ঘর পাওয়ার পরে মানুষের মুখের হাসিটি আমার সবচেয়ে ভালো লাগে
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৭ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৫:৩৫
আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় তৃতীয় ধাপে সারাদেশের ৪৯২টি উপজেলার ৩২ হাজার ৯০৪টি বাড়ি বিতরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিন। এ সময় তিনি তার অঙ্গীকার পুর্নব্যক্ত করে বলেছেন দেশে আর একজন লোকও গৃহহীন ও ভূমিহীন থাকবে না। সরকারপ্রধান মনে করেন ক্ষমতার মানেই হচ্ছে জনগণের সেবা করা। প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন সকল বাধা অতিক্রম করেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে কেউ গৃহহীন, ভূমিহীন এবং ঠিকানাবিহীন থাকবে না। আমরা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছি। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় তৃতীয় ধাপে সারাদেশে ৪৯২টি উপজেলার ৩২ হাজার ৯০৪টি বাড়ি বিতরণকালে সুবিধাভোগিদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার (২৬ এপ্রিল) সকালে তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি বলেন, তার সরকার একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে জাতির পিতার লালিত স্বপ্ন পূরণে সবার মুখে হাসি ফোটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চারটি জেলার চারটি স্থানের সাথে যুক্ত হয়ে সুবিধাভোগী এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সাথে মতবিনিময়ও করেন। চারটি স্থান হলো: ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার পোড়াদিয়া বালিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প, বরগুনা জেলার বরগুনা সদর উপজেলার খেজুরতলা আশ্রয়ণ প্রকল্প, সিরাজগঞ্জ জেলার সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার অধীনে খোকশাবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলার হাজীগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্প।
ঈদ-উল-ফিতরের উপহারে গৃহহীনদের মুখের হাসি: প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ৩২ হাজার ৯০৪টি গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারের মাঝে জমি ও ঘর দিয়েছি। আমি আসন্ন ঈদ-উল-ফিতরের উপহার হিসেবে আজ এ সব জমি ও ঘর দিয়েছি। যারা ঘর পেয়েছে তাদের মুখের হাসি আমি খুব পছন্দ করি। শেখ হাসিনা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, বাংলাদেশে একটি মানুষও ভূমিহীন-গৃহহীন থাকবে না, সেটাই আমাদের সরকারের লক্ষ্য।মুজিববর্ষে সারাদেশে প্রতিটি ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষকে বাসস্থানের আওতায় আনার সরকারি অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের আওতায় তিন ধাপে এ পর্যন্ত ১৫০,২৩৩টি বাড়ি বিতরণ করা হয়েছে। জাতির পিতার গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের পদাংক অনুসরণে ’৯৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর পরই এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ’৯১ সালের প্রলয়ংকারি ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়-ক্ষতি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া টের পান নি। কারণ তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। অন্যদিকে ’৯৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ের প্রেক্ষাপটে তিনি তাঁর বিদেশ সফর বাতিল করে জরুরী ভিত্তিতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করে মানুষকে সহযোগিতায় নেমে পড়েন এবং নিজে বিভিন্ন জায়গায় যান। তিনি বলেন, সে সময় সেন্টমার্টিন দ্বীপে ৭০টি আশ্রয়হীন পরিবারের জন্য নৌবাহিনী এবং জমি দানকারি স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার সহযোগিতায় ব্যারাক নির্মাণের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে ভূমিহীনদের এই পুনর্বাসন কর্মসূচি শুরু হয়।দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসে তাঁর সরকার এই কর্মসূচিকে আরো বেগবান করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তখন থেকে আমরা ফান্ড করে জমি কিনেও ঘর তৈরি করছি এবং গৃহহীনদের মাঝে উন্নত মানের সেমি পাকা ঘর করে দেয়ারও পদক্ষেপ নিয়েছি।

সুবিধাবঞ্চিত সকল শ্রেণির গৃহায়ণ প্রকল্পের আওতায় আসবে: সরকারপ্রধান বলেন, বেদে, তৃতীয় লিঙ্গ, চা-শ্রমিক, কুষ্ঠ রোগি, ভিন্নভাবে সক্ষমসহ সুবিধাবঞ্চিত সকল শ্রেণির মানুষকে সুন্দর জীবন উপহার দিতে গৃহায়ণ প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। আর এ জন্য সরকার শুধু খাস জমিরই খোঁজ করছে না, নিজেদের অর্থায়নে জমি কিনেও ঘর-বাড়ি করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, আমি জানি না পৃথিবীর আর কোন দেশে এ ধরনের উদ্যোগ আর কেউ নিয়েছে কিনা। কিন্তু আমরা জাতির পিতার আদর্শের সৈনিক। আমি শুধু তার কন্যাই না, তার আদর্শেরও অনুসারী। আর আমার কাছে ক্ষমতাটা হচ্ছে জনগণের সেবা করা। তাঁদের জন্য কাজ করা এবং আমি সেটাই করে যাচ্ছি। জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা আরো বলেন, আমি জানি আজ আমার বাবার আত্মা শান্তি পাবে, যখন তিনি দেখবেন তাঁর জনগণের মুখে হাসি ফুটেছে। সরকার প্রধান বলেন, আমার সবচেয়ে ভালো লাগে যখন দেখি একটা মানুষ ঘর পাওয়ার পর তার মুখের হাসি। জাতির পিতা দুঃখী মানুষের মুখেই হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন। সকল মানুষ যাতে সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে সে লক্ষ্য নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাই আমরা চালিয়ে যাব। জাতির পিতার জš§শত বার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনকালে আমরা উন্নয়নশীল দেশের যে স্বীকৃতি পেয়েছি তাকে ধরে রেখে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলবো।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে স্বাধীনতার আদর্শ থেকে পথ হারায় বাংলাদেশ: বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমালোচনায় তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে খুনি, যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায় বসিয়েছেন। যে আদর্শ নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল সেই আদর্শ থেকে বাংলাদেশ পথ হারিয়ে ফেলে। একের পর এক ক্ষমতায় এসে তারা জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন, জনগণকে অধিকার বঞ্চিত করেছেন। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চেয়েছে তারা। জিয়াউর রহমানের শাসনামলের সমালোচনায় তিনি বলেন, তারা এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে নাই। স্বাধীন দেশ বাংলাদেশকে তারা আবার পাকিস্তানি গোলামি জিঞ্জিরে আবদ্ধ করতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনা বলেন, জিয়াউর রহমান নিজেকে ক্ষমতাসীন করার পাশাপাশি সংবিধানের ধারা বদলে দিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনমালে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যাদের বিচার শুরু হয়েছিল, তাদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করে দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতাকে হত্যা করা না হলে বাংলাদেশ ৪০ বছর আগেই উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে মর্যাদা পেত।
‘সকল বাধা অতিক্রম করেই আমরা এগিয়ে যাব’: প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাক, বাংলাদেশ উন্নত হোক- যারা স্বাধীনতাকে ব্যর্থ করতে চেয়েছিল তারা এখনও রয়ে গেছে, যারা কখনো এটা চাইবেনা। কিন্তু সকল বাধা অতিক্রম করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে এবং আমরা এগিয়ে যাব। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এখন উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে অভিহিত করা হয়, আর দুর্যোগ-দুর্ভিক্ষের দেশ কেউ বলে না, অবহেলার চোখে কেউ দেখে না। আর এটা সম্ভব হয়েছে এদেশের মানুষের জন্য।

প্রসঙ্গত, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের তৃতীয় ধাপের আওতায় সারাদেশে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মধ্যে আরও ৬৫,৬৭৪টি ঘর বিতরণের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে, প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই আজ ৩২,৯০৪টি বাড়ি হস্তান্তর করেছেন। সারা দেশের ৪৯২টি উপজেলায় এসব ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ১,১৭,৩২৯টি বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে এবং ২০২১-২০২২ সালের চলতি অর্থবছর পর্যন্ত ১,৮৩,০০৩টি বাড়ি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ভূমিহীন, গৃহহীন, হতদরিদ্র ও উৎপাটিত পরিবারের স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে জমি ও বাড়ির মালিকানা দেয়া হয়। প্রতিটি ইউনিটে দুটি কক্ষ, একটি রান্নাঘর, একটি টয়লেট এবং একটি বারান্দা রয়েছে, যার মূল্য ২৫৯,৫০০ টাকা কর ও ভ্যাট ছাড়াই। ট্যাক্স ও ভ্যাটসহ এর পরিমাণ ৩৩০,০০০ টাকা। আশ্রয়ণ-২ এর তৃতীয় পর্বে বাড়িগুলোকে আরও টেকসই এবং জলবায়ু সহনশীল করতে সরকার খরচ বাড়িয়েছে এবং নকশায় পরিবর্তন এনেছে। বাড়িগুলিকে আরও টেকসই করতে প্রতিটি বাড়ির জন্য খরচ ১,৯১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২,৫৯,৫০০ টাকা করা হয়েছে।
সরকার বাড়িগুলিকে আরও টেকসই করার জন্য শক্তিশালী গ্রেট-বিম, লিন্টেল এবং আরসিসি পিলার বিশিষ্ট বাড়িগুলি নির্মাণ করেছে।চলতি অর্থবছর পর্যন্ত বাড়ি নির্মাণে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৯৭২ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
উপহারের ঘরে প্রধানমন্ত্রীর জন্য কাঁথা সেলাই করেছেন রহিমা: চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রহিমা খাতুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহারের ঘর পেয়ে হয়েছেন সাবলম্বী। সেই ঘরে ফ্রিজ কিনেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে দেখার জন্য টিভি কিনেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দেওয়ার জন্য দুইটি কাঁথা তিনি সেলাই করেছেন। এখন তিনি তা প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই নিতে হবে বলে আবদার করেছেন। মঙ্গলবার (২৬ এপ্রিল) সকালে আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ঈদের উপহার হিসেবে প্রায় ৩৩ হাজার পরিবারকে ঘর তুলে দেওয়ার প্রাক্কালে গণভবন থেকে যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় রহিমা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই আবদার করেন। রহিমা খাতুন বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে সরাসরি দেইখ্যা কথা বলার মতো ভাগ্য আমার নাই।

‘ঘর নয় যেন ফাইভ ইস্টার হোটেল’: আমার চারটা মাইয়া নিয়ে ভাড়া বাসায় ছিলাম। অনেক বাসায় থাকার পর প্রধানমন্ত্রীর একটা বাড়ি পাই। বাসা এত সুন্দর, একদিকে পাহাড় আরেকদিকে সমুদ্র। বিল্ডিংটা দেখলে মনে হয়, ফাইভ ইস্টার হোটেলের মতো। আমি মনে করি, আমার বিল্ডিং ফাইভ ইস্টার হোটেল। তিনি আরও বলেন, ‘আপনার দোয়ায় আমরা ৪০ জন একসঙ্গে ঘর পাইসি। তাদের বাচ্চাদের আমি আরবি পড়াই। আমার মেয়ে বাংলা, অংক, ইংরেজি শেখায়। সব মিলিয়ে আমাদের ১০-১৫ হাজার টাকা আয় হয়। এই আয় থেকে আমি ফ্রিজ কিনেছি, প্রতিদিন যাতে আপনাকে দেখতে পারি সে জন্য একটা টিভি নিয়েছি। এখন আপনাদের দোয়ায় আল্লাহর রহমতে অনেক ভালো আছি। আপনার দেওয়া ঘরে বসে দুইটা কাঁথা সেলাই করসি। অবশ্যই এই কাঁথাগুলো আমার কাছ থেকে নিতে হবে আপনাকে। আমার আর দেওয়ার কিছু নাই।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘অবশ্যই’ নেবেন বলে সাড়া দেন।
ইউডি/সুপ্ত

