরাত্য দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীদের মধ্যকার সংঘর্ষে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এই হেলমেট বাহিনী। তাদের তাণ্ডবের শিকার হয়ে ওই ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছে। আহতদের সংখ্যা অনেক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এদের মুখোশ উন্মোচন করাটা এখন জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংঘর্ষে হেলমেটধারী ছিল দুপক্ষেই: আলোচিত ঢাকা কলেজ-নিউমার্কেট এলাকায় ঘটে যাওয়া সংঘর্ষে হেলমেট পরা ছিল উভয় পক্ষেই। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন হেলমেটধারী ছিল ঠিক ব্যবসায়ীদের পক্ষেও হেলমেটধারী ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানানা, মূলত সংঘর্ষে যারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে তারা নিজেদের আত্মরক্ষার্থে হেলমেটধারণ করেই সংঘর্ষে লীপ্ত হয়েছে। তারা যেকোনো ধরণের আক্রমণ থেকে নিজেদেরকে সুরক্ষিত করা যায়।

হেলমেট বাহিনী এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে

শুধুই কী আত্মরক্ষায় হেলমেট নাকি ভিন্ন কোনো পরিচয়: শুধুই কী আত্মরক্ষায় হেলমেট নাকি অন্য কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্য ও পরিচয় আর এর। এমন প্রশ্ন সবারই এখন মুখে মুখে। ২০১৮ সালের সেই ছাত্র আন্দোলনের সময়ও হেলমেটধারীরা এসে ছাত্রদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল। ওই সময় হেলমেটধারীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি সাংবাদিকরাও। পরবর্তীতে এদের দৌরাত্য ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। তবে কী এরা নিজেদের আত্মরক্ষায়ই শুধু হেলমেট পরিধান করে নাকি এরা হেলমেটের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় বহন করে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকেও এদের ধরার তৎপরতা নিকট অতীতে খুব একটা চোখে পড়েনি।

হেলমেট বাহিনী মূলত কোন দলের অন্তর্ভূক্ত?: বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও তথ্য-উপাত্তে দেখা গিয়েছে এই হেলমেট বাহিনীর মধ্যকার অতীতে যাদের চিহ্নিত করা গিয়েছে তারা ছাত্রলীগের হয় অনুসারী অথবা সংগঠনের পদধারী। কিন্তু ছাত্রলীগ কখনোই এই হেলমেটধারীদের নিজেদের অন্তর্ভূক্ত বলে দাবি করেনি এবং তারা হেলমেটধারীদের নিয়ে নিজেদের কোনো সাফাইও গায়নি। বরং তারা বলছে, যে কোনো আন্দোলন ও সংঘর্ষকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে সেই ২০১৮ সাল থেকে আবির্ভাব হওয়া এই হেলমেট বাহিনী তৃতীয় কোনো পক্ষ। এর আগে কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, এমনকি হাফ পাস ভাড়ার আন্দোলনেও শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার সময় আমরা হেলমেট বাহিনীকে দেখতে পাই। এমনকি পুলিশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েও তাদের দেখা যায় নানা ভিডিও ফুটেজে। এরপরেও হেলমেট বাহিনীর কেউ গ্রেপ্তার হয় না, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। নিউমার্কেট এলাকার ঘটনার দুই দিন পার হয়ে গেলেও সেটিই আমরা দেখছি। এবারও কি তাহলে তারা পার পেয়ে পরবর্তী কোনো ঘটনায় মাঠে নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে?

হেলমেট বাহিনী যে দলেরই হোকনা কেনো তাদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতেই হবে: এই হেলমেট বাহিনী প্রথম দৃশ্যমান হয়েছিল ২০১৮ সালে স্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়। সেই সময় হেলমেট বাহিনী স্কুল শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছিল। হেলমেটের আড়াল থেকে গণমাধ্যম তাদের অনেকের পরিচিতি প্রকাশ করেছিল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনুসন্ধান করেনি, ব্যবস্থা নেয়নি। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়র এক ছাত্রলীগ নেতা শিক্ষার্থী তরিকুলকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পঙ্গু করে দিয়েছিল। টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়ে সেই নেতা দায় স্বীকার করে বলেছিল, আমি হলেই আছি পালিয়ে যাইনি। তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই ধারাবাহিকতাতেই এবারের সংঘর্ষে আবার দেখা মিলল হেলমেট বাহিনীর। এদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা এখন খুবই জরুরী। এরা যে দলেরই হোক না কেনো তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এদের বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার হতে হবে।

অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের প্রশ্ন: ‘ঢাকার বাইরে থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করা সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররাই ঢাকা কলেজের হোস্টেলে থাকত। সেসব ঘরে এখন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কারা থাকে চিন্তা করলে গা হিম হয়ে আসে।’ নিজের ফেসবুক পোস্টে সোমবার আক্ষেপ করে কথাগুলো লেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির খ্যাতনামা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি ১৯৬০ এর দশকে এ কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। সেই স্মৃতি তুলে ধরেন এই পোস্টে। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীদের সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর এ পোস্ট। অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ তাঁর স্মৃতির এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বলেন, কিছুদিন ধরে কেন যেন মন টানছিল আমার ছাত্রজীবনের অনেক সুখস্মৃতি জড়িত ঢাকা কলেজের নর্থ হোস্টেল একবার ঘুরে আসব। কলেজে পড়ার দুই বছর ১৯৬৩-৬৫ সনে হোস্টেলের যে ঘরটিতে একটানা থেকেছিলাম, দোতলার সেই ২১৬ নম্বর ঘরটিতে এখন কারা থাকে, কীভাবে থাকে, জানতে ইচ্ছা হচ্ছিল। ভেবেছিলাম তাদের সঙ্গে বসে একটু স্মৃতিচারণা করে আসব। কিন্তু তা বোধহয় আর হলো না। তিনি লেখেন, সংবাদমাধ্যমগুলোয় কয়েক দিন ধরে ঢাকা কলেজের ছাত্র আর নিউমার্কেটের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের সংবাদ নিয়ে শিরোনাম হচ্ছে। একজন নিরীহ পথচারী কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী নাহিদ হোসেনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার ছবি দিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন বেরিয়েছে। জীবজগতের মধ্যে মানুষই যে সবচেয়ে নৃশংস হতে পারে, এই জানা কথাটা নিজের চেনাজানা পারিবেশের মধ্যে নতুন করে ঘটতে দেখলে মনে ধাক্কা লাগে। বিশেষ করে, যখন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অবশ্য এ ধরনের ঘটনার সংবাদ নতুন কিছু নয়, এত দিনে গা সওয়া হয়ে যাওয়ার কথা। এই সেদিনও তো বুয়েটের ছাত্র আবরারকে ছাত্রাবাসের ভেতরেই দলীয় ছাত্র সংঘটনের কর্মীরা নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। যে ছাত্রসমাজকে দিয়ে আমরা দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরির স্বপ্ন দেখছি, তাদের মধ্যে কী ধরনের দানবদের আমরা লালন পালন করছি।

নাহিদ হত্যায় জড়িত হেলমেটধারী ছয় ছাত্র শনাক্ত: ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিউ মার্কেটের দোকান কর্মচারীদের সংঘর্ষের সময় ডেলিভারিম্যান নাহিদ মিয়াকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যায় জড়িত ছয় ছাত্রকে শনাক্ত করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) ফারুক হোসেন সোমবার (২৫ এপ্রিল) গণমাধ্যমকে বলেন, তারা সবাই ঢাকা কলেজের। ঘটনার সময় কয়েকজন হেলমেট পরা ছিল। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। সংঘর্ষের ওই মামলা তদন্তের দায়িত্বে থাকা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গত রবিবার ঢাকা কলেজ ছাত্রাবাসে অভিযান চালায়। তবে সেখান থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। যে ছয়জন প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয়েছে তারা সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। তবে এই ছয়জনের নাম বা বিস্তারিত পরিচয় জানাননি উপকমিশনার ফারুক। অবশ্য প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভিডিও বিশ্লেষণ করে কয়েকজনের নাম ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমের খবরে এসেছে। তারা সবাই ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কোনো কমিটি নেই এখন। ২০১৬ সালে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলও তারা আর পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি। কলেজের ছাত্রলীগ এখন কয়েকটি ভাগে বিভক্ত।

ঢাকা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মইনুল হোসেন সোমবার দুপুরে গণমাধ্যমকে জানান, শনাক্ত হয়েছে এমন কোনো ছাত্রের ব্যাপারে তথ্য জানতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কোন সদস্য তার কাছে আসেননি, জানতেও চাননি। তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কেউ কোন শিক্ষার্থী বিষয়ে জানতে চাইলে সহায়তা করা হবে। কোনো শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হয়েছে- এমন তথ্যও নেই জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেন, রবিবার ছাত্রাবাসে গোয়েন্দা পুলিশ আলামত উদ্ধারের জন্য অভিযান চালায়। তারা একজনকে নিয়েছিল, পরে ছেড়ে দিয়েছে তবে তার মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৬ এপ্রিল ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

প্রসঙ্গত, গত ১৮ এপ্রিল ইফতারের টেবিল বসানো নিয়ে নিউ মার্কেটের দুই দোকানের কর্মীদের বচসার পর এক পক্ষ ঢাকা কলেজ ছাত্রাবাস থেকে ছাত্রলীগের কয়েক কর্মীকে ডেকে আনে। তারা গিয়ে মারধরের শিকার হওয়ার পর ছাত্রাবাসে ফিরে আরও শিক্ষার্থীদের নিয়ে সোমবার মধ্যরাতে নিউ মার্কেটে হামলা চালাতে গেলে বাঁধে সংঘর্ষ। পরদিন দিনভর চলা এই সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। তাদের মধ্যে এলিফ্যান্ট রোডের একটি কম্পিউটার এক্সেসরিজের দোকানের ডেলিভারিম্যান নাহিদকে কুপিয়ে জখম করা হয়। আর ইটের আঘাতে আহত হন মোরসালিন নামে এক দোকানকর্মী। পরে হাসপাতালে মারা যান তারা দুজন।
দুজনের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে দুটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। এছাড়া সংঘর্ষ ও বোমাবাজির ঘটনায় আদালা দুটি মামলা করেছে পুলিশ। এর মধ্যে হত্যা মামলা দুটির তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ, বাকি দুই মামলায় থানা পুলিশ তদন্ত করছে।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading